Header Ads

স্টিফেন হকিং এর আলফা সেঞ্চুরীর স্বপ্নের অভিযানের গল্প

স্টিফেন হকিং এর আলফা সেঞ্চুরীর স্বপ্নের অভিযানের গল্প

আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি -স্টিফেন হকিং এর আলফা সেঞ্চুরির অঙ্গনে অভিযানের স্বপ্ন নিয়ে অল্প স্বল্প গল্প...

তাত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের এই সময়ের অন্যতম পথিকৃৎ স্টিফেন হকিং কে আমার প্রায় সবাই চিনি। উনি এমন একজন লোক যাকে আলাদা করে পরিচিত করে দিতে হয় না তবু তার এই স্বপ্নের কথা বলার আগে একটা মজার কথা বলি। তার ২৪ বছর বয়েসে করা PHDর থিসিস সর্বসাধারণের জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় রেখেছিল। এতো মানুষ ওটা দেখতে শুরু করেছিল যে ওই সার্ভার ক্র্যাশ করে অর্থাৎ ওই প্রবল চাপ নিতে পারে নি। ভাবুন কি পরিমান কৌতূহল আর আলোচনার মানুষ তিনি। যাই হোক,তার একটি স্বপ্ন তিনি আশির দশক এর থেকে লালন করছিলেন যা হয়তো সফল হতে পারে আগামী এক দশকের মধ্যে। আসুন এর উপর একটু আলোচনা করি।

হকিং এর আগে বিভিন্ন সেমিনারে আমাদের সতর্ক করেছেন যে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে দ্রুত কোনো অন্য বাসযোগ্য গ্রহে আবাস বানাতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান প্রযুক্তির মাধ্যমে বাসস্থান খুঁজে নেওয়া অতীব দুরহ একটি কাজ। সবচেয়ে শক্ত বাধা হলো মহাকাশে চলাচলের জন্য যে দ্রুততা দরকার তার আশেপাশে আমরা নেই। প্রাথমিক কাজ হলো কোনো মহাকাশযান এর তৈরী যা অন্তত কাছাকাছি একই ধরণের তারা এবং গ্রহ সমেত একটি অন্য সৌরজগৎ এ যেতে পারবে অতীব দ্রুততার সাথে।আরো সমস্যা হলো,বাসযোগ্য গ্রহ যা অন্য কোনো সৌরলোকে থাকতে পারে তার দুরত্ব এখনকার প্রযুক্তিতে ধরাছোয়ার বাইরে।তা হলে উপায় ?

স্টিফেন হকিং এর জন্য একটি অসাধারন সমাধান দিয়েছেন যাতে মানুষের তৈরী অতি ক্ষুদ্র মহাকাশযান পৌঁছে যাবে অন্য সৌরলোকে আলোর গতির পাঁচ ভাগের এক ভাগ গতিতে। আজকের কোনো মহাকাশ যান এর ক্ষেত্রে এই গতি অকল্পনীয়। কি রকম ? আসুন একটু সহজ হিসেবে দিচ্ছি।

আমাদের সবচেয়ে কাছের এই ধরণের তারার আর গ্রহের পরিবার হলো আলফা সেঞ্চুরি। এর দূরত্ব আমাদের পৃথিবীর থেকে ৪০ ট্রিলিয়ন কিমি। ট্রিলিয়ন মানে হলো এক হাজার বিলিয়ন আর এ বিলিয়ন মানে হলো ১০০ কোটি। কি বুঝলেন ? যাইহোক ,বুঝে কাজ নেই এইটুকু বুঝুন এখনকার প্রযুক্তির মহাকাশযানে এই দূরত্ব পার করতে লাগবে ৩০ হাজার বছর ! আর এই দূরত্ব অতিক্রম করার কাজ হকিং করতে চাইছেন ৩০ বছরে সময়ের মধ্যে!

কি ভাবে হবে?


এই কি ভাবে বলার আগে একটা ছোট জিনিস বলে রাখি,ওই মহাকাশযান আমাদের দেখা বিবিধ মডেল না। ওটা অনেকটা একটা বন্ধ খাম এর চিঠির মতো। হ্যা , কোনো মানুষবাহী যান না। এটি একটি ৩.২ সেন্টিমিটার আকৃতির লেসার চালিত নতুন ধারণা। এই বস্তুটি ' Breakthrough Starshot' বলে রাশিয়ান ধনাঢ্য য়ুরি মিলনার এর একটি প্রকল্প। এটিতে সমর্থন এবং সহায়তা করেছেন স্টিফেন হকিং এবং সঙ্গে আছেন মার্ক জুকেরবার্গ। আপাতত প্রকল্প ১০০ মিলিয়ন ডলার এর। আর হ্যা , নাসা ও এর সাথে আছে ! আর হ্যা,২০১৭তে এসে বলা হচ্ছে এই আলফা সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে ২০ বছর লাগবে অর্থাৎ ১০ বছর কম। এই প্রকল্পের ওয়েব সাইট হলো : https://breakthroughinitiatives.org/Initiative/3

স্টিফেন হকিং এর আলফা সেঞ্চুরীর স্বপ্নের অভিযানের গল্প

যেমনটা উপরে বলেছি,ওই আলফা সেঞ্চুরির দূরত্ব (৪.৩৭ আলোকবর্ষ বা ওই ৪০ ট্রিলিয়ন কিমি ) এতো তাড়াতাড়ি যাবে কি করে ওটাই প্রশ্ন ছিল,হ্যা ওটা যাবে ওই শিরনামে যা বলেছি ঠিক ওই ভাবে।রবীন্দ্রনাথ বোধহয় কোনো ওহী পেয়েছিলেন না হলে কি করে বুঝলেন ওটা ঠিক এইরকমই হবে ! আলোর স্রোতে পাল তুলবে এই মহাকাশযান। লেজার আলোর সাহায্যে এই মহাকাশযান চলবে। এই যান এর একটি পাল থাকবে যাকে ওই হাওয়ায় চলা জাহাজের মতো চলবে যাকে চালাবে আলোর একটি কণিকা যার নাম আমরা অনেকেই জানি,ওটা হলো ফোটন কণিকা। হাসবেন না,সবচেয়ে কম ধাক্কা হয়তো একটি কণিকা দেবে কিন্তু যদি ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ফোটন ধাক্কা দেয় ? হ্যা , চলতে শুরু করবে ,হয়তো প্রথমেই প্রচন্ড বেগে না কিন্তু এক পর্যায়ে আজকের প্রযুক্তির হিসাবে অতীব গতিসম্পন্ন হয়ে উঠবে। কত ? ওটা ও অংক কষে বের করা হয়েছে, এর সর্বোচ্চ গতিবেগ হবে ১৬১ মিলিয়ন কিমি প্রতি ঘন্টা।

স্টিফেন হকিং এর আলফা সেঞ্চুরীর স্বপ্নের অভিযানের গল্প

ও,বলতেই ভুলে গিয়েছি,ওই যান এর নাম রাখা হয়েছে ন্যানো ক্রাফট। ওজন এক গ্রাম এর মতো। আর হ্যা , এই জিনিসটি কিন্তু কোনো কল্প বিজ্ঞান এর বস্তু না। প্রায় অধিকাংশ তাত্বিক পদার্থবিদ এবং বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ এর ধারণা কে স্বীকৃতি দিয়েছেন
এই গতিতে যাওয়া একমাত্র বাধা না,এর সাথে আছে মহাকাশে বিকিরণ এর সমস্যা। এই ক্ষুদ্র মাপের মহাকাশযান এর মধ্যে থাকবে অতীব সূক্ষ্ম ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট যাকে নষ্ট করে দিতে পারে এই বিকিরণ। এই জন্য প্রযুক্তিবিদরা যতটা সম্ভব এই বিকিরণ থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। কিন্তু এর জন্য বিশেষ প্রলেপ ব্যবহার করলেই আবার ওজন বেড়ে গতি কমে যেতে পাড়ার ঝামেলা আছে। আরো সমস্যা হলো ওই ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট মানে আইসি গুলোর কার্যকর আয়ু হয় ২০ বছর। মানে ধরুন পৌঁছল আলফা সেঞ্চুরিতে তখন ওই সার্কিট সবচেয়ে বয়স্ক সার্কিট হয়ে যাবে।

স্টিফেন হকিং এর আলফা সেঞ্চুরীর স্বপ্নের অভিযানের গল্প

বিকিরণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য annealing বলে একটি পদ্ধতি এবং এর উপযোগী পদার্থের ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ধরুন ওই উচ্চ তাপমানে আরো কার্যকরী হয় যে পদার্থ তার ব্যবহার এর চিন্তা করা হয়েছে।

এই যানটির আকৃতি এবং এর গতিবেগ ইত্যাদি নিয়ে দুটো প্রতিবেদন দিয়েছি তথ্যসূত্রে। যা অবশ্যই দেখবেন আশা করবো।
ইতিমধ্যেই ওই আলফা সেঞ্চুরির একটি পৃথিবীর অবস্থানের মতো মানে তাত্বিক ভাবে বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যার নাম রাখা হয়েছে প্রক্সিমা সেঞ্চুরি। এখন এর বাস্তব উপস্থিতির প্রমান করার কাজ করবে এই ক্ষুদে মহাকাশযান।

এই মহাকাশযানটির জন্য যে প্রাথমিক বেগ দরকার তা হলো ১০০ গিগাওয়াট এর শক্তি যা আসতে পারে কোনো পারমাণবিক বা অন্য কোনো শক্তির উৎস থেকে। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো ওই শক্তি লাগবে নির্দিষ্ট শক্তির লেজার আলোর বিম একদম ওই উদ্দিষ্ট স্ট্যাম্প সাইজের মহাকাশযানএর উপরে যাওয়ার ধাক্কা দিতে। আর ধাক্কা দিতে একদম এর জায়গা মতো লক্ষ্য স্থির করে মারতে হবে। কোনো এক চুল এদিক ওদিক হলে চলবে না !কতটা সঠিক হতে হবে ? কল্পনা করা কঠিন কারণ ওই বস্তুটি মহাকাশে এত ছোট যে ভাবতে পারেন চাদে একটা সিডি বা ডিভিডি আছে আর আপনি পৃথিবী থেকে ওটার উপর লক্ষ্য স্থির করে বিম ফেলছেন।কি বুঝলেন ?কি পর্যায়ের নিখুত পরিকল্পনা আর কার্যকরন দরকার হবে একবার ভাবুন !

স্টিফেন হকিং এর আলফা সেঞ্চুরীর স্বপ্নের অভিযানের গল্প

মূল পরিকল্পনা ঠিক এই রকম , প্রথমে ওই চিপ ভরা খাম মানে ন্যানো ক্রাফট কে মহাকাশে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পাঠানো হবে। এরপর পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে এক কয়েক কিমি ব্যাপী সারি সারি অনেকগুলো লেজার এমপ্লিফায়ার থেকে বের হবে উদ্দিষ্ট শক্তির বিম যা একদম ওই ছোট্ট যানটির উপর ধাক্কা দেবে ১০ মিনিট এর মতো। এরপর গতি পাবে ওই যানটি। ছুটে চলবে অভীষ্ট লক্ষ্যে।ছবি আর প্রামান্য ভিডিও আরো সুবিধা করবে বুঝতে তবে আরো সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয় যে ওই আলোর ধাক্কা দেবে যান এর পাল এ ।

প্রথম ছবি অবশ্যই এই প্রকল্পের জনক স্টিফেন হকিং এর ,পরের ছবি এর প্রযোজক ইউরির। এই লোকটিকে মোটেই সাধারণ একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ভাববেন না। প্রচুর বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে উনার দান এবং বিনিয়োগ আছে। ফেসবুক থেকে আলিবাবা অনেকের ক্ষেত্রে উনার আগাম ধারণা আজ সত্য হয়েছে। বিনিয়োগ ও করেন মোক্ষম জায়গাতে তাই প্রকল্প মোটেই কোনো বড়লোকের শখ পূরণ এর না। আর হ্যা, উনি জন্মেছেন ইউরি গ্যাগারিন এর মহাকাশে পা ফেলার বছরে অর্থাৎ ১৯৬১ তে। মহাকাশ এবং গ্রহান্তরের প্রাণ খোঁজার নেশা উনার একটি প্রবাদপ্রতিম বস্তু। সঙ্গে আছে জুকেরবার্গ বা নাসা। সুতরাং প্রকল্পটি মোটেই হেলাফেলার না !

খরচ কি রকম ? মানে ট্যাকাটুকা ?

মন্দ না তবে অন্য নাসার প্রজেক্ট ইত্যাদির তুলনায় কম ভাবতে পারেন।আপাতত যা ভাবা হচ্ছে তা হলো ১০ বিলিয়ন ডলার।প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো একটা মার্কিন রণতরী বহনকারী যুদ্ধজাহাজ মানে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এর দাম ওটা।

এর সাথে আর কিছু থাকবে না ? মানে তথ্য পাবো কি করে ?

হ্যা,থাকবে।এর সাথে সমানুপাতিক একটি অতীব ক্ষুদ্র ক্যামেরা আর তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থা মানে ট্রান্সমিটার ও থাকবে।তবে একটাই দুঃখ, ওই আলফা প্রক্সিমি গ্রহের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাত্র কয়েক মিনিট হবে কারন আমরা এই যানটির গতি কমাতে পারবো না।তা হলেও,মন্দ কি ?জীবন এতো ছোট যখন ওই নতুন পদক্ষেপ আর তার ফলাফল দেখতে পারব এক প্রজন্মে ওটাই বা কম কি ?

এই পরিকল্পনার কিঞ্চিত সারসংক্ষেপ :



  1. এর শক্তি যোগাবে প্লুটোনিয়াম-২৩৮ রেডিও আইসোটোপ অথবা Americium-241 যা দীর্ঘদিন ধরে শক্তির উৎস হতে পারে।
  2. ছবি তলার জন্য অতীব ক্ষুদ্র ক্যামেরা আর তার তথ্য পাঠানোর রাস্তা সেই লেজার,চারটি এই ধরনের ক্যামেরা থাকবে সঙ্গে থাকবে চারটি প্রসেসর মানে কার্যকরনের মগজ
  3. মহাকাশে কয়েক হাজার এই ন্যানো ক্রাফট উপগ্রহ স্তরে পাঠিয়ে রাখা হবে
  4. ছবি পাঠানোর সময় হবে চার বছর অন্তর
  5. একই লেজার লাইট বিমার ওই ছবি আবার গ্রহন করবে পৃথিবীতে
  6. মহাজাগতিক ধুলো থেকে বাচানোর পরিকল্পনা থাকবে
  7. এর উপর বিশদ জানতে অবশ্যই এই প্রজেক্টের লিঙ্কটি দেখুন


কামনা করি স্টিফেন হকিং এবং তার স্বপ্ন সফল হোক ! নতুন দিগন্ত খুলে যাক মানুষের জন্য !
আগামী প্রজন্মের সকল শিশু এবং অনাগত পজন্মের মানুষ এইভাবে নতুন কিছুর পাওয়ার সুফল পাবে ওটাই হোক আমাদের সকলের প্রচেষ্ঠা।

আসুন,অশেষ রবীন্দ্রনাথ এর মত বলি,

" আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি,
আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী "

এক নম্বর ছবির লোকটি কে আশা করি বলে দিতে হবে না, দ্বিতীয় ছবির লোকটির পরিচয় দিতে নাম দিয়ে দিলাম আর তার পরের ছবিগুলো মন দিয়ে দেখবেন মানে তিন নম্বর থেকে পরপর। যদি ইউটিউব এর প্রতিবেদনগুলো দেখতে পারেন তা হলে অবশ্য ছবি দেখার প্রয়োজন হবে না তবে আমাদের সময় সবার কম সুতরাং যদি ওই ন্যানো ক্র্যাফট এর মতো যেতে হয় তা হলে ছবিই ভরসা।

তথ্যসূত্র :

১. https://www.washingtonpost.com/…/stephen-hawking-announce…/…
২. http://www.nature.com/…/search-for-extraterrestrial-intelli…
৩. https://breakthroughinitiatives.org
৪. http://www.bbc.com/news/science-environment-36025706
৫. https://cosmosmagazine.com/…/space-lasers-and-light-sails-t…
৬. https://www.space.com/32546-interstellar-spaceflight-stephe…
৭. http://www.iflscience.com/…/stephen-hawking-reveals-plan-s…/
৮. ইউটিউবের প্রজেক্টের মূল এনেমেশন : https://www.youtube.com/watch?v=xRFXV4Z6x8s
৯. একটি সহজে বোঝানোর প্রতিবেদন : https://www.youtube.com/watch?v=fsARBnvUB2E

লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ Ajijul Shahji

যদি লিখাটি ভালো লেগে থাকে তাহলে দয়া করে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সহ নিজের পরিচিতজনদের সাথে শেয়ার করুন। এমন আর্টিকেল নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন EduQuarks ব্লগ। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: