Header Ads

এডুইন হাবল - আধুনিক কসমোলজির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন যিনি

এডুইন হাবল - আধুনিক কসমোলজির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন যিনি

আমরা জানি , মহাবিশ্ব স্থির না ! দূর আকাশের বস্তু গুলি একে অপরের থেকে প্রচণ্ড গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে ! এমনকি দৃশ্যমান মহাবিশ্বের পরের বস্তুগুলি আমাদের সাপেক্ষে আলোর চাইতেও বেশি গতিতে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে !নিউটনের পরম মহাবিশ্বতত্ত্বের বাহিরে তার আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ভাবনা বদলে দেন আলবার্ট আইনস্টাইন।

তার আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব এবং আপেক্ষিকতার সাধারণ বা ব্যাপক তত্ত্ব দুইটিই বিজ্ঞানের জগতে প্রতিষ্ঠিত করে এক আপেক্ষিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, যেখানে এক কাঠামো সাপেক্ষে অন্য জেকন কিছু সুস্থির নয় ! তবে বিজ্ঞানিমহলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি এক নতুন সমস্যা নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। সমস্যাটি ছিল মহাবিশ্বের প্রকৃতি এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে,যদিও তার মত বিজ্ঞানীর অবশ্য এসব সমস্যা নিয়ে খুব বেশি হাবুডুবু খাওয়ার কথা নয়। তার আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে পরম মহাবিশ্ব ধারনার অবসান ঘটলেও তিনি গ্রহ,নক্ষত্র ও ছায়াপথদের গতি নয়ে অনেকগুলো হিসেব মিলাতে পারছিলেন না। তারমতে মহাবিশ্ব হল স্থির।যিনি নিউটনের চীরচেনা পরম মহাবিশ্বের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বানিয়েছিলেন আপেক্ষিকতার এক নতুন জগৎ, যিনি সবসময়ই স্থবিরতার বিপক্ষে ছিলেন সারা জীবন ধরে, সেখানে তিনি কেন স্থবির মহাবিশ্বকে সত্য বলে ভেবে নিয়েছিলেন তা সত্যিই বিশ্বয়কর ।

সেই সময়ে প্রসারনশীল মহাবিশ্ব তত্ত্ব নিয়ে অনেকে তার সামনে হাজির হলেও তিনি তা এড়িয়ে যান । কিন্তু, কেন একে অপরকে আকর্ষণ করা সত্ত্বেও মহাবিশ্বের সবকিছু একে অপরের উপর হুমড়ি খেয়ে পরছে না তার সমাধান হিসেবে আবির্ভাব ঘটালেন মহাজাগতিক ধ্রুবকের । এই কন্সট্যান্টটিকে লাম্বডা(λ) দিয়ে প্রকাশ করা হয় এবং এর মান শূন্যের কাছাকাছি ।তিনি তার গাণিতিক সমীকরণে এই কাল্পনিক ধ্রুবক যোগ করে দিয়ে ভেবেছিলেন এতে করে মহাবিশ্ব চুপসে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ভারসাম্য বা স্থিতাবস্থায় থাকে। 

অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সংকুচিতও হয় না প্রসারিতও হয় না। সে সময় অধিকাংশ পদার্থবিজ্ঞানীরাই মহাবিশ্বকে এভাবে দেখতেন। তবে, সবক্ষেত্রেই কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম মানুষ থাকেন। সম্ভবত এডউইন হাবল তাদের একজন।১৯২৯ সালে এডুইন হাব্‌ল পরীক্ষা করে দেখলেন যে আমাদের আকাশগঙ্গা (milky way) ছায়াপথের (galaxy) বাইরের সমস্ত ছায়াপথ ক্রমশ আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং এই সরে যাওয়ার গতিবেগ ঐ ছায়াপথগুলির থেকে আমাদের দূরত্বের সমানুপাতিক। অর্থাৎ একটা ছায়াপথ আমাদের থেকে যত বেশি দূরে, তার সরে যাওয়ার গতিবেগও ততই বেশি। তার মানে আমাদের মহাবিশ্ব প্রকৃতপক্ষেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ আইনস্টাইনের স্থির মহাবিশ্বের ধারণা ঠিক নয়।

এর পরেই আইনস্টাইন ঐ বাড়তি রাশিটি তাঁর সমীকরণে যোগ করা প্রসঙ্গে হাসিমুখে বলেছিলেন, "সেটি তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় ভুল।" এইখানে বলে রাখা ভালো যে হাব্‌লের এই পরীক্ষাই প্রকৃতপক্ষে ‘বিগ ব্যাং’ মডেলের সপক্ষে অন্য‌তম যুক্তি। কারণ বিজ্ঞানীরা যখন জানলেন মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল, তখনই তাঁরা বুঝলেন যে অতীতে আমাদের এই বিশ্বজগৎ তা হলে অবশ্য‌ই আয়তনে ছোট ছিল এবং এই অতীতেরই কোনও একটা সময়ে তা হলে আমাদের ব্রহ্মাণ্ড ছিল এক চরম তাপমাত্রা ও অসীম ঘনত্বের অবস্থায় যেখান থেকে শুরু হয়েছিল তার সম্প্রসারণ, আর যা আজ ‘বিগ ব্যাং’ নামে পরিচিত। প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে মহাবিশ্বের দু’টি বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এর ফলে পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী আলো যখন এই দু’টি বিন্দুর মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব অতিক্রম করবে, তখন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য‌ যাবে বেড়ে। 

আমরা সবাই জানি যে একটা ট্রেন যখন দ্রুত বেগে আমাদের সামনে দিয়ে দূরে চলে যায় তখন তার তীক্ষ্নতা পরিবর্তিত হয়। উৎস এবং পর্যবেক্ষকের মধ্যেকার আপেক্ষিক গতিবেগের কারণে শব্দতরঙ্গের কম্পাঙ্কের এই পরিবর্তন ডপ্‌লার ক্রিয়া নামে পরিচিত। আলোক তরঙ্গের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য‌। দূরে সরে যাওয়া ছায়াপথ থেকে যে আলো আমাদের কাছে এসে পৌছায় সেই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য‌ও তাই তড়িৎ-চুম্বকীয় বর্ণালীর দৃশ্য‌মান অংশে লাল রঙের দিকে সরে যায়, কারণ বর্ণালীর মধ্যে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য‌ বেশি। এই ঘটনাকে cosmological redshift বলা হয়। আলোকে যত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, তার ‘রেডশিফ্‌ট্’-এর পরিমাণও ততই বাড়তে থাকে। যে যেহেতু আলো একটি নির্দিষ্ট গতিবেগে ছোটে, তাই হাব্‌ল বললেন যে একটি দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা আলোতে যে ‘রেডশিফ্‌ট্’ দেখা যাবে তা ঐ ছায়াপথটি থেকে দূরত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে হবে। এই সম্পর্কটিকে হাব্‌লের সূত্র বলা হয়। ডপলার ক্রিয়া সম্পর্কে পোস্টের লিঙ্ক নিচে সংযোজিত করা হয়েছে! হাবলের সূত্র পদার্থবিজ্ঞানের মহাকাশবিদ্যার একটি আবিষ্কার যা প্রকাশ করে, যা অনুসারে,

১) গভীর মহাকাশে যে সব বস্তু দেখা যায় তা পৃথিবীর সাপেক্ষে এবং একে অপরের সাপেক্ষে একটি আপেক্ষিক বেগে চলে! 

২)আর এই বেগ পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্বের সমানুপাতিক । মোটামুটিভাবে দুরবর্তী ছায়াপথ গুলির দূরত্ব এবং অপসারণ বেগের মধ্যে বিদ্যমান সমানুপাতিক সম্পর্ককে হাবলের নীতি বলে। এই সম্পর্কটিতে বেগ ও দূরত্বের অনুপাত যে ধ্রুবসংখ্যা তাকে হাবলের ধ্রুবক বলে। এই ধ্রুবকটিকে H বা H০ দ্বারা প্রকাশ করা হয়ে থাকে । বস্তুত পর্যবেক্ষণের উপযুক্ত মহাকাশ দিনে দিনে আয়তনে সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এ প্রকিয়ার সরাসরি সম্পর্ক প্রকাশ করে হাবলের নীতি।এটা প্রথম পর্যবেক্ষণশীল ভিত্তি যা সম্প্রসারিত মহাকাশ তত্ত্বকে প্রমাণ করে এবং বর্তমানে বিগ ব্যাং মডেল তত্ত্বের সমর্থনে অন্যতম প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

এডুইন পওয়েল হাবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় ১৮৮৯ সালের নভেম্বরের ২০ তারিখে জন্মগ্রহন করেন । তার বাবা জন পওয়েল হাবন ছিলেন বীমা অফিসার যিনি মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের অন্তর্গত মার্শফিল্ডে কাজ করতেন। এরপর তিনি শিকাগো এবং ইলিয়নিসে চাকুরির সুবাদে বদলি হয়ে গেলে , এডুইন হাবলও তার সাথে পারি জমান ।যেখানে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। হাবল ছোট থেকেই মেধাবি ও পরিশ্রমী ছাত্র হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন । তিনি তার স্কুলে সবসময় শুধু বানান শুদ্ধি ছাড়া সকল বিষয়ে প্রথম হতেন । ১৯১০ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। ভাল ছাত্রের পাশাপাশি তিনি একজন ভাল খেলোয়ার হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন । স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনি ফুটবল,বেসবল, বাস্কেটবল খেলতেন । তিনি স্কুল ও কলেজের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দৌড়বিদ হিসেবে অংশ নিতেন ! তিনি বাস্কেটবলের সেন্টার থেকে শুটিং গার্ড সব পজিশনে খেলতেন। 

এমনকি তার অধীনেই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ১৯০৭ সালে প্রথম বাস্কেটবল টাইটেল জিতে!স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য তিনি রোড্‌স বৃত্তি পান। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯১২ সালে তিনি আইন শাস্ত্রে একটি ডিগ্রী অর্জন করেন। অক্সফোর্ডের অধ্যয়ন শেষে ১৯১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে সপরিবারে কেন্টাকিতে বসবাস শুরু করেন। ১৯১৪ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্টাকি ও ইন্ডিয়ানা রাজ্যের উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুলে শিক্ষকতা এবং আইন ব্যবসা করে সময় কাটান। ১৯১৪ সালে উইসকনসিনে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ার্কস মানমন্দিরে একটি গবেষণার পদ লাভ করেন। এই পদে যোগ দেয়ার উদদদেশ্যে তিনি কেন্টাকি ছেড়ে উইসকনসিন যাত্র করেন। ১৯১৭ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন।

মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ হেল তাকে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরে কাজ করার জন্য নিমন্ত্রণ জানান।কিন্তু জর্জ হেলের দাওয়াত পাওয়ার সমসাময়িক কালেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪ - ১৯১৮) যোগ দেয়। হাবল হেলের আমন্ত্রন গ্রহণ না করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেয়। তার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনের জন্য গৃহীত মৌখিক পরীক্ষা শেষের মাত্র তিন দিনের মাথায় তিনি সেনাবাহিনীতে রিপোর্ট করেন। 

সেনাবাহিনী প্রথমে তাকে ফ্রান্সে পাঠায় এবং এরপর থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানিতে কর্মরত থাকেন। মেজর পদ নিয়ে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।অবশেষে ১৯১৯ সালে হাবল মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এই মানমন্দিরে একটি ১০০-ইঞ্চি (২.৫-মিটার) হুকার দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছিল। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত এই দূরবীনটি পৃথিবীর বৃহত্তম হুকার দূরবীন ছিল। কর্মজীবনের বাকি সময়টা তিনি এই মানমন্দিরে কাজ করেই কাটান; এখানেই তিনি জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ও পর্যবেক্ষণগুলো করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯ - ১৯৪৫) কারণে তার গবেষণা কর্ম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। এই মহাযুদ্ধের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিভাগের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।

ইয়ার্কস মানমন্দিরে কাজ করার সময় হাবল আকাশে কিছু কুণ্ডলাকার বস্তু খুব নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এই কুণ্ডলীহুলো ছিল পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান নীহারিকা। অবশ্য বর্তমানে একে আর নীহারিকা বলা যায় না। বর্তমানে একটি ছায়াপথের অভ্যন্তরে ধূলি এবং গ্যাসের মেঘকে নীহারিকা বলা হয়। হাবল যখন এই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নীহারিকা ও দূরবর্তী ছায়াপথসমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে পারতেন না। কারণ উভয়কেই কুণ্ডলীত বস্তুর মত দেখাতো।হাবল বিশেষত দুইটি নীহারিকার আচরণ নিয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেন। এই দুইটি ছিল বৃহৎ ম্যাজেলানিয় মেঘপুঞ্জ এবং ক্ষুদ্র ম্যাজেলানিয় মেঘপুঞ্জ (Magellanic Clouds)। ১৯১২ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরিয়েটা লিভিট ম্যাজেলানিয় মেঘপুঞ্জের দুটি তারার উজ্জ্বলতা নির্ণয় করে পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব বের করার চেষ্টা করেছিলেন। এই পর্যবেক্ষণ করতে যেয়ে তিনি বিষম তারা(variable star) এবং হলুদ তারা নিয়েছিলেন কারণ এদের উজ্জ্বলতা পরিবর্তিত হয়। বিষম তারার একটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে যত বেশি সময় লাগে এর উজ্জ্বলতাও তত বেশি হয়। অর্থাৎ এর গড় পরম মান তত বেশি হয়। একটি তারার প্রকৃত উজ্জ্বলতা এবং পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার তুলনা করে তিনি পৃথিবী থেকে তারাটির দূরত্ব পরিমাপ করেন। তারা বা নীহারিকাটির একটি পূর্ণ চক্রের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করার মাধ্যমে তিনি তার প্রকৃত উজ্জ্বলতা নির্ণয় করেছিলেন। লিভিট এবং তৎকালীন অন্যান্য বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছিলেন যে ম্যাজেলানিয় মেঘপুঞ্জ আকাশগঙ্গা ছায়াপথের সীমানার বাইরে অবস্থিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মানমন্দিরের হুকার দূরবীনটি ব্যবহার করে হাবল নীহারিকা সম্বন্ধে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি প্রথমেই আকাশগঙ্গার বাইরে অবস্থিত বলে ধারণা করা হতো এমন সব নীহারিকার অভ্যন্তরে কোন বিষম তারা আছে কিনা তা খুঁজতে লাগলেন। ১৯২৩ সালে তিনি অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার (বর্তমানে যা গ্রেট অ্যান্ড্রোমিডা কুণ্ডলাকার ছায়াপথ নামে পরিচিত) অভ্যন্তরে একটি বিষম তারা আবিষ্কার করেন। এর মাত্র এক বছরের মধ্যে অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার ভিতরে তিনি ১২ টি বিষম তারা আবিষ্কার করেন। এই বিষম তারাগুলোকে বিভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে তিনি বের করেন যে, পৃথিবী থেকে অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকার দূরত্ব প্রায় ৯০০,০০০ আলোক বর্ষ। আকাশগঙ্গার ব্যাস প্রায় ১০০,০০০ আলোক বর্ষ। সুতরাং হাবলের পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে যে অ্যান্ড্রোমিডা নীহারিকা পৃথিবীর ছায়াপথের বাইরে এবং এ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত।

হাবল অ্যান্ড্রোমিডা ছাড়াও আরও অনেকগুলো তারাসমৃদ্ধ নীহারিকা আবিষ্কার করেন যারা আকাশগঙ্গার বাইরে অবস্থিত। এগুলো পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখতে পান যে এদের মধ্যস্থিত উপাদানের সাথে আকাশগঙ্গার অভ্যন্তরস্থ উপাদানের অনেক মিল রয়েছে। এই নীহারিকা নামীয় বস্তুগুলোর মধ্যে তারার গুচ্ছ বিদ্যমান যাদেরকে বর্তুলাকার স্তবক বলা হয়; এছাড়াও এতে আছে নবতারা। নবতারাগুলো হঠাৎ হঠাৎ অত্যন্ত উজ্জল হয়ে উঠে। এসমস্ত পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে ১৯২৪ সালে তিনি প্রস্তাব করেন যে এই নীহারিকাগুলো প্রকৃতপক্ষে আমাদের ছায়াপথের বাইরে অবস্থিত অন্যান্য ছায়াপথ। তার প্রস্তাবিত এই তত্ত্ব দ্বীপ মহাবিশ্ব তত্ত্ব (Island Universe Theory) নামে পরিচিতি লাভ করে। এই ছায়াপথগুলো নিয়ে তার গবেষণা অব্যাহত থাকে। ১৯২৫ সালে তিনি ছায়াপথগুলোকে নিয়মিত এবং অনিয়মিত গঠনের ছায়াপথ নামীয় দুইটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। মূলত ছায়াপপথগুলোর আকৃতি এবং গাঠনিক ধর্মের ভিত্তিতে এই শ্রেণীবিন্যাস করা হয়। শতকরা ৯৭ ভাগ ছায়াপথই নিয়মিত গঠনের। নিয়মিত গঠনের ছায়াপথগুলো প্রধানত উপবৃত্তাকার বা কুণ্ডলাকার হয়ে থাকে। কুণ্ডলাকার ছায়াপথগুলৌকে আবার হাবল ২ ভাগে ভাগ করেছিলেন: সাধারণ কুণ্ডলাকার ছায়াপথ এবং রেখাঙ্কিত কুণ্ডলাকার ছায়াপথ। কোন নির্দিষ্ট আকৃতি বা গঠন নেই এমন ছায়াপথের সংখ্যা শতকরা মাত্র তিন ভাগ বলে হাবল উল্লেখ করেন।

হাবল তার আবিষ্কৃত এবং শ্রেণীবিন্যাসকৃত ছায়াপথগুলো থেকে পৃথিবীর দূরত্ব বের করা শুরু করেন। এজন্য তিনি মূলত বিষম তারাগুলোর পর্যবেকক্ষণ থেকে প্রাপ্ত মান ব্যবহার করতেন। তার হিসাবকৃত এই দূরত্বসমূহের সাথে তিনি পৃথিবীর সাপেক্ষে ছায়াপথগুলোর গতিবেগের পরিমাপের তুলনা করতে শুরু করেন। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানীই তার পূর্বে ছায়াপথসমূহের গতিবেগ হিসাব করেছিলেন যখন এগুলো ছায়াপথ হিসেবেই চিহ্নিত হতোনা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মার্কিননৱ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেস্টো সিলফার যিনি ১৯১০ এবং ১৯২০-এর দশকে অনেকগুলো ছায়াপথের গতিবেগ হিসাব করেছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ছায়াপথসমূহের লোহিত অপসারণের মান হিসাব করে এদের গতিবেগ বের করতেন। একটি বস্তু যে বিকিরণ প্রদান করে তার ফলেই লোহিত অপসারণের সৃষ্টি হয়। ডপলার ক্রিয়ার কারণে লোহিত অপসারণ হয়। মূলত যখন পর্যবেক্ষক থেকে ক্রমশ পশ্চাদপসরমান বস্তু কর্তৃক বিকীর্ণ রশ্মি তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর ব্যাপ্তীতে হয় তখন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মান লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমান হয়। এ থেকেই বোঝা যায় যে জ্যোতিষ্কগুলো ক্রমশ পশ্চাদপসরণ করছে। স্লিফারসহ অন্যান্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। হাবল নিজেও এই ফলাফল লাভ করেন।

১৯২৯ সালে হাবল ছায়াপথসমূহের দূরত্বের সাথে এদের পশ্চাদপসরণের বেগের তুলনা করেন। এর ফলে তিনি অত্যন্ত প্রকট একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন: একটি ছায়াপথ পৃথিবী থেকে থেকে যত দূরে অবস্থিত তার পশ্চাদপসরণের বেগও তত বেশি। এই নীতিটি হাবল কর্তৃক আবিষ্কৃত ৪৬টি ছায়াপথের ক্ষেত্রেই সত্য প্রমানিত হয়‌; এমনকি এর পরে হাবল এবং অন্যান্য বিজ্ঞানী কর্তৃক আবিষ্কৃত সবগুলো ছায়াপথের ক্ষেত্রেই এর সত্যতা আবিষ্কৃত হয়। এই নীতিটিকেই বর্তমানে হাবলের নীতি নামে অভিহিত করা হয়। পরিশেষে হাবল বলেন যে বেগ এবং দূরত্বের মধ্যে এই সম্পর্ক নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর আগে ১৯২৭ সালে বেলজীয় বিজ্ঞানী জর্জেস লেমাইট্‌র মহাবিশ্বের একটি নকশা প্রণয়ন করেছিলেন যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বকে একত্রীভূত করেছিল। লেমাইট্‌র একটি সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের নকশাই করেছিলেন কিন্তু হাবলই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি এর সপক্ষে একটি পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ উপস্থাপন করতে সমর্থ হন।

বেগ এবং দূরত্বের মধ্যে এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে হাবল একটি ধ্রুবকের গোড়াপত্তন করেন যা হাবল ধ্রুবক নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা হাবল ধ্রুবকের সঠিক মান আজও বের করতে পারেননি। পারলে মহাবিশ্বের সঠিক বয়স এবং মানুষের পক্ষে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ্য উভয়টিই জানা যেতো। মহাবিশ্ব অসীম হতে পারে, কিন্তু এর পুরোটা আমরা পর্যবেক্ষ করতে পারবো না। দূরত্বের সাথে সাথে যদি বেগও বাড়তে থাকে তবে এমন ছায়াপথ অবশ্যই থাকবে যার বেগ আলোর বেগের সমান। সেই ছায়াপথ থেকে পৃথিবীর দূরত্বই হবে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ্য। কারণ এই ছায়াপথ থেকে আলো কখনোই পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারবেনা। আর এর বাইরের কিছু দেখাও তাই অসম্ভব। এই ব্যাসকে হাবল ব্যাসার্ধ্য বলে। ১৯৩০-এর দশকে হাবল ছায়াপথসমূহের বণ্টন নিয়ে গবেষণা করেন। তার পর্যবেক্ষণের ফলাফল হতে দেখা যায় ছায়াপথগুলো মহাকাশে সমসত্বভাবে বিন্যস্ত। হাবল বলেন যে আকাশগঙ্গার তলে এবং এই তলের সাপেক্ষে দৃশ্যমান অঞ্চলে দৃশ্যমান ছায়াপথের সংখ্যা কম হবে। কারণ অতিরিক্ত ধূলির কারণে বাইরের ছায়াপথ থেকে আসা আলো পৃথিবীতে আসতে বাঁধাগ্রস্ত হবে।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত মাউন্ট পালোমার মানমন্দিরে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি কাজ করেছেন! ১৯৫৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি ক্যালিফনিয়াতেই মারা যান ! ৫০ এর দশকের পূর্বে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী শাখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়ত না ! যে কারনে মহাবিশ্বের প্রসারন আবিস্কার সত্ত্বেও তিনি নোবেল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন । বর্তমানে সবচাইতে শক্তিশালী টেলিস্কোপ "হাবল স্পেস টেলিস্কোপ" এর নাম তার সম্মানার্থে রাখা হয়েছে। বিশাল এই টেলিস্কোপটি নির্মাণ শেষ হলে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল শাটল মিশন STS-31 দ্বারা স্পেস শাটল ডিসকভারি দিয়ে এটিকে পাঠানো হয় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বাইরে, এর কক্ষপথে। ভুমি থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার উচুতে অবস্থিত এই টেলিস্কোপটি হাবলের মতই জ্যোতির্বিদ্যার একের পর এক রহস্য সমাধান করছে ।

জন্মদিনে এই মহান জ্যোতির্বিদকে আমাদের পক্ষ থেকে সম্মান রইল ! শুভ জন্মদিন মহামানব!

তথ্যঃ 

লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পেইজ

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: