Header Ads

বই রিভিউঃ জোছনা ও জননীর গল্প

বই রিভিউঃ জোছনা ও জননীর গল্প

বইঃ জোছনা ও জননীর গল্প
লেখকঃ হুমায়ুন আহমেদ
প্রকাশনীঃ অন্যপ্রকাশ 
জনরাঃ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস

“পিরোজপুর মহকুমার সাব ডিভিশনাল অফিসার এই ঘোষণা শুনে আনন্দে ছেলেমানুষের মতো চিৎকার শুরু করতে থাকেন – ‘যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমরা যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছি। আর ভয় নাই।’ তিনি পিরোজপুরের পুলিশদের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে দুইশ রাইফেল স্থানীয় জনগণকে দিয়ে দেন। যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে। পাকিস্তান মিলিটারি তাঁকে হত্যা করে ৫ মে। এই ঘটনার বত্রিশ বছর পরে তাঁর বড় ছেলে ‘জোছনা ও জননী’ নামে একটা উপন্যাস লেখায় হাত দেয়।”

হুমায়ুন আহমেদকে একবার এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এত বড় কাজ করে ফেলেছেন, আপনি পারলেন না কেন? ওনার সপাট উত্তর, উনি স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেন নি বলে লেখাটা ওনার পক্ষে এত সহজ হয়েছে। (কাঠপেন্সিল)

তা বটে, সুনীলের ‘সেই সময়’ এবং ‘প্রথম আলো’র পরে সবারই একটা উৎসাহ ছিল, এবার কি প্রার্থিত উপন্যাসটিই লিখবেন তিনি? ট্রিলজি? লিখলেন, এবং শুধু তাই নয় ৯৮৬ পাতার এক সুবৃহৎ উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে ৪০টিরও বেশি বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করলেন। তথ্য – যা লিখতে সাহায্য করে বটে, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর পক্ষে সেই তথ্য পুণরাবলম্বন করে পাঠকদের জন্য একটা মরমী উপন্যাস সৃষ্টি করে যাওয়া হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হওয়া যায়গাটিতে খুঁচিয়ে ঘা করার মতন হয়ে যায়। হুমায়ুন আহমেদ ৫২০ পাতার এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে মোট ৯১টি বইয়ের সাহায্য নিয়েছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলই পড়েছেন ৭ খণ্ড (মোট ১৫ খণ্ড)। তাই দু’তরফের লেখার মধ্যে তফাত থাকে আকাশ-পাতাল। রামচন্দ্র গুহ তার ‘India After Gandhi’ বইতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বলতে খরচ করেছেন মাত্র ২০ পৃষ্ঠা (বাংলা অনুবাদ ‘গান্ধী উত্তর ভারতবর্ষ’)।

তাও ভারতীয় মহাফেজখানা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ তা পারেন না, পারেন না তার কারন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের যে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা তিনি হুবহু তুলে দিয়েছেন তার বইতে (পৃষ্টা ১৪৯-১৫৪, ৩৩৩-৩৩৯, ৩৪৯-৩৫৪, ৩৭৩-৩৭৬) সেই ঘটনাগুলো পড়লে এবং সেই সাথে মুখবন্ধে তার জীবনস্মৃতি, কীভাবে পাকিস্তান মিলিটারি বাহিনী দ্বারা একদিন একটা সাগরকলা দিয়ে তাকে বলা হল, পরের দিন সকালে তাকে গুলি করে মারা হবে, সে যেন তৈরী থাকে। উপন্যাসে শাহেদ যেন ঠিক এমনই এক অভিজ্ঞতার শিকার, হুমায়ুন আহমেদের অনুভুতি শাহেদের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। আর এ থেকেই বোঝা যায় যে তার পক্ষে এ ধরনের উপন্যাস লেখা কত কঠিন। হুমায়ুন আহমেদের কাছে তাই এ উপন্যাস এক রকমের ঋণশোধ। “মানুষকে যেমন পিতৃঋণ-মাতৃঋণ শোধ করতে হয়, দেশমাতার ঋণও শোধ করতে হয়। একজন লেখক সেই ঋণ শোধ করেন লেখার মধ্যমে।”

পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলি নারকীয় ও বীভৎস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, বাংলাদেশের হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অন্যতমই নয়, বেশ উচ্চস্থানে থাকবে। বিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নেও যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, এবং সারা পৃথিবী জুড়ে তার সমর্থনও আসতে পারে সেটা ভাবলেই বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। অবশ্য মানবিকতা ও রাজনীতির মধ্যে তফাত অনেক। ভারত-পাকিস্থান দুই যুযুধান দেশ। ভারত আস্তে আস্তে ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরে শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে, এমতাবস্থায় ’৬১–র যুদ্ধে চীনের কাছে নাস্তানাবুদ এবং তারও আগে দু-দুটো ভারত-পাকিস্থানের যুদ্ধে উভয়পক্ষের প্রায় সমান সমান পরিসমাপ্তি বিশ্ব রাজনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – অবশ্যই ভারতকে দাবিয়ে রাখার এক অনন্য কৌশল বলে আমেরিকা এবং চীনের মত দেশও এই সময় পাকিস্থানের দিকে ঝুঁকে গেল।

তৎকালীন বিশ্বের বাকি সমস্ত মুসলিম অধ্যুষিত দেশ সব জেনেশুনে চুপ করে রইল। ফল হল, একদিক থেকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে ইয়াহিয়া খাঁ’র সৈন্য আস্তে আস্তে বাংলাদেশের বাকি অঞ্চলে তাদের ত্রাস ছড়ালো রাজাকারদের সহায়তায়, আর অন্যদিকে ভারতে ত্রিপুরা-আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে পুণরায় শরণার্থীর ঢল নামল। কেমন সে ঢল? রামচন্দ্র গুহ জানাচ্ছেন, এপ্রিল মাসে ৩৫ লক্ষ, এবং মে মাসে তার সংখ্যাটা ৮০ লক্ষে ছাড়িয়ে যায়। এদের স্থান করে দিতে হল ওড়িশা আর মধ্যপ্রদেশের ঘণ অরণ্য অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও। তৎকালীন সোভিয়েত প্রতিনিধি জ্যাকভ মালিকের কথায়, “জাতিসংঘের ৮৮টি দেশের কোনোটির জনসংখ্যা এক কোটির বেশি না অথচ পূর্ব পাকিস্থান থেকে এক কোটির বেশি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।”

এরপরের ইতিহাস ঘুরে দাড়ানোর ইতিহাস। সীমান্তবর্তী শিবিরে শুরু হল ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় গেরিলা প্রশিক্ষণ, তৈরী হল মুক্তিযোদ্ধা। এরাই মূল স্বাধীনতার কাণ্ডারী। গ্রামেগঞ্জে এদের ইতিহাস রূপকথার পর্যায়ে চলে গেল। উপন্যাসের শেষের দিকে মূলত তাদেরই জয়গাথা লেখা হয়েছে। নাইমূল যেন তাদেরই এক প্রতীক হয়ে পুরো উপন্যাস জুড়ে এক যোদ্ধা তথা সংগ্রামী হয়ে ওঠার কাহিনী বলে। আর পাশাপাশি বিশ্ব ইতিহাস? লেখকের দৃষ্টি সেদিকেও ছিল। তিনি লিখলেন, পাকিস্থান হঠাৎ করে আক্রমণ করল ভারতকে। চার তারিখে ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। চীন ঘোষণা করল, পাকিস্থান সবরকম সাহায্য পাবে।

রাশিয়া চীন সীমান্তে দশ লক্ষ সেনা মোতায়েন করল, যাতে চীন ভারত আক্রমণ না করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্থানের সমর্থনে বিবৃতি দিল, তাদের পরমাণু শক্তিচালিত সপ্তম নৌবহরকে পাঠিয়ে দিল বঙ্গোপসাগরে। জবাবে রাশিয়া পাঠালো তাদের ক্ষেপণাস্ত্রবাহী রণতরী এবং পরমাণু চালিত ডুবোজাহাজ। এই দাবাখেলার যাতাকলে রাশিয়া একাই আটকে রাখল বিশ্বের তাবড় তাবড় দুটো দেশকে। ভারতীয় বাহিনী সরাসরি সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পন্ন করল, আর পূর্ব সীমান্তে কাশ্মীর অঞ্চলে পাকিস্থানকেও যোগ্য জবাব দিল। (পৃষ্ঠা ৪৭৯-৪৮৪) রাশিয়া নব্বইয়ের দশকে এর ফল পেল। ঠান্ডা যুদ্ধে আমেরিকা রাশিয়াকে টুকরো টুকরো করে বেশ দুর্বল করে তবে ক্ষান্ত দিল।

ধান ভানতে শীবের গীত? কোথায় গল্পের কথা, তাদের চরিত্রের আলোচনা? তা না করে কেবল ইতিহাসের মারপ্যাঁচ!!! আচ্ছা বলুন তো, হুমায়ুন আহমেদের লেখা এমন কোন উপন্যাস আছে যেখানে তার গল্পের সমালোচনা করা সম্ভব? তার গল্পে মুগ্ধতা ছাড়া আর কিছুই থাকে না, এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তাই, আর তাই বুদ্ধিমান পাঠক পড়েই তার রসাস্বাদন করবেন, বলাই বাহুল্য। এই উপন্যাসের প্রকৃত পটভূমিকার একটা আবহ বিশেষ করে অ-বাংলাদেশী এবং বর্তমান পাঠকদের জন্য একান্তই প্রয়োজন, আর সেই প্রয়োজনেই এই রিভিউ আমার লিখতে বসা।

উপন্যাসের চরিত্রের বিভিন্নতা নিয়ে বিষ্ময় হতে হয় সন্দেহ নেই, কারণ এখন আপনি জানেন প্রায় প্রত্যেকটা চরিত্রেরই কোন না কোন রূপ সে সময়ে বর্তমান ছিল। ছিল ইরতাজউদ্দিনের মতো নমস্য মুসলমান; ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর মতো আপনভোলা প্রফেসর – দেশের সম্পদ, যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্থান একরাত্রে হত্যা করে বিদ্রোহ দমনের নাম করে তিনি ছিলেন তাদেরই একজন; ছিলেন নির্মলেন্দু গুণ, মুজিবুর রহমানের মতন লেখক, নেতা তথা বুদ্ধিজীবী; ছিলেন মোবারক হোসেন, ফয়জুর রহমানের মতন পুলিশ অফিসার; ছিলেন গৌরাঙ্গের মতন হিন্দু; ছিলেন কলিমউল্লাহ, পীর সাহেবের মতন গিরিগিটিরা; ছিলেন কফিলুদ্দি, আবু তাহেরের মতন দেশদ্রোহী; ছিলেন কয়েস আলী, রফিকদের মতন শহীদ, যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় নেই; ছিলেন কাদের সিদ্দিকি, হিমুদের মতন মুক্তিযোদ্ধারা; আর ছিলেন আসমানী-মাসুমা-সোফিয়া-মরিয়মের মতন সাধারণ নারী, যারা যুদ্ধবিদ্ধ্বস্ত পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের কঠোর জীবন সংগ্রামের প্রতিনিধি।

আর সেই সময় গ্রন্থের লেখক ঢাকার ঝিকাতলার একটি বাসায় লুকিয়ে ছিলেন মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসে, তার বন্ধু আনিসের সাথে, যিনি কিনা তার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন। ষোলই ডিসেম্বরে তাদের মনে হল যেন তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আনিস বাড়ির সামনের মাঠে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে শব্দ করে কাঁদছেন, গড়াগড়ি খাচ্ছেন। লেখক তাকে টেনে তুললেন, এবং দুজনে হাসতে হাসতে বেরিয়ে পড়লেন ঢাকার রাস্তায়, এই প্রথম – নির্ভয়ে। ফাঁকা রাস্তায় কোনরকম কারণ ছাড়াই আনন্দে দৌড়াতে শুরু করলেন... এবং এর বত্রিশ বছর পর লেখা হল-

‘জোছনা ও জননীর গল্প’


লেখক পরিচিতিঃ
লিখেছেনঃ সুমন দাস

এমন আরও বইয়ের নিয়মিত রিভিউ পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। প্রতি সপ্তাহের শনি এবং মঙ্গলবারে আমাদের বুক রিভিউ সিরিজের লিখা পাবলিশ হয়ে থাকে। আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে ও লাইক দিয়ে রাখুন ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: