Header Ads

আরব বিজ্ঞানী আল-খোয়ারিজমি

আরব বিজ্ঞানী আল-খোয়ারিজমি

চাঁদের আমরা যে দিকটা দেখতে পাই, তার উল্টোদিকে ৬৫ কিলোমিটার চওড়া এক গহ্বর আছে, যার নাম আল-খোয়ারিজমি। কে এই আল-খোয়ারিজমি যাঁর নাম এই ভাবে স্মরণীয় করে রাখা হয়েছে ? সে কথা জানতে হলে আমাদের অতীতে ফিরে যেতে হবে।

আরব বিজ্ঞানী আল-খোয়ারিজমি
নাসার অ্যাপোলো ১১ মিশনের তোলা চাঁদের বুকে আল-খোয়ারিজমি গহ্বরের ছবি

আজ থেকে দু হাজার বছর আগে গ্রিক বিজ্ঞান তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছেছিল। সেই বিজ্ঞানের সর্বশ্ৰেষ্ঠ প্ৰকাশ ঘটেছিলো গণিতে | পিথাগোরাস, ইউক্লিড, আকিমিডিস– এঁদের মতো গণিতজ্ঞদের আমরা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। ভারতবর্ষে আর্যভট, বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্তের মতো বিজ্ঞানীদের অবদানও গণিতে চিরস্মরণীয়। কিন্তু খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতকের সময় থেকে সারা পৃথিবীতে বিজ্ঞানের চৰ্চা ক্রমশ কমে আসে। এই সময়কে তাই অনেক সময় আমরা অন্ধকার যুগ বলে চিনি। সেই মধ্য যুগে পৃথিবীতে আলোকবর্তিকা জ্বলিয়ে রেখেছিল। মধ্যপ্রাচ্য। আরব বিজ্ঞানীরা গ্রিক, ভারতীয় ও চিনের বিজ্ঞানকে আয়ত্ত করলেন, তাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। গ্রিক বিজ্ঞানের উত্তরাধিকার ইউরোপে প্রায় লুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। অন্ধকার যুগের শেষে ইউরোপ আরবি থেকে অনুবাদের মাধ্যমেই গ্রিক বিজ্ঞানকে ফিরে পায়। তাই ইউরোপের নবজাগরণে আরব বিজ্ঞানের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

অষ্টম শতাবিদার মাঝামাঝি বাগদাদে তৈরি হলো আবাসিদ খলিফাদের নতুন রাজধানী। খলিফারা জ্ঞান বিজ্ঞান প্রসারে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষণায় রসায়ন, গণিত, জ্যোতিবিদ্যার ও বলবিদ্যার অগ্রগতি ঘটে। উত্তর আফ্রিকার সঙ্গে সঙ্গে তখন সিসিলি, স্পেন ও পর্তুগালে খলিফার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে প্রাচীন ইউরোপের জ্ঞানভাণ্ডার আসত বাগদাদে খলিফারা সেই বইগুলিকে আরবি ভাষায় অনুবাদে উৎসাহ দিতেন। এভাবে বহু গ্রিক বই মূল রূপটি লুপ্ত হয়ে গেলেও আরবি ভাষায় রক্ষা পেয়েছে।

এমনি এক খলিফা ছিলেন আল মামুন। তাঁর ছিলো এক বিশাল গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি। দেশ বিদেশ থেকে জ্ঞান বিজ্ঞানের বই তিনি সংগ্রহ করতেন। এটির নাম ছিল জ্ঞানের ভবন। এর সঙ্গে যুক্ত পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ গণিতবিদ, মহম্মদ ইবন মুসা আল-খোয়ারিজমি।

খোয়ারিজমির জন্মের সঠিক তারিখ আমাদের জানা নেই, ৭৮০ সাল নাগাদ তাঁর জন্ম মনে করা হয়। পারস্য অর্থাৎ বর্তমান উজবেকিস্তানের খিভা প্রদেশের খোয়ারিজমি নামক জায়গায় সম্ভবত তাঁর জন্ম, যা থেকে তাঁর নামকরণ। খলিফার উৎসাহেই তিনি গ্রিক বিজ্ঞানী টলেমির উপর পড়াশোনা করেন। ভারতীয় বিজ্ঞান বিষয়েও তার উৎসাহ ছিলো। মনে হয় তিনি ভারতে এসেছিলেন । ভারতীয় গণিত বিষয়ে তাঁর বইতেয়ার আরবি রূপ না পাওয়া গেলেও ল্যাটিন অনুবাদটি রক্ষা পেয়েছে। এই বইয়ের মাধ্যমেই আরবে ও পরবর্তীকালে ইউরোপে সংখ্যা লেখার পদ্ধতিতে শূন্য অর্থাৎ “০” লেখা শুরু হয়। আমরা এখন যে একক দশক শতক হিসাবে সংখ্যা লিখি, তাও ভারতে প্রচলিত ছিলো। খোয়ারিজমির মাধ্যমেই তা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে খোয়ারিজমির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অবশ্যই বীজগণিতে। বীজগণিতে সমীকরণের সমাধান নির্ণয়ে তাঁর মৌলিক অবদান আছে। আমরা আজ যেভাবে কোনো অজানা রাশির ঘাতকে বর্গ, ঘন, বর্গমূল, এভাবে লিখি, তার সূচনা করেছিলেন খোয়ারিজমি। যদিও গ্রিক বিজ্ঞানী ডায়োফান্টোস আগে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু তা জনপ্রিয় হয়নি। খোয়ারিজমি স্বাধীনভাবে এই পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন।

খোয়ারিজমি বীজগণিতের সমীকরণ নিয়ে যে বইটি লেখেন, তার নাম “আল-জেবর ওয়াল আল-মুকাবেলা’। এই বইটি আমাদের আধুনিক বিজ্ঞানের একটি বহু প্রচলিত শব্দের জন্ম দিয়েছে। ইউরোপ যখন বইটি অনুবাদ হয়, তখন থেকে বীজগণিতকে অ্যালজেব্রা বলা শুরু হয়। বর্তমানে কম্পিউটারে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটি বহু ব্যবহৃত। এই শব্দটি মূলে বোঝােত বীজগণিতে সমীকরণের সমাধান সঠিক ভাবে না পেলেও, সঠিক উত্তরের কাছাকাছি কোনো মান বার করা। “আলজেবর ওয়াল আল-মুকাবেলা’-তে বহু ক্ষেত্রে এ ধরনের কাছাকাছি বা আসন্ন মান বার করার পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছিলো । ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদের সময় তাঁর নাম আল-খোয়ারিজমি থেকে হয় আলগোরিতামি । তার থেকেই ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির জন্ম । স্প্যানিশ ও পর্তুগীজ ভাষায় সংখ্যাকে বলে যথাক্রমে গুয়ারিসামো ও আলগারিসামো। দুটি শব্দেরই উৎস খোয়ারিজমির নামের ল্যাটিন রবীপ |

“আল-জেবর” কথার অর্থ কী ? খোয়ারিজমি বীজগণিতে ঋণাত্মক রাশিকে ধনাত্মক করার কথা বলেছিলেন। সমীকরণের একদিক থেকে অপরদিকে নিয়ে গিয়ে ঋণাত্মক রাশিকে ধনাত্মক করার পদ্ধতির নাম তিনি দেন 'আল-জেবর'। ধরা যাক একটি সমীকরণ আছে, x^2 - 5x + 4 = 0 , 'আল-জেবর' করলে পাবো x^2 + 4 = 5x । এই পদ্ধতি তাঁর মৌলিক আবিষ্কার। আবার সমীকরণের দুপাশে দুটি সমমানের ধনাত্মক রাশি বিয়োগ করার, যেমন x^2 + 2x = 2x + 4 কে x^2 = 4 

আরব বিজ্ঞানী আল-খোয়ারিজমি
আল-খোয়ারিজমি। মূর্তিটি আছে তেহরানের আমির কবীর বিশ্ববিদ্যালয়ে

লেখার, পদ্ধতির তিনি নাম দেন “আল-মুকাবেলা”। তিনি তাঁর বইতে ছ রকম বিশেষ সমীকরণের কথা বলেছিলেন । এভাবে কোনো বিশেষ সমস্যা নিয়ে শুরু না করে সাধারণ ভাবে বিভিন্ন শ্রেণির সমীকরণ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তিনি আধুনিক বীজগণিতের সূচনা করেন।

জ্যামিতিক পদ্ধতিতে তিনি সমাধান করতেন । এ বিষয়ে তিনি প্রাচীন ব্যাবিলন ও গ্রিক বিজ্ঞানের অনুসরণ করতেন।

খোয়ারিজমি ছিলেন বহু বিষয়ে পণ্ডিত। ত্রিভুজ, বৃত্ত ও গিয়ে তিনি পাই (Pi)-এর মান ধরেছিলেন 22/7 । তিনি কতকগুলি জ্যামিতিক উপপাদ্য প্রমাণও করেছিলেন। ভূগোলের ক্ষেত্রে তিনি টলেমির বিখ্যাত “জিওগ্রাফি” বইটির পরিমার্জনা করে নতুন করে লেখেন “কিতাব সুরাত আল-আর্দ’ | এই বইতে তিনি মধ্য প্রাচ্যের ভূগোল সম্পর্কে টলেমির বইয়ের বহু ভুল সংশোধন করেন।

জ্যোতিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরব বিজ্ঞানীদের মধ্যে সর্বপ্রথম মৌলিক গবেষণার স্বাক্ষর রাখেন খোয়ারিজমি।। ৮৩০ সাল নাগাদ তিনি রচনা করেন ‘জিজ আল-সিন্ধ’ | আকাশে সূর্য, চাঁদ ও তখনো পর্যন্ত জানা পাঁচটি গ্রহের গতিবিধির বর্ণণা তিনি সঠিকভাবে দেন। ভারতীয় ও টলেমির জ্যোতিবিজ্ঞান এই বইতে তিনি আলোচনা করেছিলেন। এছাড়া এই বইতে খোয়ারিজমি নতুন ধরনের গণনার পদ্ধতিও আলোচনা করেন। সূর্যঘড়ি দেখে সময় নির্ণয়ের জন্য তিনি সূচী তৈরি করেছিলেন, যার ফলে সময় দেখার কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। সূর্যের উন্নতি কোণ থেকে সময় বার করার জন্য একটি যন্ত্র তিনি বানিয়েছিলেন। এটি সারা বছর পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় ব্যবহার করা যেতো। ‘অ্যাস্ট্রোলোব’’ নামে একটি যন্ত্র মধ্যযুগে জ্যোতিবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হত। 'Quadrans Vetus' বা প্রাচীন বৃত্তপাদ নামের খোয়ারিজমি আবিষ্কৃত যন্ত্রটি মধ্য যুগে জ্যোতিবিজ্ঞানে ব্যবহারের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করবে।

অনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু ঘটে।

(প্ৰকাশ: উৎসব। ২০১০, পরিমাৰ্জিত)

লেখক পরিচিতি

Gautam Gangopadhyay

লিখেছেনঃ GAUTAM GANGOPADHYAY
Professor at Calcutta University

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে । সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: