Header Ads

মুভি রিভিউঃ Happy Together (1997)

মুভি রিভিউঃ Happy Together (1997)

মুভিঃ হ্যাপি টুগেদার (১৯৯৭) 
জনরাঃ ড্রামা / রোমান্স
IMDB রেটিংঃ ৭.৮ / ১০ 

ডয়েলের সিনেমাটোগ্রাফি যে নতুন ভাষা জোগায় চরিত্রগুলোর চলনে বলনে, তার সঙ্গে যুঝতে আমাদের খানিক সময় লাগে বৈকি, বিশেষত কলকাতার মত এলোমেলো হিসেবনিকেশহীন শহরের কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ছবির ভাষা অতিরিক্ত রকমের রোম্যান্টিক মনে হতেই পারে, খুব বেশি বাস্তবিক নাও লাগতে পারে। হংকং থেকে বেরিয়ে আসা অথবা পালিয়ে আসা দুটো পুরুষের সামনে তেমন কোনও নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ নেই, উপায় নেই, স্থায়িত্ব নেই, ভরসাও নেই। ওরা দু'জন যে যার মত করে একা, একলা, ক্লান্ত, বিষন্ন। প্রতিনিয়ত পুরুষ বদলানো হো নিরুপায় তথা অসহায়। বৈচিত্র্য-কাঙাল। ভালবাসা ছিনিয়ে নিতে চায়। 

যে শহরে রয়েছে তারা, এক অন্য দেশে, অন্য জলবায়ু আবহাওয়ার আওতায়, তা গতিশীল চূড়ান্তরকম, মনুষ্যত্বের ধার ধারে না মোটেই। এইসব শহরের গ্লোরিয়াস চত্বরে নিয়ত হো'র মত ছেলেরা ঠকে যায়। বোহেমিয়ান পুরুষ, আদতে বোধহয় এরাই জীবনে জিতে যায়। হেরে গিয়েও জেতে। যে বাঙালী ছেলেটি তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুদ্রতা ও ভেজালে ভরা এক শহরের পুরুষতন্ত্রকে অতিক্রম করতে পারেনা সহজে, এই কালশিটে পচাগলা পরিবেশে নিজেকে আরও আরও বেশি করে কঠোর হওয়ার কথা বলে, অন্য পুরুষের প্রতি ভাললাগাকেও তোয়াক্কা করেনা, রকমারি নেশার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে ভাবে চলতি মন্দ লাগা, বিষন্নতা থেকে মুক্তি পেল - আদতে সেই দুনিয়ার সবথেকে পরাজিত প্রাণী; হেরে যাওয়াকে, নিমেষে নেই হয়ে যাওয়াকে তীব্র ভয় পায় বলেই যেনতেনপ্রকারেন জিততে চায়। 

আলোচ্য ছবির ফেই'য়ের যাপনে মিশে থাকা কষ্টগুলো, মনখারাপগুলো দিনগুলোকে রঙীন হতে দেয়না। বেভুল অতীতের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে না পারা, এই কষ্ট বা মনখারাপের একটা কারণ হতে পারে। তাতে বেশি মাত্রায় অনুঘটকের কাজ করেছে হো'র মাত্রাছাড়া ব্যবহার। হয়ত। হয়ত নয়। বড্ড বেশি রোম্যান্স মিশে আছে এই ছবির শরীরে। কিছুতেই বিশ্লেষিত হচ্ছে না ফেই'য়ের চরিত্রটি। নির্মাতার তৈরি করা দিশাহীন অ-ভাললাগার রকমফের আমাদের তাই উত্তেজিত করেনা, প্রেরণা পাওয়া যায়না। হংকং'য়ে সে ফেরত যাচ্ছে, ছবির শেষে দেখানো হয়। ফেরাটা আছে তারমানে। সবার জীবনেই কোথাও না কোথাও ফেরত যাওয়া, কিংবা আসা আছে। 

চ্যাং'য়ের ঝলমলে পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ফেইয়ের উপলব্ধি ঘটে, চ্যাং ছেলেটির যাপনে ফেরার একটা তাড়া মিশে আছে, ফলে যে দুনিয়ার যেখানেই যাক বা থাকুক, ফিরতে হবে - এই বোধটুকু তাকে নিয়ত বাঁচিয়ে রাখে, বিষন্ন হতে দেয়না। যেখানে ভরসা নেই, স্থায়িত্ব নেই, আশা নেই, বিশ্বাস নেই, স্বপ্ন দেখা স্বপ্ন তৈরি করাও প্রায় নেই, সেখানে অর্থাৎ ছবির গোটা চিত্ররূপ যদি ছিমছাম নির্ভেজাল হত, ক্যামেরা স্থির থাকত, গতানুগতিক হত, তাহলে এই ছবি 'সিনেমা' হতনা। এত ভালবাসাও পেতনা সকলের। তাই ক্রিস্টোফার ডয়েল ধন্যবাদ প্রাপ্য, অতি সাধারণ মূহুর্তগুলোকে নতুন এক ভাষা যোগানোর জন্য।

লেজলি চিউং মন্দ ছিলনা এই ছবিতে, চরিত্রের সাথে মিশে গিয়েছিল সম্পূর্ণত। সমান কথার কোটা টনি লিউঙের জন্যেও। কর্তব্যবোধ, বিচ্ছিন্নতা, দুঃখবোধের মিশেলে তৈরি পুরুষটির প্রতি সমবেদনা জাগে ফিল্ম দেখাকালীন। অথচ আনুপূর্বিক গোটা স্ক্রিনপ্লের কথা কল্পনা করলে 'হ্যাপি টুগেদার' চরম অবাস্তবিক এক ছবি। যে সময় এই ছবি তৈরি হয়েছিল, তখন হয়ত ঐ বিষন্নতার আবহ তৈরির প্রেক্ষিত ছিল বেঁচে। অথচ এই কুড়ি বছর বাদে আশপাশটা দেখলে দেখা যাবে আমাদের মন মেজাজের অদ্ভুত বদল ঘটে গেছে। জাভিয়ের দোলানের 'হার্টবিটস'এর প্রোটাগনিস্ট-দ্বয় পছন্দের পুরুষসঙ্গী সঙ্গ ছেড়ে দূরে চলে গেছে দেখে দুঃখ-কষ্ট খুব একটা পায়না, ফের নতুন করে নতুন মানবের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। সেই সম্পর্কও ভাঙবে, ফের নব্য গল্প তৈরি হবে। 

হিরোকাজু কোরিয়েদার 'এয়ার ডল' ছবির নোজোমি কাব্য করে বলে, জীবন নিজস্ব এক অনুপস্থিতি ধারণ করে আছে, যা কেবল অন্যের সাহচর্যই মেটাতে পারে। একাকীত্বের আধুনিক রূপকথা কোরিয়েদা শোনান আমাদের, সেই ছবির ফ্লেভার নিশ্চিত ভাবেই অন্যরকম, ওং কার ওয়েইয়ের ছবির মত নয়। তুলনা তাই স্বভাবতই অপ্রয়োজনীয়। অথচ আলটিমেটলি যা বলা হয়, সব ক্ষেত্রেই কিন্তু তা মিলে যায় কমবেশি। 'হ্যাপি টুগেদার'এ হো সাহচর্যই তো পেতে চায়, যেই কারণে এতগুলো পুরুষ বদল। চ্যাং বুয়েনেস আইরেসে এসে কিছুটা নতুন পরিবেশে কাজ করছে, তার ফেরার একটা জায়গা আছে, নিজস্ব নির্ভরশীল এক বলয় আছে যেখানে ফিরলে স্বস্তি পাওয়া যাবেই, প্রিয়জনের সঙ্গও। 

তাই সে এখনও ক্লান্ত নয়। পৃথিবীর শেষ প্রান্ত দেখতে চায়, ফের দুনিয়াদারির জগতে ফেরতও আসতে চায়। ইগুয়াজু জলপ্রপাত আমার মনে হয়েছে একধরনের মেটাফরের মত। দুই পুরুষ তাদের ভিন্নধর্মী যাপনগুলোকে একসাথে জড়ো করবে, ভবিষ্যতটা একসাথে কাটাবে - এরকম একটা স্বপ্ন দেখা শুরু করল যখনই, তখনই তো ঠিক হয়েই গেল একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে তাদের পৌঁছাতে হবে হাত ধরাধরি করে। কেউ পারে, কেউ কেউ পারেনা। কলকাতা পারে, প্রকাশ্যতা রয়েছে, মানে ভবিষ্যত রয়েছে এখানে। ঢাকা পারেনা। গোপনে শরীর বিনিময়ের খেলা চলে। সে তো সব জায়গাতেই চলে। এই চলাচলের মাঝে কেউ স্বপ্ন-টপ্ন দেখে ফেললেই হল! তার আর ফেরা হয়না। কোত্থাও না!

লিখেছেনঃ সুমন সাহা

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে দয়া করে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন। এমন লিখা নিয়মিত পেতে ভিজিট করুন EduQuarks ব্লগ। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: