Header Ads

সৌরজগতের সীমান্ত প্রহরী - প্লুটো

সৌরজগতের সীমান্ত প্রহরী - প্লুটো

মনে কর সৌরজগতের কোনো গ্রহের মাটি থেকে তোলা আকাশের ছবি তোমাকে দেখানো হল। আকাশে যত তারা দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে একটা অন্যদের থেকে অনেক বেশি উজ্জ্বল। পূর্ণিমার চাঁদের থেকেও অনেক গুণ বেশি উজ্জ্বল এরকম কোনো তারা পৃথিবীর আকাশে কখনো দেখনি তুমি। তোমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এটা কোন গ্রহ, আর ঐ তারাটাই বা কী, চটপট উত্তর দিও, প্লুটো থেকে সূর্যকে দেখছি।

সৌরজগতের সীমান্ত প্রহরী - প্লুটো
শিল্পীর চোখে প্লুটো থেকে চ্যারন ও সূর্য (চিত্র:NASA/Southwest Research Institute/Alex Parker)

আজ এটা নিশ্চয়ই গল্প। নামা তো দূরের কথা, প্লুটোর কাছে আজ পর্যন্ত কোনো মহাকাশযান যায়নি। প্লুটো হল সৌরজগতের একমাত্র গ্রহ যাকে কোনো রোবট মহাকাশযান পাঠিয়ে নিরীক্ষা করা হয়নি। কিন্তু তোমরা যারা স্কুলের উচু ক্লাসে পড়ছ, তাদের বলি, তৈরি হও। এবছর বা সামনের বছর যারা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছ, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিশ্চয়ই গ্রহগ্রহান্তর বিষয়ে গবেষণা করবে। তোমরা যখন গবেষণাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই খুব কাছ থেকে তোলা প্লুটোর ছবি আর নানা নতুন তথ্য আসতে শুরু করবে। গত ১৯ জানুয়ারি ২০০৬, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ কানাভেরাল থেকে যাত্রা শুরু করেছে মহাকাশযান নিউ হরাইজন অর্থাৎ নতুন দিগন্ত। দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর যাত্রার পর সে প্লুটোর কাছে পৌঁছবে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। সেখান থেকে ছবিসহ নানা তথ্য পৃথিবীতে পাঠাবো। শুধু প্লুটো নয়, নিউ হরাইজন তারও বাইরের কাইপার বেল্টেও অনুসন্ধান চালাবে। যারা এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তারা তখন সৌরজগতের সৃষ্টি ও গঠন নিয়ে অনেক নতুন খবর জানতে পারবো |

ইতিমধ্যে তোমরা নিশ্চয় খবরের কাগজে পড়েছ যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ইউনিয়ন ২৪শে আগস্ট ২০০৬ ভোটাভুটির মাধ্যমে স্থির করেছে যে প্লুটো এখন থেকে আর গ্রহ নয়, তাকে বামন গ্রহ বলতে হবে। সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা কমে দাঁড়ালো আট। বামন গ্রহের সংখ্যা বর্তমানে তিন । তবে এটা আরো বাড়তে পারে বলে অনুমান। গ্রহের যে সংজ্ঞা তাঁরা ঠিক করেছেন তা হল যে তাকে নিজের অভিকর্ষের টানে গোলাকার হতে হবে এবং তার কক্ষপথের আশেপাশের বস্তুকে আকর্ষণের মাধ্যমে নিজের কাছে টেনে নিতে হবে। প্লুটো তো নেপচুনের কক্ষপথের ভিতরে চলে আসে, তার মানে তা নেপচুনকে আকর্ষণ করতে পারে নি। তাই প্লুটো আর গ্রহ নয়। অন্তত খবরের কাগজে সেইরকমই লিখেছে। তবে কাগজের কথায় বিশ্বাস করব কিনা জানিনা, কারণ ঐ বিখ্যাত কাগজটিতে আরো লিখেছে যে আমাদের থেকে প্লুটো দূরত্ব হবে কয়েক লক্ষ কিলোমিটার। আসলে দূরত্ব হল কয়েকশ কোটি কিলোমিটার। আরো দুটি বামন গ্রহ হল জেনা ও সেরেস। এদের মধ্যে সেরেস হল গ্রহাণুপুঞ্জের বৃহত্তম সদস্য। জেনার কথা পরে বলছি।

সৌরজগতের সীমান্ত প্রহরী - প্লুটো
শিল্পীর চোখে নিউ হরাইজন, প্লুটো ও চ্যারন (চিত্র: NASA/Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory/Southwest Research Institute

বিজ্ঞানীরা ভেবেছেন প্লুটোর সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন দরকার। তা না হলে ভবিষ্যতে আরো যে সমস্ত বস্তু সূর্যের চারপাশে আবিষ্কার হবে তাদের নামকরণে সমস্যা হতে পারে। এমন ঘটনা নতুন নয়, সেরেসকে প্রথমে গ্রহই বলা হত, পরে কাছাকাছি আরো গ্রহাণু সাধারণ লোকের কিছু প্রশ্ন আছে। প্লুটো নেপচুনকে সরাতে পারেনি বলে যদি গ্রহ না হয়, তাহলে নেপচুনাই বা গ্রহ কেন ? সেও তো প্লুটোকে সরাতে পারে নি। কিছু বিজ্ঞানী তো মনে করিয়ে দিয়েছেন যে এমনকি গ্রহীরাজ বৃহস্পতিও তার কক্ষপথকে পরিষ্কার করতে পারে নি, প্রায় একই কক্ষপথে অনেক ছোটো ছোটো গ্রহাণু আছে। গ্রহের সংজ্ঞা ঠিক করার সময় প্লুটোকে ব্যতিক্রম হিসাবে রেখে দিলে কি চলত না ? এই ধরণের বিতর্কের মধ্যে কিন্তু একদিনও কাগজে খুঁজে পেলাম না না সৌরজগতে প্লুটো গুরুত্ব বা তাকে নিয়ে বিজ্ঞানীরা কি গবেষণা করছেন। প্লুটো নিজেও কিন্তু বিজ্ঞানীদের কৌতুহলের বস্তু। তা না হলে এত অর্থ খরচ করে আর মহাকাশযান পাঠানো কেন ?

কেন বিজ্ঞানীরা প্লুটো বা সৌরজগতের বাইরের অংশ নিয়ে এত কৌতুহলী ? সে কথা জানার আগে প্লুটো আবিষ্কারের গল্প আর এখনো পর্যন্ত প্লুটো সম্বন্ধে কী জানা আছে অল্প কথায় বলে নেয়া যাক। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত আমরা আটটা গ্রহের কথা জানতাম। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দূরের গ্রহ নেপচুনের কক্ষপথ নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। তাই অনেক বিজ্ঞানী ভেবে ছিলেন যে আরো দূরে অজানা এক গ্রহ আছে যার টানে নেপচুনের চলার পথ পাল্টে যাচ্ছে। কক্ষপথ যা হওয়া উচিত, আর দূরবীণ দিয়ে পর্যবেক্ষণ থেকে যা পাওযা গেছে, তাদের মধ্যে পার্থক্য থেকে বিজ্ঞানীরা নতুন গ্রহের অবস্থান আর ভর বার করার চেষ্টা করেছিলেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, নেপচুনও এইভাবে ইউরেনাসের কক্ষপথের পরিবর্তন থেকে আবিষ্কৃত হয়ে ছিল। ১৯০৫ সাল থেকে খোঁজ চলছিল তাই আরো একটি গ্রহের যা নেপচুনকে আকর্ষণ করছে। অবশেষে জ্যোতিবিজ্ঞানী ক্লাইড টমবাউ (Clyde Tombaugh) ১৯৩০ সালে গ্রহটিকে আবিষ্কার করেন যার নাম দেয়া হয়। প্লুটো। প্লুটো অবস্থান বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে যা বলে ছিলেন তার সঙ্গে মোটামুটি মিলেও গিয়েছিল। কিন্তু আমরা এখন জানি নেপচুনের কক্ষপথ পরিবর্তনে প্লুটোর ভূমিকা সামান্যই, আর তাছাড়া তখনকার পর্যবেক্ষণে প্রচুর ভুল ছিল। তাই অঙ্কের সঙ্গে প্লুটো অবস্থান মিলে যাওয়া একেবারেই সমাপাতন।

সৌরজগতের সীমান্ত প্রহরী - প্লুটো
প্লুটোর আবিষ্কর্তা ক্লাইড টমবাউ ও তাঁর ঘরে তৈরি দূরবীন

সূর্য থেকে প্লুটোর গড় দূরত্ব প্রায় ছশ কোটি কিলোমিটার। দূরত্বটা এতই বেশি যে সেকেণ্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে গেলেও সূর্য থেকে আলো প্লুটো পৌঁছতে সময় নেয় প্রায় ছ। ঘন্টা। তুলনায় পৃথিবীতে পৌঁছতে আলোর লাগে সাড়ে আট মিনিট। তবে প্লুটো কিন্তু সবসময় সৌরজগতের সবচেয়ে দূরের গ্রহ নয়। বিজ্ঞানী কেপলার আবিষ্কার করেছিলেন গ্রহরা সূর্যকে উপবৃত্তাকার পথে প্ৰদক্ষিণ করে। তবে বুধ ও প্লুটো ছাড়া বাকি সব গ্রহের কক্ষপথই প্রায় বৃত্তাকার। জ্যামিতিতে উপবৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতা বলে একটঅ ধর্ম আছে যা দিয়ে উপবৃত্ত ও বৃত্তের মধ্যে পার্থক্য মাপা হয়। যার উৎকেন্দ্রিকতা যত কম, তার কক্ষপথ তত বৃত্তের কাছে যায়। যেমন পৃথিবীর কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা ০.০১৭। গ্রহদের মধ্যে প্লুটোর উৎকেন্দ্রিকতা সবচেযে বেশি, ০.২৫। প্লুটো যখন সূর্যের সবচেয়ে কাছে আসে তখন সূর্য থেকে তার দূরত্ব পৃথিবী ও সূর্যের গড় দূরত্বের ৩০ গুণ; যখন সবচেয়ে দূরে থাকে তখন তা বেড়ে হয়ে যায় ৫০ গুণ। এরজন্য প্লুটো কখনো কখনো নেপচুনের থেকে সূর্যের বেশি কাছে চলে আসে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৯, এই সময় নেপচুন ছিল সবচেয়ে দূরের গ্রহ। আবার এমন ঘটনা ঘটবে ২২৩১ সালে। প্লুটোর কক্ষপথ অন্য এক দিক থেকেও বাকি গ্রহদের থেকে আলাদা। অন্য গ্রহরা যে তলে ঘোরে, প্লুটোর কক্ষপথ তার সঙ্গে ১৭ ডিগ্রি কোণ করে আছে। সূর্যের চারদিকে ঘুরতে প্লুটোর সময় লাগে প্ৰায় ২৪৮ বছর |

১৯৭৮ সালে মার্কিন জ্যোতিবিজ্ঞানী জেমস ক্রিসিট ও রবার্ট হ্যারিংটন আবিষ্কার করেন যে প্লুটোর একটা চাঁদ আছে। রোমান পুরাণে প্লুটো হলেন মৃত্যুলোকের দেবতা, তাই যে মাঝি নদী পার করে মৃতদের প্লুটোর কাছে নিয়ে যায়, তার নামানুসারে এই উপগ্রহের নাম দেয়া হল চ্যােরন। প্লুটো ও তার চাঁদের আয়তন খুব কাছাকাছি, প্লুটোর ব্যাস হল ২,৩২০ কিলোমিটার। আর চ্যারিনের ১,১৮০ কিলোমিটার। তাদের মধ্যে দূরত্ব হল মাত্র ১৯,০০০ কিলোমিটার। প্লুটো যে শুধু সবচেয়ে ছোটো গ্রহ তা নয়, আমাদের চাঁদ সমেত সৌরজগতে সাতটা উপগ্রহ আছে যারা প্লুটোর থেকে বড়। প্লুটোর ভর পৃথিবীর সাড়ে চারশো ভাগের এক ভাগ আর চ্যােরনের ভর প্লুটো আট ভাগের এক ভাগ। গ্রহ এবং উপগ্রহের মধ্যে এত কাছাকাছি ভর সৌরজগতে আর কোথাও নেই। সেজন্য প্লুটো-চ্যারনকে এক সঙ্গে অনেক সময় যুগ্ম গ্রহ বলা হয়। প্লুটোর মাধ্যাকর্ষণও একেবারেই দুর্বল। তোমাদের কারো ওজন পঞ্চাশ কিলো হলে, প্লুটোতে তার ওজন হবে সাড়ে তিন কিলো। তাই পৃথিবীতে সে যদি সাড়ে তিন ফুট লাফাতে পারে, প্লুটোতে লাফাবে পঞ্চাশ ফুট। এখানে একটা কথা বলে রাখি, এত দূরে আছে বলে প্লুটো বা চ্যােরনের সম্বন্ধে তথ্যগুলিতে কিছু ভুলের সম্ভাবনা আছে। নিউ হরাইজন নিশ্চয় এর চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল খবর আমাদের দেবে।

প্লুটো-চ্যারিনের ভর এত কাছাকাছি হওয়ার জন্য এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব এত কম বলে এমন এক বৈশিষ্ট্য তাদের আছে যা সৌরজগতে আর নেই। আমাদের চাঁদ নিজের চারদিকে ঘুরতে যত সময় নেয়, পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতেও একইসময় নেয়। সেজন্য আমরা চাঁদের শুধু একটা দিকই দেখতে পাই। তেমনি চাঁদের আকাশে পৃথিবীকে সবসময় একই জায়গায় দেখা যায়। পৃথিবীর আকষণে । চাঁদের কেন্দ্রে জোয়ারভাঁটা সৃষ্টি হওয়ার ফলে কেন্দ্রের সঙ্গে বাইরের অংশের ঘর্ষণ হয়েছিল। এর ফলে আস্তে আস্তে চাঁদের ঘুর্ণণ বেগ হ্রাস পেয়েছে। প্লুটোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো অদ্ভুত। প্লুটো-চ্যােরনের নিজেদের মধ্যে টানাপোড়েনের জন্য প্লুটো ও চ্যােরন, উভয়ের ঘুর্ণণ বেগই হ্রাস পেয়েছে। তাই চ্যােরন। ঠিক পৃথিবীর চাঁদের মতো প্লুটো চারদিকে যে সময় নিয়ে ঘোরে, নিজের অক্ষের উপরেও সেই সময়ে এক বার পাক খায়। প্লুটো নিজেও একই সময়ে নিজের অক্ষের চারপাশে একবার ঘুরে আসে। তার ফলে চ্যােরনের আকাশে যেমন প্লুটো সবসময় এক জায়গায় স্থির থাকে। আর তার একটা দিকই দেখা যায়, ঠিক তেমনি প্লুটো আকাশেও চ্যারন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে একটাই মুখ দেখায়। কয়েকশ কোটি বছর পরে পৃথিবী-চাঁদের অবস্থাও একই রকম হবে। প্লুটোর এক দিন হল পৃথিবীর ৬.৪ দিনের সমান। গত বছর আরো একটা খবর জানা গেছে। তোমাদের মধ্যে অনেকে হয়তো জানো মহাকাশে একটা দূরবীণ বসানো হয়েছিল যার নাম হাবল দূরবিন। সেই দূরবিনের ছবি থেকে জানা গেছে যে প্লুটোর আরো দুটো ছোটো ছোটো চাঁদ আছে। এ বছর জুন মাসে তাদের নাম দেয়া হয়েছে হাইড্রা ও নিক্স।

সৌরজগতের সীমান্ত প্রহরী - প্লুটো
হাবল দূরবিন থেকে প্লুটো, চ্যারন, হাইড্রা ও নিক্স (চিত্র: NASA, ESA, H. Weaver JHUAPL. A. Stern SwRI, and the HST Pluto Companion Search Team)

এবার দেখা যাক কেন প্লুটোকে নিয়ে বিজ্ঞানীরা এত চিন্তিত। সত্যি কথা বলতে প্লুটো এতই ছোট যে অনেকেই একে গ্রহ বলতে রাজি ছিলেন না। সৌরজগতে ভিতরের দিকে যে গ্রহগুলো আছে, অর্থাৎ বুধ, শুক্ৰ, পৃথিবী ও মঙ্গল, তাদের গঠন হল পাথুরে। এর পর আছে গ্যাস দানব গ্রহেরা, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন। প্লুটো এদের সবার থেকে আলাদা। প্লুটোর ঘনত্ব হল জলের মোটামুটি দুগুণ। এর থেকে অনুমান করা যায় যে প্লুটো ধুমকেতুদের মতো পাথর আর বরফ দিয়ে তৈরি। সেজন্য অনেকে একে ধূমকেতুর মধ্যে ফেলতে চাইছিলেন। তোমাদের মনে হতে পারে, ধূমকেতুর তো লেজ থাকে। আসলে ধূমকেতুর লেজ। সূর্যের কাছে এলে সূর্যের তাপে বরফ গলে তৈরি হয়। নেপচুন পেরিয়ে গেলে এরকম অনেক ছোটো বড় পাথরের টুকরো বা বরফে তৈরি ধুমকেতু দেখা যায়। যে বিজ্ঞানী এটা প্রথম বলেছিলেন, সেই জেরার্ড কাইপারের নামে নেপচুনের ওপাশের সৌরজগতের অঞ্চলকে বলা হয় কাইপার বেল্ট। এখানে অন্তত কয়েক লক্ষ এরকম ধূমকেতু আছে। প্লুটোকে গ্ৰহ বলা হবে কি না সে নিয়ে বিতর্কের আরেক কারণ হল কাইপার বেল্টের কোনো কোনো সদস্যের খোঁজ পাওয়া গেছে যারা বেশ বড়। তোমরা হয়তো এদের নাম শুনেছি। যেমন বিরুণের ব্যাস হল ৯০০ কিলোমিটার আর সেডনার ১,৬০০ কিলোমিটার। সম্প্রতি সূর্য থেকে প্লুটোর তিন গুণ দূরত্বে আর এক বস্তুর খোঁজ পাওয়া গেছে যা প্লুটোর থেকে বড়। এর নামকরণ হয়েছে জেনা। কাইপার বেল্টের অপেক্ষাকৃত বড় যত সদস্য পাওযা গেছে তাদের সঙ্গে প্লুটো অনেক মিল আছে। এরা সবাই বরফ আর পাথর দিয়ে তৈরি, এদের সকলের কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা বেশি। শুধু তাই নয়, এদের সকলের কক্ষপথ অন্য সব গ্রহ যে তলে ঘোরে, তার সঙ্গে অনেকটা কোণ করে আছে। তাই সৌরপরিবারের এই নতুন সদস্যদেরও গ্রহ বলা হবে, প্লুটো সমেত এদের সবাইকেই গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হবে, নাকি নটা গ্রহের তালিকা অপরিবর্তিত রাখা হবে – তা নিয়ে আলোচনা চলছে। একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাইপার বেল্টের সদস্যরা আলোকপাত করতে পারে। এদের মধ্যে বরফের পরিমাণ এত বেশি যে পৃথিবীতে জল এল কোথা থেকে, সে রহস্যের সমাধান সূত্র হয়তো এদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।

কাইপার বেল্ট নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের শেষ নেই। তাঁরা মনে করেন। শুধু জলের উৎসের নয়, সৌরজগৎ সৃষ্টির ব্যাখ্যার চাবিকাঠিও লুকিয়ে আছে। এখানে। সৌরজগৎ কী ভাবে তৈরি হয়েছিল ? সাড়ে চারুশ কোটি বছরেরও বেশি আগে ছিল এক বিশাল ধুলো ও গ্যাসের মেঘ যা মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে জমাট বেঁধে সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ তৈরি বড় পাথরের টুকরোর এত ধাক্কাধাব্ধি হয়েছে যে গোড়ায় তারা কেমন ছিল তা বোঝার আর উপায় নেই। কিন্তু কাইপার বেল্টের সদস্যরা একজন আরেকজনের থেকে অনেক দূরে দূরে আছে, তাই তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে অনেক কম। সেজন্য তাদের মধ্যে সেই প্ৰাথমিক দশা অনেকাংশে এখনো বজায় আছে। বস্তুত এদের গ্রহের আদি অবস্থা বা ভ্রণ বলা যেতে পারে। এদের থেকে সৌরজগৎ সৃষ্টির ব্যাপারে তনেক খবর পাওয়া যাবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী |

প্লুটোর আরো এক বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ করেছে। প্লুটোর খুব পাতলা হলেও একটা বায়ুমণ্ডল আছে যা মূলত নাইট্রোজেন দিয়ে তৈরি। পৃথিবী ছাড়া আর মাত্র তিনটি গ্রহ বা উপগ্রহের বায়ুমণ্ডল নাইট্রোজেন ভিত্তিক। তাই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কী ভাবে তৈরি হল সে নিয়ে খবর হয়তো প্লুটো দিতে পারবে। কিন্তু সে খবর পেতে গেলে প্লুটোর কাছে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। প্লুটো পৃষ্ঠে তাপমাত্রা মোটামুটি –২৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এখন প্লুটো সূর্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্লুটো যখন সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকে, তখন সূর্য থেকে প্রতি বর্গমিটারে যে শক্তি পায়, তা পৃথিবীতে প্রতি বর্গমিটারে যা পড়ে তার নশ ভাগের এক ভাগ। সবচেয়ে দূরে যখন যায় তখন এই পরিমাণটা হয়ে যাবে আড়াই হাজার ভাগের এক ভাগ। ফলে তাপমাত্রা এখন আরো কমছে। আর কয়েক দশকের মধ্যে প্লুটোর সম্পূর্ণ বায়ুমণ্ডল জমাট বেঁধে যাবে। তখন আবার কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে।

তাড়াতাড়ি প্লুটো পৌঁছনোর জন্য মহাকাশযান পাঠানো সহজ কথা নয়। রকেটে বেশি জ্বালানি দেয়া সম্ভব নয়, কারণ সেই জ্বালানিকেও তো বয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই দূরে যে সমস্ত যান। পাঠানো হয়, তারা এক বিশেষ ধরণের পথ অবলম্বন করে, যেখানে জ্বালানি লাগে কম কিন্তু সময় লাগে বেশি। কিন্তু ২০০৬ সালের ২রা ফেব্রুয়ারির আগে উৎক্ষেপণ হয়েছে বলে এক বিশেষ সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে যান বৃহস্পতির পাশ দিয়ে যাবে। তখন বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণকে গুলতির মত ব্যবহার করে তার গতিবেগ বাড়ানো যাবে। ঘন্টায় ৯০০০ কিলোমিটার। ঐ তারিখের পরে উৎক্ষেপণ হলে যান আর বৃহস্পতির পাশ দিয়ে যেত না। প্লুটো পৌছতে সময় লাগত পাঁচ বছর বেশি। আর ১৫ই ফেব্রুয়ারির পরে যাত্রা শুরু হলে সময় লেগে যেত একশ বছরেরও বেশি। তাই এই সুযোগ না নিতে পারলে আরো কয়েকশ বছর অপেক্ষা করতে হত। প্লুটো অভিযানের জন্য অর্থসাহায্য মার্কিন সরকার একসময় বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল বোধহয় এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। শখের জ্যোতিবিজ্ঞানী ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের দাবীতে শেষপর্যন্ত ৭৫ কোটি ডলার পায় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) । সম্ভব হয় এই অভিযান ।

পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে নিউ হরাইজন যাত্রা করেছে ঘন্টায় ৫৮,০০০ কিলোমিটার বেগে। সামনের বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নিউ হরাইজন বৃহস্পতির পাশ দিয়ে যাবে। আর সব ঠিকঠাক চললে ২০১৫ সালের ১৪ই জুলাই প্লুটো-চ্যারনের যুগ্মগ্রহের খুব কাছ দিয়ে যানের যাবার কথা। সেখানে থামার কোনো উপায় নেই, কারণ জ্বালানি তখন প্রায় শেষ হয়ে যাবে। তোমরা হয়তো ভাবছি থামতে আবার জ্বালানি লাগবে কেন। যারা ওপরের দিকের ক্লাসে পড়া তারা জান নিউটনের গতিসূত্রে বলা হয়েছে বাইরে থেকে বলপ্রয়োগ না। করলে বস্তু থামবে না। মহাকাশে তো যানের উপর কোনো ঘর্ষণজনিত বাধা নেই। তাই থামার উপায় হল রকেটকে উল্টো করে জ্বালানো | যারা লঞ্চ বা স্টিমারে চেপেছ তাদের নিশ্চয় মনে আছে পাড়ের কাছে এলে জলযানকে উল্টোদিকে চালাতে হয়। বৃহস্পতির মতো গ্যাস দানবের ক্ষেত্রে গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণকে ব্যবহার করেও ব্রেক করা যায়। কিন্তু প্লুটোর বায়ুমণ্ডল অনেক পাতলা – তাই সে সুযোগ নেই। প্লুটো থেকে ৯,০০০ কিলোমিটারেরও কম দূর দিয়ে আর ঠিক চোদ্দ মিনিট পর চ্যারনের থেকে ২৭,০০০ কিলোমিটার দূর দিয়ে ঘন্টায় ৫০,০০০ কিলোমিটার বেগে বেরিয়ে যাবে নিউ হরাইজন।

এতক্ষণে তোমরা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছ যে মহাকাশযানে কোন মানুষ নেই। আসলে দূরের অভিযানে মানুষ পাঠানো এখনো মানুষের সাধ্যের বাইরে। প্লুটো বা চ্যারন কী দিয়ে তৈরি তা জানার জন্য যানে আছে দৃশ্য আলো, অবলোহিত ও অতিবেগুনি রশ্মিবিশ্লেষক যন্ত্র। আরো আছে টেলিস্কোপিক ক্যামেরা, সৌরবায়ু ও প্লুটোর বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষক যন্ত্র। এরা সবই কাজে লাগবে প্লুটোর কাছে যাওয়ার পর। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বানানো একটি যন্ত্র সারা পথ ধরে মহাজাগতিক ধূলিকণা বিশ্লেষণ করতে করতে যাবে। এই সব অত্যাধুনিক যন্ত্র যা অজানা তথ্য পাঠাবে তার থেকে সৌরজগৎ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরো অনেক বাড়বে সন্দেহ নেই। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো তখন এই কাজে সাহায্য করবে। যানের মধ্যে আরো রাখা আছে প্লুটো আবিষ্কারক টমবাউয়ের চিতাভস্ম।

প্লুটোর সঙ্গে সাক্ষাতের পর মহাকাশযান কাইপার বেল্টের মধ্যে দিয়ে চলবে। আরো কিছুদিন যান নানা অজানা তথ্য পাঠাবে। তার থেকে সৌরজগতের উৎপত্তি সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানা যাবে। অনেক খবরও জানা যাবে ধূমকেতুদের সম্পর্কে। তার থেকে একটা বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয়ে হয়তো সিদ্ধান্তে পৌছানো সম্ভব – তা হল পৃথিবীতে ডাইনোসরদের বিলুপ্তির কারণ। জীবাশ্ম প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে সারা পৃথিবীতে ডাইনোসররা প্রায় একই সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছিল। অনেকে মনে করেন যে এর কারণ হল ঐ সময় পৃথিবীতে এক ধূমকেতু আঘাত করেছিল। তার ফলে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে তার ফলেই এই বিলুপ্তি। ধূমকেতুদের গঠন সম্বন্ধে জানতে পারলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়।

সমস্ত যন্ত্রপাতি নিশ্চয় কিছুদিন পরে খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু যানের গতি স্তব্ধ হবে না। সূর্যের আকর্ষণে তাকে বেঁধে রাখা যাবে না। মহাশূন্যে কোনো উল্কা বা ধূমকেতুর সঙ্গে তার সংঘর্ষের সম্ভাবনাও প্রায় নেই বললেই চলে কারণ তারা সাধারণত অনেক দূরে দূরে থাকে। মানুষের তৈরি এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুতগামী যান। নিউ হরাইজন চলবে তার অনন্ত যাত্রাপথে । হয়তো কয়েক কোটি বছর পরে অন্য কোনো নক্ষত্রের অন্য কোনো সভ্য প্রাণীর কাছে সে পৌঁছে দেবে পৃথিবীর মানুষের এই বার্তা – আমরাও ব্ৰহ্মাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ব্ৰতী। তখনো যদি মানব সভ্যতার অস্তিত্ব থাকে, তা বা পাড়ি দিয়েছে অন্য নক্ষত্ৰলোকেও। এমন ভাবতে ইচ্ছা হয় যে হয়তো মানুষেরই অন্য কোনো মহাকাশযানের সঙ্গেই দেখা হতে পারে আজকের এই যানের। তখনকার মানুষ হয়তো বিবর্তনের পথে আরো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সঙ্গে আধুনিক মানুষের যে তফাৎ আমাদের সঙ্গে আমাদের সেই ভবিষ্যতের পার্থক্য তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে নিশ্চয়। সুদূর অতীত থেকে আসা এই বার্তাকে তারা কী দৃষ্টিতে দেখবে ? বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে প্রযুক্তি সভ্যতার তিনটি স্তর আছে। আমাদের প্রযুক্তি এখনো প্রথম ধাপের একেবারে শৈশবে অবস্থান করছে। শিশুর প্রচেষ্টা বয়স্কদের প্রশ্ৰয় লাভ করে। আমাদের সাধ্য সামান্য হলেও শুধু উচ্চাশার বলে যে পথে আমরা পা বাড়িয়েছি, সেই পথেরই তো পথিক তারা। তাই নিশ্চয় তারা এই চেষ্টাকে সম্রামের চােখেই দেখবে। মানুষ আর পশুর মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হল পশু আকাশের নক্ষত্ৰজগৎ সম্বন্ধে উৎসাহী নয়। মনুষ্যত্বের সাধনাকে জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টার থেকে আলাদা করা যায় না। সেই চেষ্টাতে তোমরাও নিশ্চয় অংশীদার হবে।

(প্ৰকাশ: কিশোর ভারতী, জুলাই ২০০৭, পরিমাৰ্জিত)

লেখক পরিচিতি

Gautam Gangopadhyay

লিখেছেনঃ GAUTAM GANGOPADHYAY
Professor at Calcutta University

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে । সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: