Header Ads

বৃহৎ নক্ষত্রদের জন্ম, জীবনকাল এবং মৃত্যু

ছোট নক্ষত্রদের জীবন খুবই শান্ত এবং দীর্ঘ হয়ে থাকে। ভর অনেক কম হওয়ায় তারা ফিউশন প্রক্রিয়াটি পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন করতে পারেনা। সাধারণত ছোট নক্ষত্রগুলো ম্যাগনেসিয়াম গঠিত হবার পরপরই ফিউশন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। এবং নক্ষত্রের বাইরের আবরণটি মিশে যায় মহাকাশে। এরপর বাকি থাকে শুধুমাত্র নক্ষত্রের ভেতরের 'Core' অংশটি - একটি শ্বেত বামন (White Dwarf) নক্ষত্র!

বৃহৎ নক্ষত্রদের জন্ম, জীবনকাল এবং মৃত্যু


সংক্ষেপে মোটামুটি এটিই ছোট নক্ষত্রদের জীবনকাল। পরবর্তীতে কোন এক লিখায় এই ঘটনাগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করবো। আপাতত আমাদের আলোচনার বিষয় হচ্ছে সাইজে বড় নক্ষত্রগুলি! তাদের জন্ম, মৃত্যু, জীবনকালের আকর্ষণীয় গল্পগুলো জানার জন্য আজকের এই আর্টিকেল।

যাত্রার শুরু... 


বৃহৎ নক্ষত্ররা তাদের জ্বালানী খুব দ্রুত ব্যাবহার করতে পারে এবং তাই এদের জীবনকাল ১০০ মিলিয়ন বছরের বেশি হয়না! হুম, অনেকটা সময়! কিন্তু একটা নক্ষত্রের জীবনকাল হিসেবে এটি আসলে খুবই অপ্রতুল! প্রথমদিকে এরা হাইড্রোজেন ফিউশন বিক্রিয়া ঘটাতে শুরু করে এবং হিলিয়াম তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের সূর্যের থেকে অনেক বেশি হাইড্রোজেন ফিউশন হয়ে থাকে। তাই এই নক্ষত্রগুলি সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি উত্তপ্ত এবং উজ্জ্বল হয়।

যখন হাইড্রোজেন জ্বালানী শেষ হয় তখন হিলিয়ান ফিউশন আরম্ভ হয়ে যায়। পারমাণবিক পর্যায়ে এই প্রক্রিয়াটা ছোট নক্ষত্রদের মতোই। কিন্তু, বৃহৎ পর্যায়ে অনেক বড় কিছু পরিবর্তন ঘটে যায়। এই পর্যায়ে নক্ষত্রগুলি আকারে এতোটাই বিশাল হয় যে তাদের আলাদা একটা নাম দেয়া হয়েছে - সুপারজায়ান্ট। এই সময় নক্ষত্র আমাদের দৃশ্যমান সকল আলো নিঃসরিত করতে পারে। নীল অর্থাৎ ব্লু জায়ান্টরা এসময় সবথেকে উত্তপ্ত হয় এবং রেড জায়ান্টরা সবথেকে কম উত্তপ্ত হয়।

বৃহৎ নক্ষত্রদের জন্ম, জীবনকাল এবং মৃত্যু
আমাদের সৌরজগতের তুলনায় একটি ব্লু (নীল) সুপারজায়ান্ট


যাত্রার শেষ - নক্ষত্রের মৃত্যু 


নক্ষত্রগুলির প্রচণ্ড মহাকর্ষীয়ও বলের কারণে ফিউশন প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং উপস্থিত ম্যাগনেসিয়াম অন্যান্য ডি-ব্লক মৌলে রুপান্তরিত হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি অনবরত চলে আয়রন গঠন না হওয়া পর্যন্ত। এবং তারপরেই ফিউশন প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হয়ে নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ায় শক্তি নিঃসরিত হয় যা মহাকর্ষকে ভারসাম্যে রাখে। সমস্যা হচ্ছে আয়রনের ফিউশন বিক্রিয়া ENDOTHERMIC - এটি শক্তি নিঃসরিত করে না, উল্টো শক্তি শুষে নেয়! এবং যেহেতু শক্তির আর কোন উৎস নেই তাই নক্ষত্র তখন নিজেরই মহাকর্ষীয় বলের সাথে লড়তে থাকে। মহাকর্ষ বল সকল পদার্থকে নক্ষত্রের কেন্দ্রে সংকুচিত করে এবং তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। একসময় তাপমাত্রা মাত্রাতিরিক্তি বেড়ে যাবার ফলে বিস্ফোরিত হয়। এই অবস্থাটিকে বলা হয় সুপারনোভা। একটি সুপারনোভা এতোটা শক্তি বিকিরণ করতে পারে যা সূর্য নিজের সমগ্র জীবনকালে করতে পারবে! এতো সংক্ষিপ্ত সময়ে এই বিশাল শক্তি বিকিরণের ফলে আয়রনের আবার ফিউশন শুরু হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ভারী মৌলে রুপান্তরিত হয়ে যায় যেমনঃ গোল্ড, সিলভার এবং ইউরেনিয়াম

তারপরে কী? 


নক্ষত্রের মৃত্যু তো হয়ে গেলো। তারপরে কী হবে? সুপারনোভা বিস্ফোরণের সাথে নক্ষত্রের ভরের একটা বৃহৎ অংশ মহাবিশ্বে ছড়িয়ে যায়। শেষপর্যন্ত যেটুকু ভর বাকি থাকে, শুধুমাত্র ভেতরের অংশটি, তা আর কোন সাধারণ অংশ নয়! কোরের বিশালাকার ভরের কারণে Quantum Degeneracy চাপ ভেতরের দিকের আকর্ষণের তুলনায় কম হয়। ফলে এটি সাইজে অবশিষ্ট Core এর ভরের সমান হয়ে যায়।

যদি নক্ষত্রের ভেতরের অংশটির ভর আমাদের সূর্যের ৩ গুণ কম হয়ে থাকে তাহলে এটি নিউট্রন স্টারে পরিণত হয়। এটি আমাদের আজ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণকৃত ২য় সবচেয়ে অদ্ভুতুড়ে জিনিস! এটমিক লেভেলে প্রোটন এবং ইলেকট্রন নিজেদের মধ্যে মিশে গিয়ে নিউট্রনে পরিণত হয়। যার ফলে প্রচুর পরিমাণ শক্তি এবং নিউট্রিনো নিঃসরিত হয়।

নিউট্রন স্টার

নিউট্রনরা এই অবস্থায় যথেষ্ট স্থিতিশীল এবং নিজেদের মধ্যে তারা বিকর্ষণ করে থাকে Neutron Degeneracy বলের কারণে। আমাদের মহাবিশ্বে নিউট্রন স্টারই হচ্ছে সবচেয়ে ঘনবস্তু। এর চেয়ে অধিক ঘনত্বের কোনকিছু নেই। এই নক্ষত্রগুলি থেকে ১ চামচ পরিমাণ ভর তুলে নিলে তার ওজন সম্পূর্ণ Empire State Building এর চেয়ে বেশি হবে! নিউট্রন স্টার এই অবস্থায় কয়েক  বিলিয়ন বছর থাকতে পারে। এরা অত্যন্ত সক্রিয় তড়িৎচুম্বকীয় পদার্থ। তারা নিজেদের অক্ষে ঘুরতে পারে এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করতে পারে। এদের ঘূর্ণনের হার সেকেন্ডে ১০০০ বার হতে পারে! নিউট্রন নক্ষত্র অনেক শক্তিশালী তড়িৎচুম্বক বিকিরণ করে। আমরা এই নিউট্রন স্টারগুলিকে পালসার বলে থাকি।


সুপারনোভার পরবর্তী পর্যায়ে নক্ষত্র থেকে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া এই ভরে নানা ধরণের মৌল ও উপাদান থাকে। যা পরবর্তীতে অন্য নক্ষত্রের জন্মও দিতে পারে। এমনকি সৌরজগতের সৃষ্টিও এভাবেই হয়ে থাকে!

আমাদের পৃথিবীতে উপস্থিত প্রতিটি পরমাণু কোন এক সময় নক্ষত্রের অংশ ছিলো যা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিলো। আমরা আক্ষরিক অর্থেই নক্ষত্রের অংশ দিয়ে তৈরি!   

ব্ল্যাক হোল 


বৃহৎ নক্ষত্রদের জন্ম, জীবনকাল এবং মৃত্যু

আচ্ছা, যদি নক্ষত্রের ভর আমাদের সূর্যের ৩ গুণের চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন কী হবে? এই অবস্থায় কোনোকিছুই নক্ষত্রের সংঘর্ষ এড়াতে পারবে না। নক্ষত্রের সকল ভর একটি একক বিন্দুতে পরিণত হবে যার ঘনত্ব এবং বক্রতা অসীম। একে বলা হয় 'সিঙ্গুলারিটি' (Singularity)। এই সিঙ্গুলারিটির চারিদিকের স্পেস হচ্ছে ব্ল্যাক হোল। ব্ল্যাক হোল স্পেস-টাইমের জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্য ভেঙ্গেচুড়ে দেয়। এদের মহাকর্ষ বল এতো বেশি হয়ে থাকে যে আলো পর্যন্ত সেটাকে উপেক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। এবং তাই এর নাম "ব্ল্যাক হোল" !

নক্ষত্রের অন্যান্য দশাগুলির মতো ব্ল্যাক হোলের বৈশিষ্ট্য বোঝা অতটা সহজ নয়। সিঙ্গুলারিটি এবং তার পাশেপাশে আমাদের প্রাকৃতিক জগতের নিয়মগুলি ভেঙে পড়ে। ব্ল্যাক হোল মূলত আলবার্ট আইন্সটাইনের 'জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির' একটি গাণিতিক প্রেডিকশন ছিলো প্রাথমিক পর্যায়ে।

ব্ল্যাক হোল অত্যন্ত রহস্যজনক একটি বস্তু আমাদের জন্য। এখনো এর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানার বাকি রয়েছে। অন্য কোন এক লিখায় ব্ল্যাক হোলের এই অদ্ভুতুড়ে বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যাবে!


একটা ছোট্ট প্রশ্ন!
আমাদের সৌরজগতের চিরচেনা 'সূর্য' কোন ধরণের নক্ষত্র? 


যদি আর্টিকেলটি ভালো লেগে থাকে তাহলে ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস সহ যেকোনো সাইটে শেয়ার করুন এবং পরিচিতজনদের জানান। নক্ষত্রদের এই বিচিত্র জীবন এবং অপার সৌন্দর্য থেকে কাউকে বঞ্চিত রাখাটা একদম উচিৎ হবেনা! যেকোনো ধরণের পরামর্শ/মতামত জানাতে পারেন নীচের কমেন্ট বক্সে লিখে। আপনাদের মন্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ লিখাটি পড়ার জন্য। ভালো থাকবেন।  

No comments: