Header Ads

বিজ্ঞানী আর্থার স্ট্যানলি এডিংটন

বিজ্ঞানী আর্থার স্ট্যানলি এডিংটন

১৯২০ সাল বা তার আগে এক জ্যোতির্বিদকে প্রশ্ন করল তার এক উৎসাহী ছাত্র।

– স্যার, শুনেছি পৃথিবীতে মাত্র তিনজনই নাক আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্বটা বোঝেন, আর আপনি নাকি সেই তিনজনের একজন?

এডিংটন চুপ করে রইলেন।

– মাফ করবেন, আপনার মত বিনয়ী মানুষ এ ধরনের প্রশ্নে বিব্রত বোধ করবেন এটা আমার বোঝা উচিৎ ছিল।

– ঠিক তা নয়, আমি ভাবছি তৃতীয় লোকটি কে হতে পারে?

এই জ্যোতির্বিদ ছিলেন স্যার আর্থার স্ট্যানলি এডিংটন, যিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতত্ত্ব অল্প যেসব মানুষ বুকে আগলে আইনস্টাইনের পক্ষে লড়াই করেছেন তাদের মধ্যে এডিংটন সেরা ! বলা হয়ে থাকে ১৯৫০ এর আগে আইনস্টাইন ও এডিংটন ছাড়া আপেক্ষিক তত্ত্ব তৃতীয় আর কেউ বুঝত না ! আইনস্টাইন যখন একের পর এক লেকচারে আপেক্ষিকতত্ত্ব বুঝাতে অক্ষম হচ্ছিলেন, তখন এডিংটন সহজ ভাষায় তা মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেন ।

১৮৮২ সালের ইংল্যান্ডের ওয়েস্টমোরল্যান্ডে এক শিক্ষক পরিবারে তার জন্ম । ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পরে তিনি গ্রিনিচ রয়াল সোসাইটির মানমন্দিরে যোগ দেন ! এডিংটন সীমার নামকরণ তার নাম অনুসারে করা হয়েছে। এটি একটি কমপ্যাক্ট বস্তুর উপরকার বিবৃদ্ধি থেকে বিকিরিত দীপন ক্ষমতার সীমা নির্দেশ করে ।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বিষয়ক গবেষণার জন্য তিনি বিখ্যাত। ১৯১৯ সালে তিনি একটি গবেষণাপত্র লিখেছিলেন যাতে মহাকর্ষের আপেক্ষিক তত্ত্ব সংশ্রিষ্ট তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়। এই নিবন্ধের মাধ্যমেই আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব ইংরেজি ভাষী বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে।

আইন্সটাইনের সাধারন আপেক্ষিকতার মূল কথা হলো বস্তুর ভরের কারণে স্থান বা স্পেস বেঁকে যায় যার ফলে মহাকর্ষের উৎপত্তি। আইন্সটাইনের আগে পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছু পরিচালিত হত নিউটনের বলবিদ্যা তত্ত্বমতে। এই তত্ত্ব গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথের ব্যাপারেও সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারত শুধুমাত্র একটি গ্রহ বাদে সেটি হল বুধ। নিউটনের মহাকর্ষসূত্র অবলম্বনে প্রতিপাদিত কেপলারের সূত্রমতে সকল গ্রহের সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনুসরণ করার কথা। কিন্তু বুধ এই কাজটি ঠিকমত করেনা। এটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথ অনুসরণ করলেও সেই কক্ষপথটি প্রতি শতাব্দীতে ১.৫৫৫ ডিগ্রি হারে ঘূর্ণন বা rotate করতে থাকে। যদিও এই বুধের এই "বৈপরীত্য" অতি সামান্য, তবে এই সামান্য ব্যাপারগুলোই বিজ্ঞানের জগতে অসামান্য হবে এটাই স্বাভাবিক। বুধের উপর পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহের প্রভাব বিবেচনা করে এই অসঙ্গতির ১.৫৪৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করতে পারলেন।কিন্তু বাকি ০.০১১ ডিগ্রির কোন ব্যাখ্যা তৎক্ষণাৎ পাওয়া গেলোনা, যা নিউটনিয় পদার্থবিদ্যায় ভুল থাকার সম্ভাবনা তৈরী করল। 

তবে এর আগে ইউরেনাস এর কক্ষপথের অসঙ্গতি ঠিক করতে গিয়ে যখন নেপচুন আবিষ্কার হওয়া এবং এই ২টি গ্রহের ক্ষেত্রে নিউটনের প্রেডিকশন সঠিক প্রমাণিত হওয়ায় সে সময় বিশেষত বৃটিশরা, যারা কিনা ওই আমলে বিজ্ঞানজগতে সুপার পাওয়ার ছিলেন, তাঁদেরি স্বদেশী নিউটনের আধিপত্য খর্বকারি কোন মতবাদকে সহজে মেনে নিতে খুব একটা প্রস্তুত ছিলেন না।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই এডিংটন ও আইন্সটাইন নামের ২ তরুণ বিজ্ঞানীর দৃশ্যপটে প্রবেশ। তখন চলছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আর বৃটেন এবং জার্মানি ছিল পরস্পর বিরোধী পক্ষে। তাই এই দুই দেশের বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে যোগাযোগ ও বন্ধ ছিল। এডিংটন ছিলেন সে সময় Cambridge Observatory এর পরিচালক। আর আইন্সটাইন তখন তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছিলেন। তবে গবেষণায় তিনি একটি জায়গায় গিয়ে আটকে পড়েছিলেন, সেখান থেকে বের হতে পারছিলেন না।

তো তখন ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আইন্সটাইনের কিছু paper নিয়ে এডিংটন স্টাডি করার সুযোগ পান এবং তিনি বুঝতে পারেন আইন্সটাইন একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন। তিনি আইন্সটাইনের সাথে গোপনে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে শুরু করেন। তিনি আইন্সটাইনকে বুধ গ্রহের ক্ষেত্রে নিউটনিয় পদার্থবিদ্যার ব্যর্থতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন। এখন আইন্সটাইন যদি বুধের এই আচরণ ব্যাখ্যা করতে পারেন তাহলেই নিউটনকে পাশ কাটিয়ে নতুন থিওরী উপস্থাপন সম্ভব। এরপর নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন আইন্সটাইন এবং একসময় সফল ও হন। কিন্তু থিওরী দিলেই তো হবেনা তা তো প্রমাণ করতে হবে। নইলে আবার গোঁড়া বিজ্ঞানীসমাজ তা মানতে চাইবেন না। এই প্রমাণের দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিলেন এডিংটন। সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিপক্ষীয় দেশের এক বিজ্ঞানীর তত্ত্ব প্রমাণের অভিযানে নামলেন তিনি, যা কিনা তাঁর নিজের দেশেরই এক বিজ্ঞানীর আধিপত্য খর্ব করতে চলেছে।

এখন কিভাবে সম্ভব এই প্রমাণ? আইন্সটাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী আলোর উপরও মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব রয়েছে। তাই অনেক ভারী কোন বস্তু যেমন সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলো বেঁকে যাবে। এই ঘটনাটা যদি প্রমাণ করা যায় তাহলেই নির্দ্বিধায় আইন্সটাইনকে সঠিক বলে মেনে নিতে বাধ্য হবেন সবাই। অনেক দূরের নক্ষত্র গুলো থেকে যে আলো আসে তা সূর্যের কাছাকাছি আসলে বেঁকে যায়। তাই দিনের বেলা ও রাতের বেলায় সূর্যের নিকটবর্তী তারাগুলোর অবস্থানে সামান্য তারতম্য হবে যদি আইন্সটাইন সঠিক হন।রাতের বেলায় আকাশের ছবি তো তোলাই যায়, কিন্তু দিনের বেলা? এর জন্য দরকার ছিল একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। সূর্যগ্রহণের সময় দিনের বেলা তোলা আকাশের ছবি এবং ওই একই স্থানে রাতের বেলায় তোলা আকাশের ছবিতে যদি তারাদের অবস্থান পরিবর্তিত হয় তাহলে আইন্সটাইন সঠিক আর নাহলে ভুল।

বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলনা। যুদ্ধশেষ হওয়ার কিছুদিন পরই ২৯ মে,১৯১৯ তারিখে আফ্রিকার প্রিন্সিপে নামের একটি দ্বীপে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয়। আর সেখানে সহকর্মী ও আরেক জ্যোতির্বিদ ফ্রাঙ্ক ওয়াটসন ডাইসন এর সাথে মিলে একই জায়গার সূর্যগ্রহণ চলাকালীন এবং রাতের আকাশের ছবি তোলেন এডিংটন। এবং যা হওয়ার তাই হল, দুটি ছবি খাপে খাপে মিললোনা। অতএব আইন্সটাইন সঠিক। আর সেই সাথে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা নিউটনীয় যুগের সমাপ্তি।

এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপরই আইন্সটাইন রাতারাতি পৌঁছে যান খ্যাতির শিখরে। আর এডিংটন? তিনি হারিয়ে যান পাদপ্রদীপের আলো থেকে অনেকটাই দূরে। তবে তার কাজ ঠিকই চালিয়ে গেছেন তিনি। যার স্বাক্ষর হয়ে আছে এডিংটন লিমিট ও এডিংটন নাম্বার। প্রথমটি হল নক্ষত্রের আলোর সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতার স্বাভাবিক সীমা। আর দ্বিতীয়টি সাইক্লিস্ট দের জন্য একটি সংখ্যা, যা দিয়ে তাদের দক্ষতা নির্ণয় করা হয়। যদি কোন সাইক্লিস্ট এর এডিংটন নাম্বার ৭০ হয়, তার মানে হল তিনি মোট ৭০ বার একদিনে ৭০ মাইলের বেশি অতিক্রম করেছেন।

চন্দ্রশেখর সীমার যৌক্তিকতা নিয়ে এডিংটন-চন্দ্রশেখর বিবাদ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি খুবই আকর্ষণীয় ঘটনা । এডিংটন সেকালের খ্যাতনামা জ্যোর্তিপদার্থবিদ, কেম্ব্রিজে প্লুমিয়ান প্রফেসর । আর চন্দ্রশেখর কেম্ব্রিজের পি-এইচ. ডি করতে আসা ভারতের এক অখ্যাত মেধাবি ছাত্র।চন্দ্রশেখরের পি-এইচ. ডি গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য ছিল যে সব নক্ষত্রের ভর সূর্যভরের তুলনায় ১.৪ গুণের চাইতে বেশী তারা শ্বেত বামনে পরিণত হবে না। এই গণ্ডিরই নাম ‘চন্দ্র শেখর সীমা’ (Chandrashekhar’s Limit), যা আজ পদার্থবিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত। যে সব তারকা এই গণ্ডির মধ্যে পরে তাদের সবাইকে শ্বেত বামনের ভাগ্য বরণ করতে হয়। কিন্তু এর চাইতে বড় তারকাদের ভাগ্যে কি ঘটবে চন্দ্রশেখর কিন্তু তখন সে সম্পর্কে পরিস্কার করে কিছু বলতে পারেন নি, আর তাঁর বিরূদ্ধে থেকে শাণিত আক্রমণ এসেছিল ও দিক থেকেই! এডিংটন চন্দ্রশেখরের গবেষণাকে এক ফুঁ এ উড়িয়ে দিয়ে তার গবেষণাকে “নাক্ষত্রিক ভাড়ামি” (Stellar Buffoonery) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন । ১৯৩৫ সালে ১১ই জানুয়ারিতে লন্ডনে রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান সমতির সদস্যদের সামনে জ্যোতির্পদার্থবিদের মহাপুরোহিত সেদিন সমিতির বিজ্ঞ সদস্যদের সম্মূখে তরুণ ভারতীয় ছাত্রকে মমতাহীনভাবে ছিন্নভিন্ন করেন। সবচাইতে দুঃখজনক হল সমিতির শ্রোতাদের মধ্যে কেউ সাহস করে চন্দ্রের ফলাফলের পক্ষে কথা বলেন নি, এমন কি সহানুভূতিও জানান নি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, চন্দ্র শেষ মেষ ইংল্যান্ড ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছেলেন, কারণ তিনি বেশ বুঝেছিলেন এডিংটনের দেশে আর যাই হোক ভাল কোথাও চাকরি পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।

এডিংটন ২২নভেম্বর,১৯৪৪ সালে কেমব্রিজের ইভলিন নার্সিং হোমে ক্যান্সারের জন্য মারা যান।তার শরীর ২৭ নভেম্বর ১৯৪৪ সালে কেমব্রিজ শ্মশানঘাট (কেমব্রীজশায়ার )-এ শবদাহ করা হয়। তার দেহাবশেষ কেমব্রিজের আ'সেনশন প্যারিশ কবরখানায় তার মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা। তার মৃত্যুদিনে তার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা !

তথ্যঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Arthur_Eddington
আংশিক ক্রেডিটঃ somewhereinblog.net

লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পেইজ

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: