Header Ads

পৃথিবী কি আসলেই ধ্বংস হচ্ছে?

পৃথিবী কি আসলেই ধ্বংস হচ্ছে?

২৩ সেপ্টেম্বরের পৃথিবী ধ্বংসের বার্থ অনুমানের পর খ্রিস্টান পাদ্রী ও সংখ্যাতত্ত্ববিদ ডেভিড মিয়েডে এবার পৃথিবী ধ্বংসের নতুন দিন অনুমান করেছেন । সংখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাওয়া তার নতুন সম্ভাব্য পৃথিবী ধ্বংসের দিন হল আজকে । কি ?চোখ আঁতকে উঠল তো?? তার মতে সৌরজগতের লুক্কায়িত রহস্য গ্রহ নিবিড়ু বা প্ল্যানেট-এক্স এর আঘাতে আজকেই পৃথিবী ধ্বংস হবে । তিনি দাবি করেন নিবিড়ুর আঘাতে পৃথিবী সম্পন্ন ধ্বংস হবে না । তবে আমরা যেই পৃথিবী দেখে অভ্যস্ত এমনটা আর থাকবে না ! তিনি তারা অনুমানকে স্রেফ অনুমান বলতে নারাজ । নিবিড়ুর শক্তিশালী মহাকর্ষে ইন্দোনেশিয়ায় প্রলয়নকারী ভুমিকম্প শুরু হবে । ইউরোপের ফ্রান্স ও ইতালিতে এবং মেক্সিকোতেও প্রচন্ড ভুমিকম্পে ভূভাগের অঞ্চল উপরে উঠে আসবে । এমনকি অনেক তার ঘোষণার পরে আকাশে রহস্যজনক আলোকচ্ছটা ও গ্রহসদৃশ কখনো কালো কখনো উজ্জ্বল দানবীয় বস্তু দেখেছেন বলে ইংল্যান্ডের প্রথম সারির পত্রিকা গুলো খবর প্রচার করেছে । (নিচে লিঙ্ক সংযোজন করা আছে)

স্বাভাবিকভাবেই তার এই অনুমান নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে অট্টহাসির তোলপাড় শুরু হয়ে গিয়েছে । আমরা জানি ভূ-অভ্যন্তরে শিলায় পীড়নের জন্য যে শক্তির সঞ্চয় ঘটে, সেই শক্তির হঠাৎ মুক্তি ঘটলে ভূ-পৃষ্ঠ ক্ষণিকের জন্য কেঁপে ওঠে এবং ভূ-ত্বকের কিছু অংশ আন্দোলিত হয়। এই রূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে।কম্পন-তরঙ্গ থেকে যে শক্তির সৃষ্টি হয়, তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই তরঙ্গ ভূ-গর্ভের কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে উৎপন্ন হয় এবং উৎসস্থল থেকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মিয়েডের মতে সম্প্রতি মেক্সিকোতে ঘটে যাওয়া ৭.১ মাত্রার ভুমিকম্প এবং নেপলস ও ইন্দোনেশিয়াতে ঘটে যাওয়া ভুমিকম্প নিবিড়ুর ফলেই উৎপন্ন হয়েছিল। তিনি সবাইকে মাটির নিচে গোপন ঘর বা বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন । তিনি দাবি করেন নাসা ও ইসা এক্ষেত্রে নিবিড়ূর কথা গোপন রেখছে কারন আমেরিকা ও ইউরোপ তাদের নাগরিদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে বার্থ হবে । পক্ষান্তরে রাশিয়া ও চীনের পর্যাপ্ত বাঙ্কার থাকায় তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারবে । আর এই জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে বিধায় নিবিড়ুর উপস্থিতি তারা লুকিয়ে রেখেছেন । যদিও রাশিয়া ও চীনে এত মানুষকে একসাথে ঠাই দেওয়ার মত এমন গোপন বাঙ্কারের উপস্থিতির কোন সত্যটা নেই ।

পৃথিবী কি আসলেই ধ্বংস হচ্ছে?

নাসার বিজ্ঞানীরা বরাবরই নিবিড়ুর অস্তিত্বের কথা অস্বীকার করেন । তাদের বক্তব্য স্পষ্ট । নিবিড়ু যদি থেকে থাকত তাহলে তার প্রভাব অন্যান্য গ্রহগুলিতে পড়ত । আর যদিও বা পৃথিবীর খুব নিকটে আসত তাহল তার মহাকর্ষ প্রভাবে চাঁদ নিবিড়ুতে আছড়ে পড়ত । আবার অনেক জ্যোতির্বিদের মতে এই গ্রহটি রয়েছে আমাদের সৌরমণ্ডলের একদম শেষপ্রান্তে। গ্রহটির সম্ভাব্য ভর পৃথিবীর প্রায় ১০গুণ। এই নিবিড়ু বা এক্স গ্রহের অবস্থান সূর্য থেকে ২০০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট আর ১,২০০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট এর ভেতরে। যার অর্থ, গ্রহটির কক্ষপথ অতীব উপবৃত্তাকার। আর তা কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে যখন সূর্যের সবচেয়ে কাছে আসে (পেরিজি) তখন তার দূরত্ব দাঁড়ায় ২০০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট, আর যখন সবচেয়ে দূরে যায় (এ্যাপোজি) এখন হয় ১,২০০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট। দু’জনের গবেষক দাবি, গ্রহটি পৃথিবীর ১৫,০০০বছর সময়ে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পারে। ৪৫০কোটি বছর আগে যখন সৌরমণ্ডলের সৃষ্টি হয়েছিল তখন অন্যান্য গ্রহদের মত এক্স গ্রহটি হয়ত জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু মহাকর্ষীয় বিক্ষেপ তাকে ক্রমশ আমাদের সৌরমণ্ডলের দূরতম প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।

প্লুটো গ্রহের মর্যাদা হারানোর পরে থেকেই নবম গ্রহ কোনটি তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলতেই আছে। সুমেরিয়দের বর্ণনায় সৌরজগতের ৯ম গ্রহ হিসেবে নিবিরু’র নাম রয়েছে। তবে হারানো সেই জাতির দাবি ছিল, সূর্যকে ঘিরে গ্রহটি প্রদক্ষিণ করলেও এর কক্ষপথ এতোটাই বিশাল যে এর ঘুরে আসতে সময় লাগে পৃথিবীর হিসেবে ৩ হাজার ৪শ’ বছর। তবে সেই গ্রহটি যখন পৃথিবীর খুব কাছ থেকে ঘুরে যায় তখন আমাদের বাসভূমিতে দেখা যায় নানা ধরনের ভয়ঙ্কর সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ।ইরাকের দজলা-ফোরাত নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল সুমেরিয়ান সভ্যতা । জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রথম গ্রহ মডেল তাদের থেকে উদ্ভব হয় । এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এ বিষয় নিয়ে বিস্মিত । এত অনুন্নত সভ্যতায় মানুষ কীভাবে এই মডেল তৈরী করেছিল! সুমেরিয়দের মডেলে ১২ টি গ্রহের উল্লেখ ছিল । তার মধ্যে পৃথিবী, বৃহস্পতি, শনি তাদের সঠিক জায়গাতেই ছিল । বাকি গ্রহের জায়গায় চাঁদ একটা জায়গা দখল করেছিল । গেল শতকে ১২ টি গ্রহের ১১ টি(পূর্বে ধারনা করা হত বুধ ও সূর্যের মাঝে ভল্কান নামে একটি গ্রহ অবস্থিত,নেপচুন আবিস্কারের পূর্বে ইউরেনাসের কক্ষপথের বক্রতার জন্য দুইটি গ্রহকে দায়ী করা হত,আর প্লুটো) গ্রহই বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট করেছিল । কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ১২ তম গ্রহ নিয়ে । এর নাম বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন প্ল্যানেট এক্স, সুমেরিয়রা যাকে বলত নিবিড়ু । এই নিবিরু শব্দটির সাথে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের গভীর সম্পর্ক ।

সুমেরিয়দের বিশ্বাস ছিল যে পৃথিবী এবং গোটা বিশ্বজগত সৃষ্টি হয়েছে তিয়ামাত এবং মারদুক নামক দুইজন দেবতার দ্বন্দের ফলে । তাদের মধ্যে যুদ্ধে তিয়ামাত পরাজিত হয় । মারদুক তাকে টুকরো টুকরো করে গোটা মহাজগতে ছড়িয়ে দেয় । সেখান থেকেই সৃষ্টি হয় গোটা মহাবিশ্ব গ্রহ নক্ষত্র সবকিছুর । ঠিক ঐ মূহুর্তে সুমেরুদের দিক নির্দেশনা দিতে পৃথিবীতে আগমন ঘটে আরেকজন দেবতার তাঁর নাম ছিল আনুনাকি । বর্তমান অনেক ঐতিহসিক বিশ্বাস করেন এই আনুনাকির উপর বিশ্বাস তাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার আগ্রহ অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয় । সুমেরিয়ানদের শিলালিপিতে এর অনেক প্রমান মেলে । তাদের শিলালিপিতে ১২টি গ্রহের উল্ল্যেখ রয়েছে । যার ১২ নাম্বার গ্রহ হচ্ছে প্ল্যানেট এক্স । সুমেরিয়রা যাকে চিনত নিবিড়ু নামে । তাদের এই বিশ্বাস ছিল যে ৩৫০০ বছর পর পর নিবিরু সূর্যকে বিশাল কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে পৃথিবীর কক্ষপথে চলে আসে । আর এটি যতই পৃথিবীর কাছে আসছে ততই পৃথিবীর আবহাওয়া পরিবর্তিত হচ্ছে । একসময় পৃথিবী এবং নিবিরুর সংঘর্ষে পৃথিবীতে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে । প্রচণ্ড ঝড় হবে, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস, অগ্নুৎপাত হবে । এমনকি পৃথিবী প্রচণ্ড বেগে সূর্যের বুকে নিক্ষিপ্ত হতে পারে । সেদিনই হবে পৃথিবীর সভ্যতা ধ্বংসের শেষ দিন ।

জ্যোতির্বিদ্যার আধুনিক যুগ শুরু হয় ১৮০০ সালের পর থেকে । সত্তরের দশকে যখন সৌরজগতের মোটামুটি একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল বিজ্ঞানীদের হাতে আসে তখন থেকেই তাঁরা গ্রহসমূহের কক্ষপথ নিয়ে হিসাব কষতে শুরু করেন । কিন্তু কক্ষপথের হিসাবে কিছু অমিল ধরা পড়ে । তখন ইউরেনাসের কক্ষপথ পর্যালোচনা করে কয়েকজন বিজ্ঞানী সৌরজগতে আরো কিছু গ্রহের অস্তিত্বের কথা তুলে ধরেন । পরে গাণিতিক বিশ্লেষণে নেপচুনের অস্তিত্ব প্রমান হয়। তারপর প্ল্যানেট এক্স বা নিবিড়ুর উপস্থিতির প্রবল সম্ভাবনা দেখা দেয়। নিবিরুকে সবচেয়ে বেশি যাঁরা আলোচনার বস্তুতে পরিণত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে পার্সিভাল লয়েল অন্যতম, মঙ্গল গ্রহে ক্যানেল থিওরি নিয়ে গবেষণার জন্য যিনি বেশি বিখ্যাত। এছাড়া ১৯৭৬ সালে জেসারিয়া সিচিন তার বেস্ট সেলার বইতে সুমেরিয়দের ইতিহাসকে খুব যুক্তি এবং মুখরোচকভাবে উপস্থাপন করেন । পাঠক মহলে যা খুবই সারা ফেলে । কিন্তু তাঁদের সবচেষ্টা ব্যার্থ করে দিয়ে ঊনিশ শতকে এসে গ্রহসমূহের কক্ষপথের একটি পূর্ণাঙ্গ মাপরেখা তৈরি হয় । তাহলেও একটা প্রশ্ন থেকে গেল, এই নিবিরু আসলে কী ছিল ? ১৯৮৩ সালের দিকে নাসার দুইজন বিজ্ঞানী নিউজেবার এবং হক দাবী করেছিলেন তারা সৌরজগতের বাহিরের দিকে ক্যুইপার বেষ্টনীর পরে বৃহস্পতি সদৃশ একটি বস্তুর অস্তিত্ব দেখতে পেয়েছেন, এ নিয়ে তখনকার পত্র পত্রিকাতে অনেক লেখা লেখি হয় । কিন্তু পরে জানা যায় যে তাঁরা ইনফ্রারেড রে তে কিছু অসঙ্গতি দেখেছিলেন । আসলে তাঁরা যেটি দেখেছিলেন সেটি ছিল দূরের একটি গ্যালাক্সি । এ দিকে এ দুজন বিজ্ঞানীর মতের ভিত্তিতে অনেকে দাবী করেন এটিই আসলে সুমেরিয়দের বলা নিবিরু/প্ল্যানেট এক্স । কিন্তু astro-archeologist রা এর কোনো ভিত্তি /যুক্তি খুঁজে পাননি ।অনেক প্রতিষ্ঠিত জ্যোতির্বিদের মতে,গ্রহটি কক্ষপথের অপসূর বিন্দু অনুসরণ করে ধিরে ধিরে এগিয়ে আসছে। তাদের মতে, মায়ানদের বর্ণনার মতোই গ্রহটি পৃথিবীর চাইতে অন্তত ৪ গুণ বড়। তবে এখনও গ্রহটি ১৫ হাজার লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে রয়েছে। এবং সূর্যের আড়ালে থাকায় গ্রহটির স্পস্ট ছবি তোলা সম্ভর হয়ে ওঠেনি।

সুমেরিয় পুরানে মারদূক নামে যে দেবতার কথা উল্লেখ করা হয় তার প্রতিক ছিল বৃহস্পতি । আর নিবিরু শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে “ডিঙ্গি নৌকা” । যা বিভিন্ন স্থানে বৃহস্পতির অবস্থানকে নির্দেশ করে । সুমেরিয়দের মুখরোচক এই নিবিরুটা আসলে বৃহস্পতিই ছিলো । যুগ যুগ ধরে তাদের সেই ভয়ার্ত নিবিরু নামের আসলে কিছুই ছিল না ।নিবিরুর কথা শুধু সুমেরিয়ান না, অন্যান্য সভ্যতাগুলোও এ সম্পর্কে জানতো । মায়া সভ্যতার শিলালিপি হিসাব অনুযায়ী ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নিবিরুর পৃথিবীতে আঘাত হানার কথা ছিল । কিন্তু বস্তবিকই নিবিরু পৃথিবীতে আঘাত করে নি । কিন্তু কেন ? এটাই হচ্ছে নিবিড়ুর প্রধান রহস্য । তবে, আধুনিক যুগ কল্পবিজ্ঞানে বিশ্বাসী না। শুধুমাত্র মৌলবাদী ধর্মগুলির সংখ্যাতত্ত্বের উপর নির্ভরশীল না ! নিবিড়ু হয়ত থেকে থাকতে পারে । তবে তা আমাদের নাগালের মধ্যে না । যদি থেকে থাকত তাহলে এতদিন আমরা তার নাগাল পেয়ে যেতাম । বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে পর্যবেক্ষণ করতে পারলে , নিবিড়ুকে কেন নয় । তবে , কল্পবিজ্ঞানের এই মিথগুলো জনমনে যে ভীতির সঞ্চার করে তা মারাত্মক । নিবিড়ু ও কল্পিত সূর্যের জমজ ভাই নেমেসিস নিয়ে অদ্যাবধি অনেক গাজাখুরে গল্প প্রচলিত থাকলেও তার কোন সত্যতা নেই । তাই আপনি নিশ্চিত মনে আলু টাইপ মিডিয়ার কথায় কান না দিয়ে প্রিয়জনকে আলিঙ্গন করে নতুন দিন শুরু করতে পারেন।

তথ্যঃ 

লেখক পরিচিতি
লিখেছেনঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব পেইজ

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: