Header Ads

কল্পবিজ্ঞানের জন্মকথা

কল্পবিজ্ঞানের জন্মকথা

এই লেখাতে পশ্চিমী সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের জন্ম নিয়েই আলোচনা করব। বাংলা সাহিত্যের এই ধারা অপেক্ষাকৃত নতুন, পশ্চিমের প্রভাবেই তার আবির্ভাব। অবশ্য একটা সাধারণ ধারণা আছে যে সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞান কোনো সাহিত্যেই খুব প্রাচীন নয়। কথাটা খুব ভুল নয়। বিজ্ঞান বলতে আমরা আজ যা বুঝি, সেই বিষয়টা নিজেই খুব প্রাচীন নয়। পরীক্ষানিরীক্ষা এবং প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে সমস্ত পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা – খুব সংক্ষেপে বললে একেই আমরা আজ বিজ্ঞান বলি। এর জন্ম হয়েছিল ইউরোপে খ্রিস্টিয় সপ্তদশ শতক নাগাদ। অবশ্যই প্রাচীন ইউরোপে আরিস্টটল বা আর্কিমিডিসের মতো বিজ্ঞানীরাও ছিলেন যাঁরা আধুনিক অর্থেও বিজ্ঞান গবেষণা করেছেন – অর্থাৎ পরীক্ষানিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে সাধারণ নিয়মে পৌঁছোবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সে সময়ের সমাজ দৈবকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বিজ্ঞানের উপর ভরসা করার কথা চিন্তাই করতে পারেনি।

কল্পবিজ্ঞান কাকে বলব? অন্য সাহিত্যের সঙ্গে তার পার্থক্য কী? খুব আঁটোসাঁটো সংজ্ঞার মধ্যে না গিয়ে বলতে পারি যে ধরণের সাহিত্য বিশেষভাবে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির উপর নির্ভর করে এবং সাধারণত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক দূরের কোনো পরিস্থিতির বর্ণনা করে, তাকে কল্পবিজ্ঞান বলতে পারি। ভিন্ন গ্রহে অভিযান, টাইম ট্রাভেল অর্থাৎ অতীত বা ভবিষ্যতে যাত্রা, মানুষ ছাড়া অন্য বুদ্ধিমান প্রাণী বা চেতনা সম্পন্ন যন্ত্র – এই ধরনের নানা সূত্র নিয়ে লেখা গল্পই আজকের দিনে কল্পবিজ্ঞানের মধ্যে পড়বে। অনেক সময়েই তা ভবিষ্যতের কথা বলে; কখনো বা আবার বিকল্প ইতিহাসও কল্পবিজ্ঞানে জায়গা করে নেয়। তবে আজকে যা আমাদের কল্পনাতেই আছে, পরে তাই হয়তো কঠিন বাস্তব হয়ে দাঁড়াবে। আজ এরোপ্লেনের গল্প কল্পবিজ্ঞান পদবাচ্য নয়। কিন্তু জুলে ভের্নের ১৮৮৬ সালে লেখা আকাশযানের গল্প নিশ্চয় সায়েন্স ফিকশন। আর একটা বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত, কল্পবিজ্ঞানের গল্পে অলৌকিকতার কোনো জায়গা নেই।

আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মের আগে কল্পবিজ্ঞান থাকতে পারে কি? মানুষের যে কোনো কীর্তি তার সমাজের ফসল। আমরা দেখার চেষ্টা করব কোন পরিস্থিতিতে কল্পবিজ্ঞানের উদ্ভব সম্ভব হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মের আগে কিছু কিছু এমন কাহিনি লেখা হয়েছিল যাদের কল্পবিজ্ঞানের ভ্রূণ বলা যেতে পারে, কিন্তু তাদের কোনোটাকেই আধুনিক অর্থে কল্পবিজ্ঞান বলা যায় না। পুষ্পক রথ মানুষের আকাশে ওড়ার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ, তার মধ্যে বিজ্ঞানের ছিটেফোঁটাও নেই। তাই রামায়ণ মহাভারত বা ইলিয়াড ওডিসি মহাকাব্য, কল্পবিজ্ঞান নয়।

তবে কল্পবিজ্ঞানকে অন্য সাহিত্যের তুলনায় অর্বাচীন বলার আগে একবার ভেবে নেওয়া উচিত কথাসাহিত্যের কোন কোন শাখা তার চেয়ে বেশি প্রাচীন। আমরা মহাকাব্য বা কবিতাকে আমাদের আলোচনা থেকে বাদ রাখছি - স্পষ্টতই তারা অনেক বেশি পুরানো। অন্য যে ধরণের সাহিত্য আছে,যেমন ভ্রমণ কাহিনি, স্মৃতিকথা, জীবনচরিত বা আত্মজীবনী ইত্যাদি, যেখানে কল্পনার স্থান কম,তাদেরও আমরা আলোচনায় আনছি না। কথাসাহিত্য বলতে প্রথমেই যার কথা মনে আসে, তা হল উপন্যাস। উপন্যাস বলতে আমরা আজ যে ধরণের সাহিত্যকে বুঝি, তার প্রথম উদাহরণ সম্ভবত ১৬০৫ সালে সার্ভেন্টেস রচিত ‘ডন কিয়োটে’ (Don Quixote)। ছোটো গল্পের জন্মকালকে এরকম নির্দিষ্টভাবে চিহ্ণিত করা কঠিন। তাহলেও আধুনিক ছোটো গল্পকে সম্ভবত আরও পরের সৃষ্টি ধরতে হবে। কল্পবিজ্ঞানের জন্ম কবে?

সচেতন ভাবে বিজ্ঞানের তথ্যের উপর নির্ভর করে লেখা প্রথম গল্প সম্ভবত ‘সোমনিয়াম’ অর্থাৎ স্বপ্ন। লাতিন ভাষায় লেখা এই কাহিনিকে লেখক স্বপ্ন আকারে বর্ণনা করেছেন। চাঁদ থেকে পৃথিবীকে কেমন দেখতে লাগে, অন্য গ্রহ তারাদের অবস্থানেই বা কী পরিবর্তন দেখা যায়, চাঁদে যেতে মানুষের কী সমস্যা হয় (বাতাসের অভাব, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ইত্যাদি), চাঁদের প্রাণিরা কেমনভাবে বাস করে, সবই লেখক স্বপ্নে দেখেছেন। ভিন গ্রহের বাসিন্দাদের নিয়ে লেখা গল্পের সেই শুরু। গল্পের এক অন্যতম চরিত্র হলেন বিখ্যাত জ্যোর্তিবিদ টাইকো ব্রাহে যার কাছে গল্পের নায়ক জ্যোর্তিবিজ্ঞান শিখেছেন।

উল্লেখযোগ্য যে বইটি লেখা হয়েছিল ১৬০৮ সালে, অর্থাৎ ‘ডন কিয়োটে’ প্রকাশের পরে পরেই। বিজ্ঞানীদের কল্পবিজ্ঞান লেখার একটা ধারা বহুদিন ধরেই চলে আসছে। আমরা অনেকেই জগদীশচন্দ্রের ‘পলাতক তুফান’-কে বাংলা ভাষায় প্রথম বিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প বলে মনে করি। এই ধারার মধ্যেই পড়বেন ইরাসমাস ডারউইন, ফ্রেড হয়েল, কার্ল সাগান বা আমাদের দেশের জয়ন্তবিষ্ণু নার্লিকারের মতো বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের সৃষ্ট সাহিত্য। এই ট্রাডিশন শুরু হয়েছি ‘সোমনিয়াম’ দিয়ে, আর এর লেখক নিঃসন্দেহে কল্পবিজ্ঞানের লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী। জোহানেস কেপলার নিজেও প্রথম জীবনে ছিলেন টাইকো ব্রাহের সহকারী। ‘সোমনিয়াম’ লেখার এক বছরের মধ্যে তিনি গ্রহদের গতিবিধি সংক্রান্ত তাঁর বিখ্যাত দুটি সূত্র আবিষ্কার করেন। তৃতীয় সূত্রটি তিনি প্রকাশ করেন ১৬১৯ সালে। তবে বিজ্ঞানকে গল্প লেখার কাজে ব্যবহার করলেও সোমনিয়াম কখনোই আধুনিক কল্পবিজ্ঞান নয় কারণ কেপলার অনেক সময়ই অলৌকিক ঘটনার উপর নির্ভর করেছেন।

কল্পবিজ্ঞানের জন্মকথা
জোহানেস কেপলার

লাতিন ভাষা পণ্ডিতরা ছাড়া কেউ পড়তে পারত না বলে সাধারণে এই কাহিনির বিশেষ প্রচার হয়নি। ফ্রান্সিস বেকন ইংরাজিতে লেখা তাঁর ‘নিউ আটলান্টিস’ (১৬২৭) বইতে এক আদর্শ সমাজ ব্যবস্থার কথা বলছিলেন। কল্পবিজ্ঞান না বলে তাকে তাঁর দর্শনের পরিচায়ক লেখা বলাই সমীচিন। আধুনিক জীবনের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক এতটাই ওতপ্রেত যে ভবিষ্যত সমাজের কথা লিখতে গেল বিজ্ঞানকে সরিয়ে রাখা যায় না। অল্ডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’-কে আমরা যদি কল্পবিজ্ঞান বলি,তাহলে ‘নিউ আটলান্টিস’ বা অরওয়েলের ‘নাইন্টিন এইটি ফোর’-ও হয়তো বাদ যাবে না। আধুনিক পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের দার্শনিক তাৎপর্য প্রথম ব্যাখা করেছিলেন বেকন, তাই কল্পবিজ্ঞানের রাজ্যে তাঁর পদচারণা সম্ভবত আকস্মিক নয়।

‘গালিভার্স ট্রাভেলস’-কে (১৭২৬) আমরা কল্পবিজ্ঞান বলব কি? জোনাথন সুইফটের নায়ক গালিভার লিলিপুট, ব্রবডিংনাগ, লাপুটা ইত্যাদি দেশে গিয়েছিলেন। সে সমস্ত দেশের অধিবাসীদের জীবন, সমাজব্যবস্থা, বিজ্ঞান ইত্যাদির যে বর্ণনা সুইফট দিয়েছেন, তা আধুনিক কল্পবিজ্ঞানে ভিন গ্রহের প্রাণীদের বর্ণনার সঙ্গে তুলনীয়। মঙ্গলের মানুষকে নিয়ে লেখা কাহিনি যদি কল্পবিজ্ঞান হয়,তাহলে লিলিপুটদের গল্পকে বাদ দেব কি? আধুনিক ‘প্ল্যানেট অফ দি এপস’ গল্পে বনমানুষরা মানুষের থেকে উন্নত বুদ্ধিমান প্রাণী – তা সম্ভবত গালিভারের হুইঁয়ামদের দেশে অভিযান পড়ে লেখা। সেখানে মানুষের মতো প্রাণী ইয়াহুরা বর্বর, হুইঁয়াম নামক ঘোড়ারা সভ্য ও বুদ্ধিমান। লাপুটাতে আকাশ থেকে মাটিতে পাথর বর্ষণের কথা পড়লে আধুনিক এরোপ্লেনের কথা মনে পড়ে যায়। তবু ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’-কে হয়তো কল্পবিজ্ঞান বলব না। এটা আসলে ব্যাঙ্গাত্মক লেখা যা পরবর্তীকালে নিঃসন্দেহে কল্পবিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছে।

কল্পবিজ্ঞানের জন্ম যে সময়েই ধরি না কেন, স্বীকার করতেই হবে ঊনবিংশ শতকের আগে সাহিত্যে তার ভূমিকা ছিল নিতান্তই নগণ্য। তার মুখ্য কারণ অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের প্রকাশ্য প্রভাব ছিলনা বললেই হয়। গ্যালিলিও বা নিউটন উচ্চশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে বিজ্ঞান সম্পর্কে যতই আগ্রহের জন্ম দিন না কেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে তার সঞ্চার ঘটেনি।

এর পাশাপাশি ছিল সমাজে ধর্মের সর্বগ্রাসী প্রভাব। ঈশ্বর বা দেবতাদের ইচ্ছাই যদি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে বিজ্ঞানের স্থান কোথায়? আধুনিক অর্থে ব্যক্তি মানুষও সেখানে পার্শ্বচরিত্রের বেশি কোনো ভূমিকা নিতে পারে না। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে আমরা মহাকাব্যের চরিত্রদের দেবত্ব বাদ দিয়ে তাদের মানবরূপে ব্যাখ্যা করি, তার পিছনে যথেষ্ট যুক্তিও আছে। কিন্তু সে যুগের পাঠক বা শ্রোতার কাছে আমাদের এই ব্যাখ্যা অবোধ্য ঠেকত। রামায়ণের মূল চরিত্র রাম বা মহাভারতের মূল চরিত্র কৃষ্ণ শেষ বিচারে দেবতা, সাধারণ মানুষ নন। মনে রাখতে হবে ব্যক্তি মানুষই কল্পবিজ্ঞান কাহিনির একটা প্রধান ভিত্তি; তার সাফল্য ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করেই গল্প আবর্তিত হয়।

সমাজ প্রগতি বা বিবর্তন কল্পবিজ্ঞানের একটা বড়ো অংশ জুড়ে আছে। এই ধারণাও অপেক্ষাকৃত আধুনিক – মধ্যযুগ সে কথা কল্পনাতেও আনেনি। কোনো এক কাল্পনিক রামরাজ্য বা স্বর্গই ছিল তার আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। মানুষের ইতিহাস ছিল অতীতের সত্যযুগ বা গার্ডেন অফ ইডেন থেকে পতনের ইতিহাস। আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য হল জীবনযাত্রার উন্নতি ও সমাজের পরিবর্তন – কল্পবিজ্ঞানও তার কথাই বলে। মধ্যযুগে তাই কল্পবিজ্ঞানের জন্ম সম্ভবপর ছিল না। আধুনিক যুগের নবজাগ্রত মানবতাবাদ একই সঙ্গে ব্যক্তির উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করল এবং ধর্মের নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা শুরু করল। তার পরেই কল্পবিজ্ঞানের আবির্ভাব সম্ভব হয়।

কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন প্রমুখের গবেষণা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বেঁধে দিয়েছিল প্রকৃতির নিয়মে, সেখানে দৈবের স্থান কোথায়? (অথচ এই তিনজনই ছিলেন গভীরভাবে ঈশ্বরবিশ্বাসী।) এর পর স্বাভাবিক ভাবেই সমাজে ধর্মের শৃঙ্খল আলগা হয়ে আসে। অন্য নক্ষত্রের গ্রহে প্রাণের কথা বলার জন্য জিওদার্নো ব্রুনোর মতো কাউকে পুড়ে মরতে হয় না। ১৭৫২ সালে ভলটেয়ার লেখেন তাঁর ছোটো গল্প ‘মাইক্রোমেগাস’। লুব্ধক নক্ষত্রের প্রাণি মাইক্রোমেগাস এবং শনিগ্রহ থেকে তার এক সঙ্গী পৃথিবীতে এসে কী দেখেছিল তাই নিয়েই গল্প। ফরাসি এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকিত যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক তাঁর এই গল্পে ক্যাথলিক ধর্ম, রাজতন্ত্র ও যুদ্ধকে তাঁর বিদ্রূপবাণে বিদ্ধ করেছিলেন।
অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ সমাজের গোড়া ধরে টান দেয়। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ফরাসি বিপ্লবে ফেটে পড়ে এবং সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ইংল্যাণ্ডে শুরু হয় শিল্প বিপ্লব যা ক্রমশ ইওরোপের অন্য দেশে ও আমেরিকাতে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়েই প্রকাশিত হয় সেই উপন্যাস যা অনেকের কাছেই একই সঙ্গে চিরায়ত সাহিত্য ও প্রথম কল্পবিজ্ঞান বলে পরিচিত। তা হল মেরি শেলির লেখা ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ (১৮১৮)। এখানে একই সঙ্গে কল্পবিজ্ঞানের কয়েকটি কাহিনিসূত্রের সূচনা দেখতে পাই। বিজ্ঞানীর আগুপিছু বিবেচনা না করে করা গবেষণা এবং তা থেকে ক্ষতি, মানুষের মতো নতুন জীব (রোবোটের পূর্বসূরী?) সৃষ্টি, সেই জীবের নিজস্ব সমস্যা —এই ধারাগুলি কল্পবিজ্ঞানে ফিরে ফিরে এসেছে।

কল্পবিজ্ঞানের জন্মকথা
মেরি শেলি (শিল্পী রিচার্ড রথওয়েল)

ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গেই যে কল্পবিজ্ঞানের সূচনা হয়েছিল, তা সমাপতন নয়। শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণ মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন ঘটে, যদিও তা কোনোমতেই অবিমিশ্র ভালো ছিল না। ১৮০৫ সালে লণ্ডনের পথে দেখা দিল গ্যাসের আলো, আরও আগে থেকেই কারখানাতে শুরু হয় গিয়েছিল তার ব্যবহার। ঊনবিংশ শতকের প্রথম দুই দশকের মধ্যে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় বাষ্পচালিত রেলগাড়ি চালু হয়ে গেল। ১৮০৮ সালে প্রথম বাষ্পচালিত স্টিমার বানালেন আমেরিকাতে রবার্ট ফুলটন। ১৮৩৭ সালে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিল প্রথম স্টিমার। বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও আবিষ্কার আর বিদগ্ধদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। মনে রাখতে হবে শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি যাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই বিজ্ঞানী ছিলেন না,পুঁথিগত পড়াশোনা তাঁদের ছিল খুবই কম। স্টিম ইঞ্জিনের নির্মাতা জেমস ওয়াটের স্কুলে পড়াশোনা বিশেষ হয়নি। যন্ত্রচালিত তাঁতের আবিষ্কারক জেমস হারগ্রিভস ছিলেন নিরক্ষর। রবার্ট ফুলটনের প্রথাগত শিক্ষা স্কুলের গন্ডির বেশি এগোয় নি। রেল ইঞ্জিনের আবিষ্কারক জর্জ স্টিফেনসন ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত লিখতে পড়তে শেখেন নি। বিদ্যুৎকে কাজে লাগানোর পিছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি, সেই মাইকেল ফ্যারাডে কোনো স্কুল কলেজে পড়েন নি, বই বাঁধাইয়ের কাজ করতে করতে পড়তে শিখেছিলেন। (তবে ফ্যারাডে প্রকৃত অর্থে বিজ্ঞানীই ছিলেন, ঊনবিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ তিন বিজ্ঞানীর নাম বললে তাঁর কথা আসবেই।) ফরাসি বিপ্লব মানুষকে শেখায় সমাজ চিরকালের জন্য অপরিবর্তনীয় নয়, মানুষ নয় শুধুমাত্র ভাগ্যের হাতের খেলনা। শিল্পবিপ্লব দেখিয়ে দেয় বিজ্ঞানের হাতেই আছে সমাজ পাল্টানোর চাবিকাঠি। সেই সময়েই প্রকৃত কল্পবিজ্ঞানের জন্ম সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানের শক্তির উপর নির্ভরতা থেকেই বৈজ্ঞানিকের হাতে প্রাণ সৃষ্টির গল্প বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে।

কল্পবিজ্ঞান কতখানি সমকালের দ্বারা প্রভাবিত তা মেরি শেলির এই একটি উপন্যাস থেকেই স্পষ্ট। বইটির পুরো নাম হল ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন; অর, দি মডার্ন প্রমিথিউস’। মেরি শেলি যে সময় বইটি শেষ করছেন, সেই সময়েই তাঁর স্বামী শুরু করছেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’ – এ সমাপতন হতে পারে না। অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যক্তি মানুষের বিদ্রোহ মূর্ত হয়েছিল শেলির এই কাব্যনাটকে। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নতুন প্রাণ সৃষ্টির সাহস দেখিয়েছিলেন, ভাগ্য তাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিল। গ্রিক পুরাণের প্রমিথিউস মানুষকে আগুন এনে দিয়েছিল বলে দেবতারা তাকে শাস্তি দিয়েছিলেন। শেলির নাটকে প্রমিথিউস শেষ পর্যন্ত দেবতাদের পরাজিত করেছিল। নাস্তিকতার স্বপক্ষে শেলির উচ্চকিত ঘোষণা ‘দি নেসেসিটি অফ এথেইজম’-ও কি মেরি শেলিকে প্রভাবিত করেনি? তা না হলে কোথা থেকে তিনি জড় পদার্থ থেকে বুদ্ধিমান জীব সৃষ্টিতে ঈশ্বরের ভূমিকা অস্বীকার করার সাহস পেলেন? আধুনিক বিজ্ঞানই এই নাস্তিকতাকে পুষ্ট করেছিল। দৈবকে অগ্রাহ্য করে কল্পবিজ্ঞান লেখা তার ফলে সম্ভব হয়েছিল।

মেরি শেলির একটি তুলনায় অপরিচিত রচনা ‘দি লাস্ট ম্যান’ (১৮২৬) কল্পবিজ্ঞানের অন্য একটি ধারার জন্ম দিয়েছিল। মানুষজাতির সমাপ্তি আগেও অনেক বইতে এসেছে, কিন্তু তারা সবাই স্পষ্টতই বাইবেলের দ্বারা প্রভাবিত। মেরি শেলির লেখাতে কোনো দৈব ঘটনা নয়, মানুষের মৃত্যু এনেছে প্লেগ। মেরি শেলি শুধু গুটি বসন্ত সংক্রান্ত জেনারের গবেষণা নয়, রোগসংক্রমণ বিষয়ে সমকালীন ধারণা বিষয়ে পরিচিত ছিলেন, তা তাঁর লেখা থেকে স্পষ্ট। প্রকাশের পরে লেখাটি খুবই বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হয়। কিন্তু আজ যখন পারমাণবিক অস্ত্র, বিশ্ব উষ্ণায়ন বা দূষণ সত্যিই মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, ‘দি লাস্ট ম্যান’ আবার ফিরে পড়া শুরু হয়েছে। এখন এই বইকেই প্রথম যথার্থ কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস বলে ধরা হয়।

শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কল্পবিজ্ঞান কাহিনির শুধু যে চাহিদা বাড়ে তা নয়, তা নতুন নতুন ধারায় প্রবাহিত হয়। আধুনিক যুগে শিক্ষা যে শুধু সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছোল তা নয়, তার চরিত্রেরও বদল ঘটল। ধর্মভিত্তিক শিক্ষার জায়গা নিল ধর্মনিরপেক্ষ বিজ্ঞাননির্ভর শিক্ষা। ফরাসি সাহিত্যিক জুলে ভের্ন থেকে আমরা কল্পবিজ্ঞানের এক নতুন ধারাকে শুরু হতে দেখি। বিজ্ঞানের তথ্যের প্রতি ইঙ্গিত নয়, ভের্ন তাঁর লেখাতে সরাসরি বিজ্ঞানকে নিয়ে এলেন। যেমন ‘ফ্রম দি আর্থ টু দি মুন’ (১৮৬৫) উপন্যাসে তিনি কামানের গোলাতে করে চাঁদে যাওয়ার কথা লিখেছিলেন। সেখানে ভের্ন নিউটনিয় গতিবিদ্যার অঙ্ক কষে দেখালেন গোলার বেগ কত হলে তা চাঁদে পৌঁছোবে, উপবৃত্ত বা পরাবৃত্ত নিয়ে আলোচনা করলেন, এমনকি গোলা ছুঁড়তে কত পরিমাণ বারুদ লাগবে তাও পাঠককে বুঝিয়ে দিলেন। ‘দি পারচেজ অফ দি নর্থ পোল’ (১৮৮৯) উপন্যাসের কাহিনির মূল সূত্রই হল অঙ্কের ভুল। ১৮২০ সালে প্রতি একশ জন ফরাসির মধ্যে ৩৮ জন পড়তে পারত, পঞ্চাশ বছর পরে সেই সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছিল ৭০। শুধু সংখার বৃদ্ধি নয়, ভের্ণের বিপুল জনপ্রিয়তা থেকে বোঝা যায় যে তখনকার পাঠকদের এক বিরাট অংশ এই ধরনের লেখা পড়তে প্রস্তুত, অর্থাৎ সার্বজনীন শিক্ষার মানও অনেকটা এগিয়েছে। মনে রাখতে হবে ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইনের ‘দি অরিজিন অফ স্পিসিস’ প্রকাশের প্রথম দিনেই সমস্ত কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি সমসাময়িক মানুষের কতখানি আকর্ষণ জন্মেছিল তা এই একটি ঘটনা থেকে বোঝা যায়।

কল্পবিজ্ঞানের জন্মকথা
জুলে ভের্ন

যন্ত্রনির্ভর নতুন সভ্যতা জন্ম দেয় নতুন সমস্যার, প্রয়োজন হয় নতুন মূল্যবোধের -- সাহিত্যে তার ছাপ অবশ্যই পড়েছিল। কল্পবিজ্ঞানও সেই সমস্ত সমস্যাদের সামনে এনেছিল। স্যামুয়েল বাটলার ১৮৭২ সালে প্রকাশ করেছিলেন ‘এরহোন’। মূলত ভিক্টোরিয় সমাজকে ব্যঙ্গ করলেও কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসেও বইটি বিখ্যাত। গল্প স্পষ্টতই চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ দ্বারা প্রভাবিত -- কল্পবিজ্ঞানের এই লেখাতেই সম্ভবত প্রথম প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা এসেছে। এই বইতেই আমরা প্রথম দেখতে পাই যন্ত্র অবিমিশ্র ভালো নাও হতে পারে, তারও অনেক খারাপ দিক আছে। বুদ্ধিমান যন্ত্রের কথা আজ অনেক গল্পেই পাওয়া যায়, তার সূচনাও হয়েছিল এখানে। যখন দৈনন্দিন জীবনে যন্ত্র অনেকটা জায়গা নেয়, একমাত্র তখনই মানুষের মনে আসতে পারে এই সমস্ত প্রশ্ন। এই বইও তাই যান্ত্রিক সভ্যতার যুগের আগে লেখা সম্ভব ছিল না।

সাধারণ মানুষের মধ্যে মনোবিজ্ঞানের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে উনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে। এই বিষয়টা আধুনিক কল্পবিজ্ঞান লেখকদেরও বেশ প্রিয়। একে গল্পের উপজীব্য প্রথম করেছিলেন রবার্ট লুই স্টিভেনসন। তাঁর ‘স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ডক্টর জেকিল এণ্ড মিস্টার হাইড’ (১৮৮৬) একই মানুষের মধ্যের দ্বৈত সত্তাকে বাইরে আনল। ১৮৮০-র দশকেই এই দ্বৈত সত্তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন ডক্টর পিয়ের জ্যানেট। হিপনোসিস বা ওষুধের সাহায্যে শুধু মানুষ নয়,গোটা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার কাহিনি এখন খুবই পরিচিত। ১৮৭২ সালেই ভের্ন লিখেছিলেন ‘ডক্টর অক্সেস এক্সপেরিমেন্ট’। অক্সিজেন গ্যাস ব্যবহার করে একটা শহরের সমস্ত মানুষের ব্যবহার পালটে দিয়েছিলেন ডক্টর অক্স।

কল্পবিজ্ঞানের অপর এক স্রষ্টার কথা বলে শেষ করব। এই সাহিত্যের ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে সবচেয়ে বিখ্যাত লেখক হলেন এইচ জি ওয়েলস। ‘দি টাইম মেশিন’ (১৮৯৫) গল্পে তিনি সায়েন্স ফিকশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারাগুলোর একটির, অর্থাৎ টাইম ট্রাভেলের জন্ম দিয়েছিলেন। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত হল ‘দি ওয়ার অফ দি ওয়ার্ল্ডস’। ওয়েলস বুঝতে পেরেছিলেন ভবিষ্যৎ যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণ করবে বিজ্ঞান প্রযুক্তি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তখন মধ্যগগনে, বিজ্ঞানপ্রযুক্তিতে উন্নতির সুযোগ নিয়ে স্বল্পসংখ্যক ব্রিটিশ তাদের পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যের বিশাল সংখ্যার মানুষের উপর প্রভুত্ব করছে। ওয়েলসের গল্পে মঙ্গলের অধিবাসীরা সংখ্যায় সামান্য হয়েও সহজেই পৃথিবী দখল করতে পারল। ওয়েলস এমনকি গল্পের মধ্যেই সরাসরি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের অমানবিক রূপের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। রাসয়ানিক অস্ত্র, জীবাণু যুদ্ধ -- অনেক দিক থেকেই গল্পটিতে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত আছে।

কল্পবিজ্ঞানের জন্মকথা
এইচ জি ওয়েলস

উনবিংশ শতক শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কল্পবিজ্ঞানের প্রথম যুগের অবসান বলে ধরে নেওয়া যায়। আমরা বলতে পারি ভের্ন ও ওয়েলসের হাত ধরে সে সাবালকত্ব লাভ করে এবং এক বিশেষ ধরনের সাহিত্য বলে স্বীকৃতি পায়। তার পর এই ধারা আরও বিকশিত হয়েছে। এমন কী কয়েকজন নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিকও কল্পবিজ্ঞানে হাত লাগিয়েছেন। শুধু বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতি যে কল্পবিজ্ঞানের উপাদান জুগিয়েছে তা নয়। নতুন ঐতিহাসিক তথ্য, সমাজবিকাশের ধারা সম্পর্কে নতুন ধারণা, ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা – নানা ক্ষেত্র থেকে লেখকরা গল্পের মশলা জোগাড় করেছেন।
আলোচনা সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে কল্পবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও বইয়ের কথা লেখার সুযোগ হলো না। যে কটি উদাহরণ দেওয়া হল, তার থেকে বোঝা যায় কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য যে ঊনবিংশ শতাব্দিতেই শুরু হয়েছিল, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ,নবজাগ্রত মানবতাবাদ, সমাজে ব্যক্তি মানুষের গুরুত্ব বৃদ্ধি, সার্বজনিক শিক্ষার প্রসার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গুরুত্ব হ্রাস – এই সমস্তই কল্পবিজ্ঞানকে বিস্তারে সাহায্য করেছে। তুলনীয় একটা উদাহরণ দেখা যাক। খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দিতে আলেকজান্ড্রিয়াতে বিজ্ঞানী হেরো প্রথম বাষ্পীয় ইঞ্জিন বানিয়েছিলেন। কিন্তু যে সমাজ দাসেদের শ্রমের উপর নির্ভর করে, সেখানে যান্ত্রিক আবিষ্কার শুধুমাত্র খেলনা হয়ে থাকতে বাধ্য। তাই প্রায় সতেরশো বছর পরে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবার আবিষ্কৃত হয় এবং তার ব্যবহার শুরু হয়। ঠিক তেমনি তার নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্যই কল্পবিজ্ঞান মধ্যযুগে কখনোই জন্ম নিতে পারত না। উনবিংশ শতক পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার শারদীয় ২০১৬, পরিমার্জিত

লেখক পরিচিতি

Gautam Gangopadhyay

লিখেছেনঃ GAUTAM GANGOPADHYAY
Professor at Calcutta University

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে । সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: