Header Ads

পল ডিরাকঃ লাইমলাইটের বাইরের একজন বিজ্ঞানী

কিছু মানুষ জন্মান কীর্তি গড়ার জন্য, যারা কোন কিছু অর্জন বা বিখ্যাত হওয়ার পরোয়া করেন না ! পল ডিরাক হলেন এমন একজন । তাকে বিংশ শতাব্দীর তিন বুদ্ধিমান মানুষের একজন ভাবা হয় । আইনস্টাইন, রিচার্ড ফাইনম্যানের সাথে এক কাতারে থাকা নিশ্চয় চাট্টিখানি কথা না ! শুধু তাই নয় , তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি, যিনি নিরালায় নিভৃতিতে চুপ চাপ ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করেছেন আর মহাবিশ্বের উল্লেখযোগ্য কিছু রহস্য সমাধান করেছেন। পল অ্যাড্রিয়েন মরিস ডিরাক ছিলেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন ব্রিটিশ তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী যিনি কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিজ্ঞানের এবং কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি ১৯৩২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বছর ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের লুকাসিয়ান অধ্যাপকের পদে আসীন ছিলেন। মহামহিম স্যার আইজ্যাক নিউটনের পরে দ্বিতীয় ব্যাক্তি হিসেবে তিনি তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের সবচাইতে লোভনীয় এই চেয়ারে আসীন ছিলেন । বর্তমানে এই চেয়ার দখল আছে আমাদের সবার প্রিয় স্টিফেন হকিংয়ের অধীনে । তাই বুঝতেই পারছেন , এই চেয়ারের জন্য কতটা যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হয়।

পল ডিরাকঃ লাইমলাইটের বাইরের একজন বিজ্ঞানী

তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আবিষ্কারের একটি হলো ডিরাক সমীকরণ। ডিরাক সমীকরণটি পদার্থবিজ্ঞানের আপেক্ষিকতা তত্ত্বীয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যাজাত একটি তরঙ্গ সমীকরণ যা মৌলিক স্পিন ১/২ কণিকা, যেমন- ইলেকট্রনের আচরণের এমন পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেয় যা, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এবং বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব উভয়ের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাক ১৯২৮ সালে এটি আবিষ্কার করেন। গবেষণাগারে আবিষ্কার করার আগেই এই সমীকরণের সাহায্যে ডিরাক প্রতিকণা'র(বিশেষতঃ পজিট্রন) অস্তিত্ব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। পরবর্তিতে এই ভবিষ্যদ্বাণীর সূত্র ধরে ইলেকট্রনের প্রতিকণা, পজিট্রনের আবিষ্কার আধুনিক তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলির একটি।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গাণিতিক ভিত্তির স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় আরভিন স্রোডিঙ্গার ও পল ডিরাককে। পল ডিরাকের বয়স তখন মাত্র ৩১ বছর। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে কমবয়সী নোবেল বিজয়ী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হলেন পল ডিরাক।আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভিত্তি রচনায় পল ডিরাকের ভূমিকা অনস্বীকার্য।স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী মৌলিক কণাগুলোকে প্রধানত দু'ভাগে ভাগ করা যায়_ বোসন আর ফার্মিয়ন। বোসন কণাগুলো সত্যেন বসু ও আলবার্ট আইনস্টাইনের 'বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান' মেনে চলে। আর ফার্মিয়ন কণাগুলো মেনে চলে এনরিকো ফার্মি ও পল ডিরাকের 'ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান'। ৩০ বছর বয়স হওয়ার আগেই ডিরাক হয়ে ওঠেন গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের উজ্জ্বল নক্ষত্র। মাত্র ২৮ বছর বয়সেই রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লুকাসিয়ান প্রফেসর পদে যোগ দেন। এ পদে স্যার আইজাক নিউটন অধিষ্ঠিত ছিলেন এক সময়। পরের বছর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর খ্যাতির শিখরে উঠে যান পল ডিরাক। অথচ এই খ্যাতি তিনি কখনোই চাননি। কারণ তিনি ছিলেন স্মরণকালের সবচেয়ে অসামাজিক পদার্থবিজ্ঞানী। প্রয়োজনের বাইরে তিনি কারও সঙ্গে একটা কথাও বলতেন না।

পল ডিরাকঃ লাইমলাইটের বাইরের একজন বিজ্ঞানী

১৯৩০ সালে ডিরাকের 'প্রিন্সিপলস অব কোয়ান্টাম মেকানিক্স' বইটি প্রকাশিত হয়। একই বছর তিনি রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন।রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাওয়ার পর কেমব্রিজ ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির হপকিন্স মেডেল পান ডিরাক। ১৯৩২ সালে কেমব্রিজের লুকাশিয়ান প্রফেসর পদে নিযুক্ত হন তিনি। ডেনিস স্কায়ামা ডিরাকের অধীনে পিএইচডি করে পরে কেমব্রিজে যোগ দেন। স্টিফেন হকিং স্কায়ামার অধীনে পিএইচডি করেন। ক্লাসে ডিরাক তার কোয়ান্টাম মেকানিক্স বই থেকে হুবহু লাইনের পর লাইন বলে যেতেন। একটা শব্দ কম বা বেশি বলতেন না। ক্লাসের বাইরে কারও সঙ্গে কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। ডিপার্টমেন্টের সহকর্মীদের সঙ্গেও 'ইয়েস' 'নো' কিংবা 'আই ডোন্ট নো'র বেশি কথা হয় না তার। কেমব্রিজে ডিরাকের ছাত্ররা 'ডিরাক' নামে একটা নতুন একক চালু করে ফেলেছে। কথা বলার একক। 'এক ডিরাক' মানে এক ঘণ্টায় একটি শব্দ।

১৯৩৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কথা শুনে ভীষণ অবাক হয়ে যান পল ডিরাক। আরভিন শ্রোডিংগার নোবেল পুরস্কার পাবেন তা তিনি জানতেন, কিন্তু শ্রোডিংগারের সঙ্গে নিজেও যে নোবেল পুরস্কার পাবেন তা তিনি কখনও আশা করেননি। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা যে পাবলিক সেলিব্রেটি হয়ে যান তা ডিরাক জানেন। ডিরাক জনসমক্ষে আসতে চান না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করবেন। ১৯০৮ সালের রসায়নে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড ডিরাকের সুপারভাইজার রালফরালফ ফাউলারের শ্বশুর। ডিরাককে খুব স্নেহ করেন রাদারফোর্ড। তিনি ডিরাককে অভিনন্দন জানালে ডিরাক বললেন, 'আমি নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করবো ভাবছি।'

'কেন?'

'হৈ চৈ ভালো লাগে না।'

রাদারফোর্ড বুঝতে পারলেন ডিরাক কী বলতে চাইছেন। বললেন, 'প্রত্যাখ্যান করলে তো হৈ চৈ আরও বেশি বেড়ে যাবে।'

'কীভাবে?'

'পুরস্কার নিলে এক বছরের মধ্যেই লোকে তোমাকে ভুলে যাবে। পরের বছর অন্য কেউ নোবেল পুরস্কার পাবে, তখন তাকে নিয়ে মেতে উঠবে। কিন্তু তুমি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলে প্রত্যেক বছরই লোকে তোমাকে নিয়ে হৈ চৈ করবে।'

'জি , ঠিক বলেছেন।'

সুত্র : https://en.wikipedia.org/wiki/Paul_Dirac

লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পেইজ

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: