Header Ads

পৃথিবীর সবচাইতে সুপরিচিত সমীকরণটির কথা!

যদি বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচাইতে সুপরিচিত সমীকরণ কোনটি? এক অর্থে সবাই বলবে E = mc2 । অ্যালবার্ট আইনস্টাইন যেমনি সুপরিচিত, তেমনি সুপরিচিত তার বিখ্যাত এই সমীকরণটি। বিজ্ঞানের জগতে এত বিখ্যাত আর কোনো সমীকরণ দ্বিতীয়টি আছে কি না, তাতে সন্দেহ আছে। আমার তো মনে হয় রাস্তায় ১০০ টি টি-সার্ট দেখলে কমপক্ষে ৫ টি তে এই সমীকরণ লিখা ! সমীকরণটি এত সুপরিচিত হলেও আমরা অনেকেই জানি না কী এর অর্থ ! সহজ ভাষায় এই সমীকরণের অর্থ হল শক্তি হচ্ছে ভর ও আলোর বর্গের গুণফল।যা আমাদের বুঝতে শিখিয়েছে সমীকরণে ধ্রুবক থাকায় সামান্য ভরের পরিবর্তনের কারণে বিশাল পরিমাণ শক্তি নির্গত হতে পারে।

পৃথিবীর সবচাইতে সুপরিচিত সমীকরণটির কথা!

আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক দূরদৃষ্টি ও জ্ঞানের একটি অন্তর্নিহিত দিক ছিল। তিনিই সবার আগে উপলব্ধি করেন ম্যাটার বা পদার্থ এবং এনার্জি বা শক্তি আসলে একই বস্তুর দুটি রূপ। ম্যাটারকে শক্তিতে রূপান্তর করা যাবে। আর শক্তিকে রূপ দেয়া যাবে পদার্থে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। একটি সাধারণ হাইড্রোজেন অণুর কথা ভাবুন। মূলত একটি হাইড্রোজেন অণু তৈরি একটি প্রোটন দিয়ে। প্রোটন হচ্ছে অণু বা অ্যাটমের একটি সাবঅ্যাটমিক পার্টিকল। প্রোটন নামের এই সাবঅ্যাটমিক পার্টিকলের ভর বা mass ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০১৬৭২ কেজি। ওই ভর নিশ্চিতভাবেই ছোট্ট একটি ভর। কিন্তু আমরা প্রতিদিন যেসব ম্যাটার বা পদার্থ দেখছি, তাতে আছে প্রচুর পরিমাণ পরমাণু বা অ্যাটম। যেমনঃ এক কেজি বিশুদ্ধ পানিতে হাইড্রোজেন অণুর পরিমাণ ১১১ গ্রাম বা ০.১১১ কেজির চেয়ে সামান্য বেশি। আইনস্টাইনের এই বিখ্যাত সমীকরণটি আমাদেরকে জানিয়ে দেয়, এই ভরের পুরোটাই যদি হঠাৎ করে এনার্জিতে রূপান্তর করা হয়, তবে তা কতটুকু এনার্জির সমান হবে। এই সমীকরণ আমাদের বলে, এই এনার্জির পরিমাণ বের করতে হলে আলোর গতির বর্গকে এর ভর দিয়ে গুণ করতে হবে।

E = এনার্জি বা শক্তি
m = ভর বা মাস = ০.১১১ কেজি, ওপরে দেয়া উদাহরণ অনুসারে
c = আলোর গতি = প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ ০০০ ০০০ মিটার তাহলে আমরা পাচ্ছি,E = mc2
= ০.১১১ X ৩০০০০০০০০ X ৩০০০০০০০০ জুল
= ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ জুল (!)

এই এনার্জির পরিমাণ অবিশ্বাস্য ধরনের বড়। অবশ্য এক জুল খুব একটা বড় মাপের শক্তির একক নয়। মোটামুটিভাবে বলতে পারি একটি মাঝারি আকারের পাঠ্যবই হাত থেকে মেঝেতে ফেলে দিলে যে পরিমাণ এনার্জি বা শক্তির সৃষ্টি হয় তা ১ জুল শক্তির সমান। কিন্তু ৩০ গ্রাম হাইড্রোজেন অণুর মধ্যে যে পরিমাণ এনার্জি আছে তা পাওয়া যাবে না হাজার হাজার গ্যালন জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানো হলে।একটু আগেই আমরা ১ কেজি পানিতে থাকা ১১১ গ্রাম হাইড্রোজেন অণুর এনার্জির পরিমাণ বের করলাম। দেখেছি সে এনার্জির পরিমাণ ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ জুল। এবার আমরা পুরো এক কেজি পানির কথা বিবেচনা করি। এ পানিতে কিন্তু অক্সিজেনও আছে। এই ১ কেজি পানিতে থাকা অণুর এনার্জির পরিমাণ ১ কোটি গ্যালন গ্যাসোলিনের এনার্জির প্রায় সমান। এই সবটুকু এনার্জি কি বের করে আনা সম্ভব হবে? কখনো কি সম্ভব হয়েছিল? এই ১ কেজি পানির পুরোটাকেই এনার্জিতে রূপান্তর সম্ভব যদি পুরো পানিকে অ্যানিহিলেট বা ধ্বংস করে দেয়া যায়। এ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন ম্যাটার বা বস্তুর পুরোপুরি ধ্বংস সাধন। আর তা শুধু তখনই সম্ভব, যখন ম্যাটারের সাথে সমপরিমাণ অ্যান্টিম্যাটারের সাক্ষাৎ ঘটে। অ্যান্টিম্যাটার সেই বস্তু দিয়ে গঠিত যার চার্জ ও স্পিন ম্যাটারের বিপরীত। অ্যান্টিম্যাটারের অস্তিত্ব আছে। তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্ষয় বা রেডিওয়্যাকটিভ ডিকেতে এটি পর্যবেক্ষণযোগ্য। গবেষণাগারে অ্যান্টিম্যাটার তৈরিও করা হয়েছে। কিন্তু এটি ক্ষণস্থায়ী। তাই বস্তুর সংস্পর্শে আপনা-আপনি ধ্বংস হয়ে যায় এবং এর এই আপনা-আপনি ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঠেকানোর মতো বস্তু যথাশিগগির তৈরি সম্ভব হয় না। ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তা এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আমাদের এক কেজি ‘ওয়াটার’কে পুরোপুরি এনার্জিতে রূপান্তর করা যাবে না এর সাথে ‘অ্যান্টিওয়াটার’ মিশিয়ে। ভবিষ্যতে সম্ভব হবে কি না জানি না। তবে অন্তত এখন সম্ভব নয়। অ্যান্টিম্যাটার ও ম্যাটারের মিলন কতটা শক্তিশালী? মাত্র ১ মুঠো বালির সাথে আর ১ মুঠো অ্যান্টি-বালির মিলন ঘটালে যে শক্তি উৎপন্ন হবে তা দিয়ে পুরো লস অ্যাঞ্জেলস শহরের কয়েকশ বছরের শক্তি চাহিদা মিটে যাবে ! তবে পানির মত অ্যান্টিম্যাটার কিন্তু এত সস্তা না । 

মাত্র ১ গ্রাম অ্যান্টিম্যাটারের মুল্য ৬২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার !! বিল গেটসও এই অংকের কাছে নিতান্ত শিশু ।

পৃথিবীর সবচাইতে সুপরিচিত সমীকরণটির কথা!

প্রোটনের মতো ক্ষুদ্র এলিমেন্টারি পার্টিকলের আরেকটি প্রপঞ্চ বা ফেনোমেনন হচ্ছে এরা একীভূত হয়। একটি একক প্রোটন গঠন করে একটি হাইড্রোজেন অণুর নিউক্লিয়াস। একটি হিলিয়াম অণুতে পাওয়া যায় দুটি প্রোটন। এভাবেই পদার্থগুলোর সৃষ্টি হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া সবচেয়ে ভারী পদার্থ ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসে আছে ৯২টি প্রোটন। দুটি ফ্রি প্রোটন তৈরি সম্ভব যেগুলো এক সাথে মিলে হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস গঠন করতে শুরু করবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রোটন দুটিকে দ্রুতগতিতে পরসপরের দিকে সজোরে নিক্ষেপ করা। এই প্রক্রিয়াটি ঘটে সূর্যে। ঠিক একই প্রক্রিয়াটি ঘটানো সম্ভব পৃথিবীতেও লেজার ও চুম্বক ব্যবহার করে ঘটানো যাবে একটি পারমাণবিক বোমার কেন্দ্র্রেও। এ প্রক্রিয়ার নাম নিউক্লিয়ার ফিউশন। এর মজার দিক হলো, যখন প্রোটনকে একীভূত হতে বাধ্য করা হয়, তখন তাদের পুরো ভর বা শক্তি ব্যয় করতে হয় না, যে শক্তি বা এনার্জি আমরা E=mc^2 ফর্মুলা ব্যবহার করে বের করি। একীভূত হওয়া প্রোটন দুটির ভর আলাদা দুটি প্রোটনের ভরের সমষ্টির চেয়ে কম। প্রোটন দুটি যখন এক সাথে হয়ে যায়, তখন অতিরিক্ত ভর পরিণত হয় এনার্জিতে। সাধারণত এর পরিমাণ মোট ভরের ৭ শতাংশ। অর্থাৎ ওপরের সূত্রানুযায়ী যে পরিমাণ এনার্জি পাওয়ার কথা এর ৭ শতাংশ এনার্জি হিসেবে বের হয়। বাকিটা ভর হিসেবে একীভূত হয়। লোহার চেয়ে ভারী পদার্থ অস্থিতিশীল। এগুলোর কিছু কিছু খুবই অস্থিতিশীল। এর অর্থ হচ্ছে, এগুলোর নিউক্লিয়াস গঠিত ধনাত্মক চার্জসংবলিত অনেক প্রোটনের সমন্বয়ে। এগুলো যেকোনো সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের অণুকে আমরা বলি তেজস্ক্রিয় বা রেডিওয়্যাকটিভ। যেমন ইউরেনিয়াম একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা রেডিওয়্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স। প্রতি সেকেন্ডে ইউরেনিয়ামের প্রচুর অণু পরসপর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। যখন তেমনটি ঘটে, তখন টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া ইউরেনিয়াম মূল ইউরেনিয়াম অণু থেকে কম তেজস্ক্রিয়। আবার ওপরের সূত্রানুযায়ী অতিরিক্ত ভর অদৃশ্য হয়ে যায় এনার্জি হিসেবে। এই প্রক্রিয়ার নাম নিউক্লিয়ার ফিউশন।

এই উভয় ধরনের পারমাণবিক বিক্রিয়াই সামান্য পরিমাণ ভরকে বের করে দেয় এনার্জি হিসেবে। আর বেশির ভাগ এনার্জি যেখানে খরচ হয়, তা সম্ভবত আপনিও জানেন। পারমাণবিক অস্ত্রে কাজে লাগানো হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া। আর পারমাণবিক বোমায় ব্যবহার হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে নিক্ষিপ্ত বোমায় এটা ব্যবহার হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও চলে এই একই প্রক্রিয়া।আইনস্টাইন বুঝতে সক্ষম ছিলেন তার এই বিখ্যাত সমীকরণের প্রয়োগ কত দূর যেতে পারে। স্বভাবগতভাবে ও রাজনৈতিকভাবে আইনস্টাইনকে আমরা জানি একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে। তবু বলা দরকার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে আণবিক বোমার ওপর গবেষণা করার জন্য অর্থ চেয়ে চিঠি লিখতে তিনি সহায়তা করেছিলেন। আর সেই সূত্রেই নাৎসি জার্মানি ও জাপানিদের আগেই মার্কিনিদের হাতে আসে পারমাণবিক বোমা। সেই চিঠিই জন্ম দেয় মানহাটান প্রজেক্ট। 

আর আণবিক বোমা তৈরির মধ্য দিয়েই E = mc2 সমীকরণটির বাস্তব প্রমাণ পেল বিশ্ববাসী। যেখানে ফিলিপ এইচ আবেলসন, হান্স বেটে, নিল্‌স বোর, জেমস চ্যাডউইক, এনরিকো ফের্মি, রিচার্ড ফাইনম্যান, অটো ফ্রিশ্‌চ, জর্জ কিস্তিয়াকোভ্‌স্কি, আর্নেস্ট লরেন্স, ফিলিপ মরিসন, সেথ নেডারমেয়ার, জন ফন নিউমান, রুডলফ্ পিয়ার্লস, ইসিদোর ইজাক রাবি, লিও জিলার্দ, এডওয়ার্ড টেলার, স্তানিসল' উলাম, হ্যারল্ড উরে, ভিক্টর ওয়েইজকফ,পল ডিরাকের মত বাঘা বাঘা পদার্থ ও গনিতবিদেরা কাজ করেছেন ! ১৯৪৫ সালের মূল্যমানে এই প্রকল্পের জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এতে মোট ১৭৫,০০০ লোক কাজ করেছিল। প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ গোপনে সম্পাদিত হয় এবং সেখানকার খুব কম লোকই তার প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতো। প্রকল্পের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কিছু লোকই পারমাণবিক বোমা তথা তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র নির্মাণের বিষয়টি অবগত ছিল। ম্যানহাটন প্রকল্প পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটায় যাকে বলা হয় "পারমাণবিক যুগ"। পারমাণবিক বোমা কতটা ভয়ানক এবং বিধ্বংসী হতে পারে, আর এর প্রতিক্রিয়াই বা কি হতে পারে, প্রকল্পের মাধ্যমে তা পরিষ্কার হয়েছে। পারমাণবিক বোমা তৈরির পর একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার উদ্ভব ঘটেছে। এর ফলে বর্তমানে এতো পরিমাণ পারমাণবিক বোমা উৎপাদিত হয়েছে যার মাধ্যমে মানব সভ্যতা এবং পৃথিবীর অধিকাংশ জীবকূল মুহুর্তেই ধ্বংস করে দেয়া সম্ভব।

তাই কে জানে হয়ত এই বিখ্যাত সমীকরণই পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিবে পুরোপুরি । বিলিয়ন আলোকবর্ষ দুরের কোন এলিয়েন যখন টেলিস্কোপ দিয়ে দেখবে পৃথিবীকে তখন হয়ত প্রানহীন এক মরুভুমি সদৃশ গ্রহকে দেখবে ! অবচিন্ত মনে বলবে , এই গ্রহটি উষ্মর, প্রান থাকা অসম্ভব । স্টিফেন হকিং কিন্তু এমনটাই মনে করে । কোন আধুনিক সভ্যতার এলিয়েন হয়ত আমাদের কথা জানে । কিন্তু আমরা এই E=mc2 সমীকরণটির শুধু আপ্লিকেশন না বরং খারাপ ব্যাবহার জানি বিধায় তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করছে না ! আইনস্টাইন গত শতকের সবচাইতে বিখ্যাত ও জ্ঞানী মানুষ । তাই একজন সাধারন মানুষ হিসেবে তার এই সমীকরণের অন্তর্নিহিত ভাবের ঋণাত্মক আলোচনা স্পর্ধায় বটে !

[সমীকরণ প্রতিপাদনযুক্ত ব্যাখ্যা মোটামুটি আমরা সবাই জানি/সব বইয়ে পাওয়া যায় বিধায় আমরা এই বিখ্যাত সমীকরণ প্রতিপাদন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করলাম না]

তথ্যঃ 


লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পেইজ

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: