Header Ads

মঙ্গল নিয়ে নাসার ভাবনা

মঙ্গল নিয়ে মানুষের কল্পবিলাস কয়েক শতকের ! আগামি ২০৫০ সালের মধ্যে মঙ্গল পাকাপাকি ভাবে মনুষ্যবসতি গড়ে তোলার ঘোষণা নাসা বেশ কয়েক বছর আগেই দিয়েছে । তবে, মঙ্গলে বসবাস করতে হলে মঙ্গলকে আগে তো বাসযোগ্য করে তুলতে হবে । নিশ্চয় শুকনো লাল খটখটে মরুভুমিতে বছরের পড় বছর থাকা সম্ভব না ! তাই নাসার বিজ্ঞানীরা মঙ্গলকে প্রান ধারনের উপযুক্ত করে তোলার প্রয়াস করেছেন । তবে পৃথিবীর কার্বনভিত্তিক প্রাণের জন্য পর্যাপ্ত পানি ও অক্সিজেন,বায়ুমণ্ডল অত্যাবশ্যক ! কিন্তু মঙ্গলের মত এই লাল মরুভুমির গ্রহে কিভাবে পর্যাপ্ত পানি ও বায়ুমণ্ডল সম্ভব?

মঙ্গল নিয়ে নাসার ভাবনা

মঙ্গল গ্রহ হচ্ছে সৌরজগতের চতুর্থ ও সর্বশেষ পাথুরে গ্রহ।অর্থাৎ এরও পৃথিবীর মত ভূ-ত্বক রয়েছে। পৃথিবী থেকে অনেকটা লাল দেখানোর কারণে এর অপর নাম হচ্ছে লাল গ্রহ। এর অতি ক্ষীণ বায়ুমণ্ডল রয়েছে, এর ভূ-ত্বকে রয়েছে চাঁদের মত অসংখ্য খাদ, আর পৃথিবীর মত আগ্নেয়গিরি, মরুভূমি এবং মেরুদেশীয় বরফ।ধারনা করা হয় একসময় গ্রহটির বুকে পানির সমুদ্র ছিল।কিন্তু এর তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ায় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি,গামা রে আর বিকিরনে এর বায়ুমণ্ডল ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায় এবং অরক্ষিত ভূপৃষ্ঠস্থ পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আমাদের পৃথিবীর সক্রিয় তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র থাকায় সূর্য হতে নিক্ষিপ্ত কনা এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় । ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠে এই সব নিক্ষিপ্ত কনা খুব একটা ক্ষতি করতে পারেনা । আর তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের সাথে এই সংঘর্ষ পৃথিবীর আকাশে এক অপরুপ দৃশ্যের আবির্ভাব ঘটায় যাকে আমরা মেরুপ্রভা বলি !

তবে, নাসা মঙ্গলকে পূর্বের মত আবার সবুজ ও সুফলা গ্রহে পরিনত করার জন্য একটি প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে । তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল ফিরিয়ে আনা ।আর সেটা সম্ভব হলেও তো সূর্যের অব্যাহত বিকিরনে তা আবার ধ্বংস হবে । তাই এর জন্য সক্রিয় তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র দরকার । মুলত কোন জ্যোতিষ্কের কেন্দ্রে লৌহ(লহা,নিকেল) জাতীয় গলিত চৌম্বকীয় পদার্থ থাকলে তার সক্রিয় তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র থাকে । মঙ্গলের তড়িৎচৌম্বকীয় না থাকার কারন হল এই গলিত লৌহ জাতীয় পদার্থের অভাব । অর্থাৎ, মঙ্গলকে ভূতাত্ত্বিক ভাবে মৃত বলা চলে। তবে এক সময় তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র থাকলে এখন কেন তা ধ্বংস হয়েছে বা অনুপস্থিত তা নিয়ে সঠিক ব্যাখ্যা নেই । ধারনা করা হয় বিলিয়ন বছর আগের কোন শক্তিশালী সৌরঝড়ে মঙ্গলের তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র পুরোপুরি বিলীন হয়ে গিয়েছে ।

তাই মঙ্গলে কোন ভাবেই এর তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে পুনর্স্থাপন করা সম্ভব নয় । তাই, বিজ্ঞানীরা এক অভিনব উপায়ের কথা ভেবেছেন । তারা একটি শক্তিশালী দানব ক্লোজড তড়িৎ সার্কিট(closed electric circuit ) মঙ্গলের পূর্বে স্থাপন করবেন । সৌরশক্তির মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ পরিবহনের মাধ্যমে এই সার্কিটটির দুই প্রান্তে চুম্বকের মত হুবহু মেরু তৈরি হবে । অর্থাৎ পুরো ব্যাবস্থাটি একটি তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করবে । এতে করে সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকারক কনাগুলো মঙ্গলে পৌঁছানোর পূর্বেই তা বিক্ষেপিত হবে । অর্থাৎ সূর্য থেকে নিক্ষিপ্ত এসব কনা মঙ্গলে পৌঁছুতে পারবে না । এতে করে মঙ্গলে কয়েক বছরের মধ্যে তার পূর্বের বায়ুমণ্ডলের অর্ধেক পুরত্বের বায়ুমণ্ডল তৈরি হবে । এবং প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডলীয় চাপের অর্ধেক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ সৃষ্টি হবে । এই চাপ বাড়তে থাকলে এক সময় তরল পানি উপস্থিত থাকা সম্ভব হবে। আর এই সার্কিট স্থাপন করা হবে মঙ্গলের কক্ষপথ থেকে মঙ্গলের ব্যাসার্ধের ৩২০ গুন দূরে পৃথিবী ও মঙ্গলের কক্ষপথের মাঝামাঝি । এটির নির্দিষ্ট কক্ষপথ থাকবে যা মঙ্গলের আগে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে !

মঙ্গলে নিশ্চয় পৃথিবী থেকে মহাসাগরের সমপরিমান পানি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় । পূর্বেই বলেছি বর্তমানে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এতোটা কম যে এতে তরল পানি থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু মঙ্গলে বরফ রয়েছে। এর দুই মেরু সম্পূর্ণ বরফ দ্বারা গঠিত। ২০০৭ সালের মার্চে নাসা এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে যে পরিমাণ বরফ রয়েছে তা গলিয়ে দিলে সমগ্র গ্রহটি পানিতে ডুবে যাবে এবং এই জলভাগের গভীরতা হবে প্রায় ১১ মিটার (৩৬ ফুট)।উপরন্তু বরফের একটি পারমাফ্রস্ট ম্যান্ট্‌ল মেরু অঞ্চল থেকে ৬০° অক্ষাংশ এলাকা জুড়ে প্রলম্বিত রয়েছে।মঙ্গলের পুরু ক্রায়োস্ফেয়ারের অভ্যন্তরে আরও বিপুল পরিমাণ পানি লুকিয়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কোন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মাধ্যমে ক্রায়োস্ফেয়ার ধ্বংস হলেই কেবল এই পানি বেরিয়ে আসতে পারে। এরকম একটি বিস্ফোরণ অনেক আগে হয়েছিল যার কারণে মঙ্গলের ভ্যালিস মেরিনারিস গঠিত হয়। ইতিহাসের এই সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি বেরিয়েছিল যা একটি সুবৃহৎ নদী উপত্যকা গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল। আজ থেকে ৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে এরকম আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল যার কারণে সারবেরাস ফোসি নামক একটি খাদ উন্মুক্ত হয়েছিল। এর ফলে একটি বরফের সাগর সৃষ্টি হয়ে যা এখনও দেখা যায়। এই সাগরটিকে বর্তমানে এলিসিয়াম প্ল্যানিটিয়া বলা হয়।

মঙ্গল নিয়ে নাসার ভাবনা

অতি সম্প্রতি মার্স গ্লোবাল সার্ভেয়ারে অবস্থিত মার্স অরবিটার ক্যামেরার মাধ্যমে মঙ্গলের কিছু উচ্চ রিজল্যুশন ছবি তোলা হয়েছে। এর ফলে মঙ্গলের পৃষ্ঠতলে তরল পানির অস্তিত্বের ইতিহাস সম্বন্ধে অনেকটাই বিস্তারিত জানা গেছে। সেখানে বন্যা সৃষ্টকারী বিশালায়তন কিছু চ্যানেলের নিদর্শন পাওয়া গেছে এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রচুর শাখা নদী সদৃশ প্রবাহের অস্তিত্বও প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এমন কোন ছোট আকৃতির গঠন পাওয়া যায়নি যাকে বন্যা সৃষ্টিকারী এই জলস্রোতের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। বর্তমানে অবশ্য এদের কোনটিই জীবিত নেই। আছে শুধু এদের নিদর্শন। আবহাওয়ার পরিবর্তনই এদের বিলুপ্তির কারণ বলে মনে করা হয়। এ থেকেই বোঝা যায়, এই গঠনগুলো কত পুরনো ছিল। আবার আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ এবং গভীর গিরিখাতের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল জুড়ে বেশ কিছু গঠন বিভিন্ন চিত্রে ধরা পড়েছে যেগুলো অনেকটা পৃথিবীর সমুদ্র সন্নিবিষ্ট নিষ্কাশন নালী আকৃতির গিরিখাতের মত। এই গিরিখাতগুলো মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের উঁচু অঞ্চলগুলোতে অবস্থিত। এদের মুখ বিষুবরেখার দিকে এবং সবগুলো ৩০° অক্ষাংশে মেরুমুখী হয়ে আছে।গবেষকরা এমন কোন গিরিখাত খুঁজে পাননি যেগুলো আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এমনকি পরষ্পর উপরিপাতিত কোন ইমপ্যাক্ট জ্বালামুখও খুঁজে পাননি। এ থেকে বোঝা যায় যে এই গঠনগুলো বেশ নবীন।

নাসার মঙ্গল অভিযান প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী মাইকেল মেয়ার দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, বিপুল পরিমাণ জলমিশ্রিত কোন ধরণের পদার্থের প্রবাহের মাধ্যমেই কেবল এ ধরণের রঙীন এবং ধ্বংসাবশেষ আকৃতির গঠনের সৃষ্টি হতে পারে। এই জল কি বায়ুমণ্ডল থেকে বর্ষিত তুষারপাত বা বৃষ্টি থেকে এসেছে নাকি ভূগর্ভস্থ কোন উৎস থেকে এসেছে তা নিয়ে রয়েছে সংশয় ।অবশ্য এই ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করার জন্য বিকল্প প্রকল্পও গৃহীত হয়েছে। এমন হতে পারে বরফ কঠিন কার্বন ডাই অক্সাইড অথবা মঙ্গলীয় পৃষ্ঠে ধূলির প্রবাহের মাধ্যমে এই পলিবিশিষ্ট তলানীর সৃষ্টি হয়েছে।এ ছারাও মঙ্গলে এমন কিছু খনিজ পদার্থ পাওয়া গেছে যা থেকে বোঝা যায় মঙ্গলে এক সময় তরল পানির অস্তিত্ব ছিল। এই পদার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে হেমাটাইট এবং গোয়েথাইট,যারা সাধারণত পানির উপস্থিতিতে গঠিত হয়।

অস্তিত্ব যাই হোক, মঙ্গলে যে পানির সম্ভাব্য কিছু উৎস রয়েছে এই যথেষ্ট ! আর মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলকে ফেরত আনা সম্ভব হলে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও তাতে আটকে পরা তাপে একসময় এর মেরুর বরফ গলতে শুরু করবে । ফলে মঙ্গল পানিতে অনেকটায় পরিপূর্ণ হবে এবং এর আদ্রতাও বাড়বে । আর আমরা জানি মঙ্গলে প্রচুর কারন দাই অক্সাইড উপস্থিত আছে । তাই প্রানিদের জন্য প্রথম দিকে বাসের অনুপযোগী হলেও উদ্ভিদ এই পরিবেশে ভালই মানিয়ে নিতে পারবে । ফলে মঙ্গলে পৃথিবী থেকে উদ্ভিদ নিয়ে যাওয়া হলে এর সালোকসংশ্লেষণে মঙ্গলে অক্সিজেন উদপাদন শুরু হবে । ধীরে ধীরে উদ্ভিদের বংশবিস্তার হলে মঙ্গল মরুভুমি থেকে সুজলা সফলা গ্রহে পরিনত হবে । কম্পিউটার স্যিমূলেশন অনুযায়ী মাত্র কয়েক বছরেি মঙ্গলকে ঊষর থেকে মানুষের প্রান ধারনের উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব।

তথ্যঃ 

লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পেইজ

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে দয়া করে শেয়ার করুন। এমন লিখা নিয়মিত পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: