Header Ads

গল্পঃ সুপ্তকলি

গল্পঃ সুপ্তকলি

গল্পঃ সুপ্তকলি
লেখিকাঃ অনামিকা নন্দী
জনরাঃ থ্রিলার

"একটা ব্যাপার আছে, বুঝলি?

প্রথমে একটা পাত্রে একটু বুট নিতে হয়, তারপর একটু চানাচুর নিতে হয়। তারপর পেঁয়াজ, মরিচ, ধনেপাতা, টমেটোর সমন্বয়ে তৈরি সালাদ নিতে হয়, তারপর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি মুখ ছিদ্র করা একটা বোতলে চাপ দিয়ে সেখান থেকে একটু তেল ছিটিয়ে নিতে হয়, তারপর একই রকম মুখ ছিদ্র করা প্রযুক্তি থেকে লবণ ছিটিয়ে নিতে হয়। এটা কিন্তু শুধু লবণ না। এটা হচ্ছে লবণ ও মরিচের গুঁড়ার মিশ্রণ।
তারপর যে পাত্রে এই সবগুলো জিনিস নেয়া হয়েছে সে পাত্রকে একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে মনের মধ্যে যত রাগ আছে সেইসব রাগকে একসাথে করে তালে তালে ছন্দ মিলিয়ে দুই হাত দিয়ে ঝাঁকাতে হয়। ব্যস! হয়ে গেল তৈরী সেই জিনিস যে জিনিস তৈরীর বর্ণণা প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত শুনে আসছিস।

বুঝলি? একটা ব্যাপার আছে।
সবাই জিভে জল আনার মত চানাচুর মাখাতে পারে না। "

৭-৬-১৭
১১:৪৭ am

সে মুগ্ধ।
এতক্ষণ যার মুখে জিভে জল আনার মত চানাচুর মাখানোর প্রনালী শুনা গেল সে আমার বাল্যবন্ধু মুগ্ধ। মুগ্ধ চৌধুরী।

আমি আর চৌধুরী সাহেব এখন এক লক্কর ঝক্কর মার্কা রাস্তার এক ঝাক্কানিমূলক ভ্রমণে রত আছি। দুজনেরই গন্তব্যস্থল ঢাকা। দুজনেরই গন্তব্যস্থল এক জায়গায় হলেও কর্মস্থল এক জায়গায় না।

মুগ্ধ পেশায় ডাক্তার। পেশাগত বয়স বেশি না। গতকালের কেস নিয়ে এ পর্যন্ত ওর কেস সংখ্যা পঁয়ত্রিশ। এর মধ্যে ছাব্বিশটাতেই সে সফল। এমন ঘটনাও দেখা গেছে যে যমরাজ দলবল নিয়ে রোগীর বাড়িতে চলে এসেছে আর মুগ্ধ এসে সদলবলে যমরাজকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে দিয়েছে।

ডাক্তার হিসেবে অল্পদিনের মধ্যেই মুগ্ধ সম্পর্কে সাধারণের মনে একটা মনোমুগ্ধকর ধারণা জন্মেছে। সবার মতে মুগ্ধ সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই বলে দিতে পারেরে যে রোগী বাঁচবে নাকি পরলোকগত হবে।

সবার ধারণা মুগ্ধ যদি একবার মুখ খোলে বলে যে, চিন্তার কোন কারণ নেই। দুদিনের মধ্যে সবঠিক হয়ে যাবে তাহলে কোন রোগীর সাধ্য নেই যে দুদিন পরেও বিছানায় শুয়ে থাকে। আর যদি বলে যে, আর কোন আশা নেই। চিকিৎসা ছেড়ে এবার শেষযাত্রার কাজ শুরু করা উচিত তাহলে তক্ষুণি সবাই বাঁশ, কাঠ জোগাড় করার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেয়।

তবে এখন পর্যন্ত মুগ্ধ শুধু একটা দিকেই ব্যর্থ। সেটা হল সে অন্য সব বয়সের রোগীর কাছে ভরসার দূত হিসেবে পরিচিত হলেও বৃদ্ধদের কাছে এখনো তেমন কোন আস্থা অর্জন করতে পারেনি। বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে মুগ্ধর সফলতা জিরো পার্সেন্ট। হয়তোবা পরবর্তীতে এক্ষেত্রেও সে একশ পার্সেন্ট সফলততা অর্জন করতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে এক বাদ দিয়ে শুধু দুটো শূণ্য নিয়েই জীবন চালাতে হচ্ছে। আর যখন সে এক্ষেত্রেও হাত পাকাতে পারবে তখনি আমি আমার বন্ধুকে আমার ঠাকুরমার জন্য পাকাপাকিভাবে নিয়োগ করব।

আমি এখন ঢাকা যাচ্ছি আমার অফিসের একটা কাজে। আর মুগ্ধ ঢাকা যাচ্ছে তরুণ ডাক্তারদের নিয়ে আয়োজিত একটা কনফারেন্সে। যাত্রা একসাথে শুরু করলেও ফেরা দুই বন্ধুর একসাথে হবে না। মুগ্ধ কালকেই চলে আসবে। আমার আসতে দু চারদিন দেরি হবে।

৯-৬-১৭
৬:৪৭ pm

ভুলে মোবাইলটা রুমে ফেলে গিয়েছিলাম। বাইরে থেকে এসে দেখি কাকাতো ভাইয়ের নাম্বার থেকে পঁচিশটা মিসড কল উঠে রয়েছে। ব্যাপার কি চিন্তুা করতে যেয়ে সময় নষ্ট না করে সাথে সাথে কল দিলাম।
-কি রে বাদল?
বাদল আমার কাকাতো ভাইয়ের নাম। ফোন ধরেই বাদল কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ওর কান্না শুনে আমার বুকের মধ্যে একটা মোচড় দিয়ে উঠল।
-কি রে কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন?
-ঠাকুরমা... ঠাকুরমা...
- কি হয়েছে ঠাকুরমার?

উত্তরে যা শুনলাম তাঁর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বাদল জানাল সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ঠাকুরমা আমাদের ছেড়ে অন্য জগতের সন্ধানে চলে গেছেন। কিন্তু আসার আগে তো ঠাকুরমাকে মোটামুটি সুস্থই দেখে এসেছিলাম। হ্যাঁ, হাঁটাচলা ঠাকুরমার গত নয় মাস ধরেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খাওয়া সহ বাকি সব কাজ ওনাকে বিছানাতেই করতে হত কিন্তু তারপরেও এসব বাদ দিয়ে অন্যদিক দিয়ে চিন্তা করলে সুস্থই ছিল। কষ্ট যা পেত সেটা শুধু হাঁপানীর জন্যই। কিন্তু তাহলে হঠাৎ আজকে। আমি কিচ্ছু ভাবতে পারছিলাম না।

-আমাকে সব বল তো বাদল। কি হয়েছিল আসলে?
-আজকে চারটার দিকে হঠাৎ ঠাকুরমার টানের সমস্যাটা অনেক বেড়ে যায়। তুমি বাসায় ছিলে না। হীরণ কাকাকেও বাসায় যেয়ে পাইনি। কোথায় জানি গিয়েছিল রোগী দেখতে। আমরা কি করব কিচ্ছু বুঝতে পারছিলাম না। আর ঠাকুরমার এই টানটা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে এই টানেই ঠাকুরমার শেষ শ্বাস ফেলেছিল।
-আরে আমি ছিলাম না তো কি হয়েছিল? হীরণ কাকু ছিল না তো কি হয়েছিল? তুই মুগ্ধকে ডেকে আনতে পারলি না?

বাদল কান্নার জন্য কিছু বলতেই পারছিল না। আমি নিজেকে শক্ত করে ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললাম,
-কাঁদিস না ভাই। মানুষ তো আর সবসময় বেঁচে থাকে না, তাই না? আর আমাদের ঠাকুরমা তো অনেকদিন ধরেই শয্যাগত ছিলেন। কষ্ট পাচ্ছিলেন। যা হয় ভালোর জন্যই হয় ভাই। কাঁদিস না। আর্শীবাদ কর আমাদের ঠাকুরমা যেন স্বর্গবাসী হন। আমি এখনই বাড়ি আসছি।

এই বলে মোবাইলটা রাখলাম। আর মোবাইল রাখার সাথে সাথেই দু গালের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গরম জলের স্রোত অনুভব করতে লাগলাম।

১১-৬-১৭
১১:৪৫ am

মুগ্ধর সাথে বসে আছি। ও বলল,
-কি রে কেমন আছিস?
-আছি আর কি!
-মন খারাপ করে থাকিস না। যা হয় ভালোর জন্যই হয়। যা হয় তা হবে বলেই হয়। এটা তো আমাদের বুঝতে হবে, তাই না?
- সবই বুঝেছি আমি।
-কি?

আমি মুগ্ধের দিকে তাকিয়ে বললাম,
-জানিস মুগ্ধ! আমার ঠাকুরমাকে হত্যা করা হয়েছে। বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে মানুষটাকে।

মুগ্ধও আমার মতই আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম,
-হ্যাঁ রে মুগ্ধ। সত্যি বলছি। আমি সবই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমাকে একটা কথা বলবি?
-কি?
- কেন আমার ঠাকুরমাকে মেরে ফেলেছিস?
মুগ্ধ আমার কথা শুনে কেঁপে উঠল। আমি বললাম,
-সত্যি করে বল তো ভাই। কেন? কি কারণে তুই ঠাকুরমাকে বিষ।দিয়েছিস?
-না আসলে ব্যাপারটা তেমন না। তুই যা ভাবছিস সেটা আসলে ঠিক না।
-কি ঠিক না? তুই মারিস নি আমার ঠাকুরমাকে? অস্বীকার করতে পারবি তুই?
- না আসলে ----
-এইসব কথা বাদ দিয়ে যা জানতে চাচ্ছি সেটা বল।
- সত্যি শুনতে চাস?
-বল।
- তবে শুন।
এ পৃথিবীতে শুধু তাঁরাই বেঁচে থাকতে পারবে যারা পৃথিবীকে শ্রম দিয়ে, মেধা দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। এ পৃথিবীতে মানুষের ততদিনই বেঁচে থাকার অধিকার আছে যতদিন পর্যন্ত মানুষ পৃথিবীকে কিছু না কিছু দিয়ে যেতে পারবে। বৃদ্ধ অবস্থায় মানুষের এমন কোন শক্তি থাকে না যার দ্বারা সে পৃথিবীর উন্নতি করতে পারে। তখন তাঁরা পৃথিবীর জঞ্জালে পরিণত হয়। যদি শুধু জঞ্জালও হত তাও না হয় মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তাঁরা প্রতিনিয়ত পৃথিবীর অগ্রগতিতে বাঁধা সৃষ্টি করে। জীবন্মৃত অবস্থাতেও পৃথিবীকে তাঁদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়, খাদ্য ব্যয় করতে হয়, অক্সিজেন ব্যয় করতে হয়, ওষধ ব্যয়য় করতে হয়। আর তাঁর থেকেও যেটা সবচেয়ে ভয়ংকর সেটা হচ্ছে পৃথিবীকে তাঁর পেছনে নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করতে হয়। তুই চিন্তা করে দেখ। তুই বা তোর বাবা বা তোর পরিবারের মানুষেরা যে সময়টা ওনার পেছনে ব্যয় করত সেই সময়টা যদি অন্য কোন অগ্রগতিমূলক কাজের জন্য ব্যয় করত তাহলে পৃথিবীর কতই না উপকার হত! যে পরিমাণ অর্থ, খাদ্য, ওষুধ, সময় তোরা তোদের ঠাকুরমার পেছনে ব্যয় করেছিস সেই জিনিসগুলো যদি তোরা কোন সম্ভাবনাময় জীবনের জন্য ব্যয় করতি তাহলে পৃথিবীর কত উপকারই না হত! হ্যাঁ জানি। এখন প্রশ্ন উঠবে যে তাহলে একটা বাচ্চা যখন ছোট থাকে যখন তাঁর নিজস্ব শক্তি থাকে না, মেথা থাকে না, যখন সে অন্যের টাকায় চলে, অন্যের দেওয়া খাদ্যে বেঁচে থাকে, অন্যের সময় ব্যয় করে নিজের জন্য সময় তৈরি করে তখন তো সেই শিশুটিকে এই অপরাধের জন্য মেরে ফেলা হয় না? তাহলে যখন একজন মানুষ বৃদ্ধ বয়সে এসে ওই শিশুর মত অসহায় হয়ে যায় তখন ওই বৃদ্ধ মানুষটিকে কেন বিদায় করে দিতে হবে?
উত্তর হচ্ছে একটা শিশুকে সবকিছু দিয়ে বড় করা হয় কারণ এই শিশুটাই বড় হয়ে নিজের, পরিবারের, সমাজের এবং দেশের ভবিষ্যত গড়বে। পৃথিবীকে নতুন কিছু উপহার দিবে। তাঁর জীবনের শুরুতে তাঁকে সব রকমের রসদ দেয়া হয় যাতে করে সে বড় হয়ে সেসব কিছুই পৃথিবীকে দ্বিগুণভাবে ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যে মানুষ জীবনের শেষ পর্যায়ে চলে গিয়েছে, যার কাছ থেকে আর নূন্যতম কিছু পাওয়ার আশাও পৃথিবীর নেই সে মানুষকে পৃথিবী নিজের কাছে রাখবে? যে গাছ মরে গিয়েছে, যার কাছ থেকে আর কোন দিনও কোন ফল, ফুল, ছায়া, অক্সিজেন পাওয়া যাবে না সেই গাছকে উপড়ে ফেলে নতুন গাছ রোপন করাতেই কি জগতের মঙ্গল না?
- কি বলছিস তুই এগুলো? তুই কি জানিস? তুই একজন ভয়ংকর রকমের মানসিক রোগী?
-সে তুই যা খুশি বল না কেন! ওগুলো কোন ব্যাপার না। কেউ যখন নতুন কোন থিওরি বের করে তখন সবাই তাঁকে পাগলই ভাবে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখ। আমার মত অনেককেই তোর মত অনেকের কাছে পাগল উপাধি পেতে হয়েছে।
-তোকে বুঝানো যাবে না।
-আমি কিছু বুঝতেও চাই না। শুধু এটা বুঝা যে তুই কেমন করে বুঝলি যে আমি তোর ঠাকুরমাকে মেরেছি?
-বাদলের ফোন পেয়ে আমি সাথে সাথে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরি। বাড়িতে ঢুকার আগেই হীরণ কাকার সাথে দেখা হয়। কাকা আমার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলতে লাগল যে "মৃত্যুটা আমার কাছে ঠিক স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। হঠাৎ করে টানের সমস্যাটা এত কি করে বাড়ল বুঝতে পারলাম না। আমি পরিমাপ করে দেখেছি ওনার এটা যে অবস্থায় ছিল সেটা যদি মোটামুটিও বাড়ে তবুও এর জন্য মারা যেতে হবে না। কিন্তু তারপরেও যে কি করে কি হল বুঝতে পারছি না।" আমি তখন কাকার চোখে একটা অন্যরকম আভাস পাচ্ছিলাম। আসলে কাকা ভাবছিল এক্ষেত্রে কোন অর্থজনিত ব্যাপার আছে কি না। যার কারণে পরিবারের কেউ ঠাকুরমাকে এমন কোন ওষধ বা এমন কিছু খাইয়েছে যার কারণে ওনার সমস্যাটা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমি কাকাকে এই ব্যাপারে নিশ্চিত করলাম যে আমাদের পরিবারের সবকিছু আগে থেকেই বন্টন করা আছে এবং না থাকলেও পরিবারের কেউ এমন কাজ করবে না। এমন সময় বাদল কাঁদতে কাঁদতে এসে বলল যে, "মুগ্ধ দাদা এসে কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন বলল যে বাঁচার কোন আশা নেই। তবুও তিনি একটা ইনজেকশন দিয়ে দিচ্ছেন। দেখা যাক কি হয় তখনই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম কি হবে। আর হলোও ঠিক তাই। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল।" সত্যি বলতে তখনো আমার তোর উপর কোন সন্দেহ হয়নি। কিন্তু ওই সময়ই যখন নোটন কাকার ছোট ভাই রমেশ কাকা কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছিল তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? রমেশ কাকা কি বলেছে জানিস? বলেছেন বিকেলের দিকে ওনার মার নাকি শরীরটা হঠাৎ করেই একটু খারাপ করেছিল। কিন্তু তারপর যখন তোকে নেয় তখন নাকি তুই বলেছিস শেষ যাত্রার কাজ শুরু করে দেয়া উচিত। হাতে নাকি আর ঘন্টা দুয়েকের বেশি সময় নেই। এই কথা বলেই রমেশ কাকা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিলেন।। তখনই আমার কেমন সন্দেহ হতে লাগল। হীরণ কাকাও আমার দিকে ভ্রু উঁচু করে তাকাল। ওনার চোখের দিকে তাকিয়েই আমার মনে প্রথম প্রশ্ন আসল কি সেই ক্ষমতা যার বদৌলতে তুই এমন গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারিস যে আর কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু হবেই! বড় বড় ডাক্তাররাও তো সবসময় এমনভাবে নিশ্চিত বলতে পারে না। তবে তুই এমন করে? আমার কথা শুনে হীরণ কাকা তক্ষুণি ওনার এক বন্ধুকে ফোন করে আমাদের বাড়িতে আসতে বলেন। ওনি এসে ঠাকুরমাকে এস.এল হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে ওনার পরিচিত অনেক ডাক্তার নাকি আছে। সেখানে অনেকক্ষণ নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর হীরণ কাকার বন্ধু ওনাকে জানান যে ঠাকুরমার শরীরে একটা ভুল ওষধ দেওয়া হয়েছিল। যা তাঁর রোগকে তীব্র মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং এর জন্যই ওনার মৃত্যু হয়। হীরণ কাকা ওনার বন্ধুকে বলেছিল যে, ভুল করে হয়তোবা কেউ দিয়ে দিয়েছে।।কিন্তু আমার আর হীরণ কাকুর দুজনেরই মনে হয়েছিল যে কাজটা তুই করেছিস। আরো নিশ্চিত হলাম তখন যখন জানতে পারলাম তোর ভবিষ্যৎবাণী মত নোটন কাকার মা কিছুক্ষণ আগেই মারা গিয়েছে। হীরণ কাকা তখন ছুটল নোটন কাকার বাড়ি। যেমন করেই হোক বুঝিয়ে শুনিয়ে ওনার মা কে নিয়ে আসলেন হাসপাতালে। তারপর আবার তাঁর বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারলাম যে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা ছিল রোগীর। কিন্তু এমন একটা ওষধ ওনাকে দেয়া হয়েছে যে এটা শরীরে প্রবেশের ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য। ব্যস! আর কি। আর তো কিছু বুঝার বাকি রইল না। বুঝতে পেরে গেলাম যে এই দুই মৃত্যুর জন্যই তুই দায়ী।
দুই শরীরেই তুই ওষধরূপী মরণঘাতী বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছিলি।
- হ্যাঁ। আমিই করেছি। আমি।তোদের বাড়িতে যেয়ে দেখি তোর ঠাকুরমার টানের সমস্যাটা হালকা বেড়েছে। আমি চাইলে আধা ঘন্টার মধ্যেই সেটা কমিয়ে ফেলতে পারতাম। কিন্তু তারপরে ভাবলাম কি দরকার! এখন তো ওনার বিদায় নেবারই সময়।
শুধুশুধু বেঁচে থেকে পৃথিবীর ক্ষতি করার তো কোন দরকার নেই। তাই সেই কাজটাই করেছি যেটা আমার করা উচিত ছিল। নোটন কাকার মায়ের ব্যাপারটাও একই রকম।
-তুই এত নির্দয় হলি কি করে? তোর বাবা-মার ক্ষেত্রে কি করবি তুই?
-চিন্তা করিস না। সময় হলে আমি আমার বাবা-মার হাত থেকেও পৃথিবীকে বাঁচাব।
-মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর।
-না। আমার মাথা ঠিকই আছে। আমি মুগ্ধ চৌধুরী---

আমি ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম,
-হ্যাঁ। তুমি মুগ্ধ চৌধুরী। গত নয় তারিখ রাত নয়টা পর্যন্ত যার কেস সংখ্যা ছিল সাঁইত্রিশ। যার মধ্যে এগারোটাতে সে ব্যর্থ হয়েও নিজের দিক দিয়ে সফল হয়েছিল, তাই না?
-একদম তাই। এই পর্যন্ত যতগুলো কেসে আমি ব্যর্থ হয়েছি তাঁর সবগুলোই বয়স্ক রোগী ছিল। যাদের থেকে পৃথিবীর আর কোনরূপ আশা ছিল না।
-তোকে কিছু বলার নেই রে মুগ্ধ।
-না না। যা খুশি বলতে পারিস তুই।
-ছোটবেলায় তুই আর আমি একসাথে ঠাকুরমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতাম, মনে আছে মুগ্ধ?
-মনে আছে।
-ঠাকুরমার কাছ থেকেই আমরা প্রথম শুনেছিলামম মানুষ মরে গেলে নাকি তারা হয়ে যায়। যখনই কেউ মারা যায় তখনই নাকি আকাশে একটা তারার সংখ্যা বেড়ে যায়। আর যখনই কোন তারা আকাশ থেকে খসে যায় তখনই নাকি পৃথিবীতে কেউ জন্মায়, মনে আছে?
-মনে আছে।
-ছোটবেলায় শোনা রূপকথার গল্পকে সত্যি ভেবে বলছি, পরশু চন্দ্রোদয়ের শুভমুহূর্তে আকাশে এক নতুন তারার আবির্ভাব ঘটেছে, খেয়াল করেছিস?
ছোটবেলায় শোনা সেই রূপকথার গল্পকে সত্যি ভেবে বলছি, কাল চন্দ্রোদয়ের শুভমুহূর্তে আকাশের বুক থেকে একটা তারা খসে পড়ে তোর ঘরে জায়গা নিয়েছে, খেয়াল করেছিস?

মুগ্ধ চুপ করে রইল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
আকাশে জায়গা করে নেওয়া নতুন তারাটার নামানুসারেই আকাশ থেকে খসে পড়া তারাটার নামকরণ করলাম।
তোর মেয়ের নাম দিলাম সুপ্তকলি।
সুন্দর না নামটা? নামটা আমার দাদুর অনেক প্রিয় ছিল।

এই বলে আর পেছনে না তাকিয়ে আমি সামনের দিকে পা বাড়ালাম।

লেখক পরিচিতি  
লিখেছেনঃ অনামিকা নন্দী 

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: