Header Ads

সবচেয়ে বয়স্ক গ্রহ!

PSR B1620-26b হল ১২৪০০ আলোকবর্ষ দূরে বৃশ্চিক নক্ষত্রমণ্ডল বা Scorpius constellation এ অবস্থিত একটি বহির্জাগতিক গ্রহ । এখন পর্যন্ত সনাক্ত করা প্রায় ৩৫০০ টি বহির্জাগতিক গ্রহের মধ্যে এটি সবচাইতে বয়স্ক । শুধু বয়স্ক বললে ভুল হবে , বরং এটি মহাবিশ্বের প্রথম প্রজন্মের গ্রহ । ১৩ বিলিয়ন বছরের এই গ্রহটিকে তাই "দ্যা জেনেসিস প্ল্যানেট" বা সুচনালগ্নের গ্রহ বলে অভিহিত করা হয় । তবে জ্যোতির্বিদেরা একে Methuselah নামে ডাকেন । বাইবেল অনুযায়ী মথূশেলহের ছিলেন আদমের বংশধর যিনি সর্বোচ্চ বয়স্ক মানুষ ছিলেন ! এটি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের গ্যালাক্টিক কোরের নিকটে মেসিয়ার-৪(messier-4/M4) নামক একটি গ্লোবুলার ক্লাস্টারে PSR B1620-26 নামক একটি পালসার ও WD B1620-26 নামক একটি শ্বেত বামনের বাইনারি সিস্টেমকে প্রদক্ষিন করছে । বাইনারি সিস্টেম হল এমন এক তারকা ব্যাবস্থা যেখানে দুইটি নক্ষত্র একে অপরকে এদের মিলিত ভারকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিন করতে থাকে । আলোচিত নক্ষত্র ব্যাবস্থা একে অপরকে ৬ মাসে একবার প্রদক্ষিন করে। মহাবিশ্বের বেশিরভাগ তারকায় বাইনারি সিস্টেমে অবস্থান করে । আর এই ধরনের ব্যাবস্থায় গ্রহগুলিও দুইটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিন করে । অর্থাৎ গ্রহদের আকাশে দুইটি সূর্য । PSR B1620-26b গ্রহটি এর নক্ষত্রদের মিলিত ভারকেন্দ্র থেকে ২৩ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট বা পৃথিবী ও সূর্যের ২৩ গুন দূরত্ব থেকে ১০০ বছরে একবার প্রদক্ষিন করে।

সবচেয়ে বয়স্ক গ্রহ!
 
গ্লোব্যুলার ক্লাস্টার হল এমন ধরনের নক্ষত্রস্তবক যারা গ্যালাক্সির কেন্দ্রীণকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে। এই ধরনের নক্ষত্রগুচ্ছগুলিতে নক্ষত্রগুলো বেশ ঘনভাবে সন্নেবেশিত থাকে। এমন একেকটি পুঞ্জে একটি নক্ষত্র আরেকটি নক্ষত্র থেকে মাত্র ০.১ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে। উল্লেখ্য, আমাদের পুরো সৌরজগৎ প্রায় ১ আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত। মাত্র ১৬৫ আলোকবর্ষের M4 গ্লোবুলার ক্লাস্টারটিতে প্রায় ১০০,০০০ টি নক্ষত্র রয়েছে । তাই এই ধরনের ক্লাস্টারে বিকিরনের হার অনেক বেশি , আর ঘন ঘন নক্ষত্রের অবস্থানের ফলে গ্রহ গঠিত হলেও তা মহাকর্ষিক ভাবে স্থিতিশিল হতে পারে না । তাই এই ধরনের ক্লাস্টারে প্রাণের বিকাশ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। আর ঘন অবস্থানের জন্য এই গ্রহ ও এর দুই নক্ষত্রের ব্যাবস্থার মধ্যে মহাকর্ষজনিত ক্রিয়ার ফলে আরও তারকা ঢুকে যেতে পারে । আর এর ফলে মহাকর্ষজনিত অস্থিতিশীলতার জন্য তা এর তারা স্তবক থেকেই বিচ্ছিন্ন হতে পারে !

PSR B1620-26 পালসারটির ভর সূর্যের ভরের ১.৩৪ গুন । পালসার হল একধরনের উচ্চ ঘূর্ণনশীল নিউট্রন তারা । নিউট্রন তারা একটি সুবৃহৎ তারার কেন্দ্রিন বা কোরের অবশিষ্টাংশ যা সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় তারার বিবর্তনের অনেকগুলো সম্ভাব্য পরিণতির মধ্যে একটি হল এই নিউট্রন তারা। পালসারটি সেকেন্ডে নিজ অক্ষে ৬০ বার আবর্তিত হয়। ২০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এই তারকার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩০,০০০ কেল্ভিন। বাইনারি সিস্টেমটির অপর তারা শ্বেত বামন WD B1620-26 এর ভর সূর্যের ভরের ০,৩৪ গুন এবং ব্যাসার্ধ সূর্যের ব্যাসার্ধের ০.০১ গুন ! এটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৫,২০০ কেল্ভিন ! যদি কোনো নক্ষত্রের মোট ভর সূর্যের ১.৪৪ গুণের সমান বা তার চেয়ে কম হয়, তাহলে ওই নক্ষত্র শেষ দশায় শ্বেত বামন (white dwarf) তারায় পরিণত হয়। হাইড্রোজেন পুড়িয়ে নক্ষত্র প্রসারিত হয়ে লাল দানব বা red giant দশায় উপনীত হয় । এই দশা শেষে গ্যাস নিঃসরণের ফলে তা গ্রহান্বিত নিহারিকাইয় পরিনত হয় এবং তার ঘন কেন্দ্রিন শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিনত হয় ।

এই প্রাগৈতিহাসিক গ্রহটির ভর হল বৃহস্পতির ভরের ২.৫ গুন, অর্থাৎ এটি একটি গ্যাসদানব । ২০০৩ সালে এর ভর নির্ধারণের আগে একে বাদামী বামন নক্ষত্র ভাবা হয়ত। বাদামী বামন (Brown Dwarf) নক্ষত্রকে বলা হয় ব্যর্থ তারকা। এদের ভর বৃহস্পতির ১৩ থেকে ৯০ গুণ বা সূর্যের প্রায় এক দশমাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আমরা জানি তারকাদেরকে তাদের বর্ণালীর ভিত্তিতে শ্রেণিবিভক্ত করা হয়।অন্যান্য প্রধান ক্রমের তারকাদের মতই জীবন শুরু হয় বাদামী এই তারাদের। প্রধান ক্রমের তথা Main Sequence নক্ষত্রদের ক্ষেত্রে অভিকর্ষীয় চাপে বস্তুপিণ্ডটি ভেতরের দিকে সংকুচিত হতে থাকে যতক্ষণ না এটি হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরির কারখানায় পরিণত হয়। কিন্তু বাদামী বামনের কখোনই সেই ধাপে পৌঁছতে পারে না। হাইড্রোজেন ফিউশন শুরু হবার আগেই সে পৌঁছে যায় স্থিতিশীল অবস্থায়।এদের এত অল্প ভরের কারণের এদের পরিচয়কে গ্রহের সাথে তালগোল পাকিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। উপরন্তু, দিন দিন গ্যাসীয় দৈত্য জাতের গ্রহদের সংখ্যা বাড়ছে। একই সাথে এই তারকাগুলোতে ফিউশনের অভাবের ফলে, অনেকে তাদেরকে গ্রহ বলার সাহস দেখাতে পারেন।গ্রহদের সাথে অন্যতম পার্থক্যটি হচ্ছে নিজস্ব আলো থাকা। গ্রহদের কিন্তু নিজের আলো নেই !

একে ১৯৯৩ সালে প্রথম সনাক্ত করলেও ২০০৩ সালে তা যে গ্রহ নিশ্চিত করা হয় । মুলত হাবল টেলিস্কোপের ডপলার শিফটের মাধ্যমে একে সনাক্ত করা হয় । আর এর বয়স নির্ধারিত হয়েছে এর তারা স্তবকের বয়স অনুযায়ী । কোন ছায়াপথের কেন্দ্রীণের তারকাগুলি ছায়াপথটি গঠনের সময়কালের । গ্যালাক্টিক করে অতি উচ্চ মাত্রার বিকিরনের ফলে কোন নতুন নক্ষত্র জন্ম নিতে পারে না । আর আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ের বয়স ১৩ বিলিয়ন বছর বিধায় মেসিয়ার-৪ তারা স্তবকের বয়সও ১৩ বিলিয়ন বছর । এমন স্তবকে মহাকর্ষ বল শক্তিশালী হওয়ায় নতুন গ্রহও জন্ম নিতে পারে না । তাই গ্লোবুলার ক্লাস্টারটি গঠনের পূর্বে যেসব গ্রহ গঠিত হয় কেবল তারাই উপস্থিত থাকে ।

তথ্যঃ 

লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পেইজ

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: