Header Ads

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

There are more things in heaven and earth, Horatio,
Than are dreamt of in your philosophy.:
William Shakespeare in Hamlet

বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড নিয়ে আলোচনার সময় আমরা দুটো অপেক্ষাকৃত নতুন কথা আজকাল প্রায়ই শুনতে পাই, কৃষ্ণ পদার্থ (dark matter) ও কৃষ্ণ শক্তি (dark energy)। বিজ্ঞানীরা এখনো এদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না বললেই চলে। মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে গেলে কেন এই কৃষ্ণ বস্তু ও কৃষ্ণ শক্তির আমাদের দরকার, কেমন করে আমরা এদের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্ৰায় নিশ্চিত হলাম – তা নিয়ে আজি আমরা এই প্ৰবন্ধে আলোচনা করব। তবে তার আগে সাধারণ বস্তু বলতে আমরা কী বুঝি, তাদের গঠনই বা কী রকম তা জানা থাকলে তাদের সঙ্গে এই কৃষ্ণ পদাৰ্থ বা শক্তির প্রভেদ কোথায় তা বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে। তাই সাধারণ বস্তুর গঠন নিয়ে প্রথমেই একটু আলোচনা করে নেওয়া ভালো। সে জন্য আমাদের খুব সংক্ষেপে হলেও পদার্থবিজ্ঞানের অগ্ৰগতি সম্পর্কে জানতে হবে।

রকমের পদার্থ দেখতে পাই।। জল, বাতাস, পাথর বা জীবের দেহ, প্রত্যেকের গঠন একেবারে আলাদা। কিন্তু প্রাচীন কাল থেকেই এক অংশের মানুষের বিশ্বাস ছিলো এই নানা ধরনের পদার্থ, সবই কয়েকটা মাত্র মূল উপাদান দিয়ে তৈরি। গ্রিক দার্শনিক থালেসকে প্রথম আধুনিক বিজ্ঞানী বলে অনেকে মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত কিছুর মূলে আছে জল। প্রাচীন ভারতীয়রা মনে করতেন যে পঞ্চভূত, অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম, এই পাঁচটা মৌলিক পদার্থ দিয়েই সমস্ত বস্তুর সৃষ্টি।

পরমাণুবাদের জন্ম হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দিতে। প্রাচীন গ্রিসে ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন যে কোনো বস্তুকে যদি ভাগ করতে থাকি, তাহলে একসময় এমন এক কণা পাওয়া যাবে, যাকে আর টুকরো করা যাবে না। সেই অবিভাজ্য কণা হলো পরমাণু। প্রাচীন ভারতে বৈশেষিক দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা কণাদও একই কথা বলেছিলেন । ভারতবর্ষে কণাদের পরবর্তীকালে বৌদ্ধ দার্শনিকরাও পরমাণুবাদের সমর্থনে আলোচনা করেছিলেন।

পরমাণুবাদের মূল কথাই হলো বস্তু, তাই পরমাণুবাদ প্রথম থেকেই ছিলো বস্তুবাদের প্রতিভূ। বস্তুবাদের সবচেয়ে বড়ো বিরোধী হলো ভাববাদ। ভাববাদীর কাছে চিন্তার স্থানই সর্বোচ্চ– জগৎ তাঁর মতে মন বা চৈতন্যের সৃষ্টি। পরমাণুবাদকে তাই ভাববাদী দর্শনের তীব্র আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়। গ্রিসে অ্যারিস্টটল ও প্লেটো পরমাণুবাদের সমর্থনে লেখা সমস্ত বই পুড়িয়ে দেওয়ার বিধান দিয়েছিলেন। ভারতে শঙ্করাচার্য পরমাণুবাদের উপর আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। পরমাণুবাদকে সারা পৃথিবীতেই সাময়িকভাবে পিছু হটতে হয়।

মধ্যযুগে আরব বিজ্ঞানীরা পরমাণুবাদের ক্ষীণ ধারাকে বঁচিয়ে রাখেন এবং রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময় তা আবার ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করে।

আধুনিক পরমাণুবাদের জন্ম হয়েছিলো এক ব্রিটিশ রসায়নবিদ জন ডালটনের হাত ধরে। রাসায়নিক বিক্রিয়াতে বিভিন্ন পদার্থ সুনির্দিষ্ট অনুপাতে অংশ নেয়, সেই তথ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বললেন যে সমস্ত পদার্থই অতি ক্ষুদ্র অবিভাজ্য পরমাণু দিয়ে গঠিত। কোনো একটা মৌলের সমস্ত পরমাণুই একরকম, তাদের ভরও এক । রাসায়নিক বিক্রিয়াতে এই পরমাণুরাই অংশ নেয় ও নানান যৌগিক পদাৰ্থ তৈরি করে। রাশিয়ায় বিজ্ঞানী মেন্ডেলিয়েভ পরমাণুর ধারণা থেকেই মৌলিক পদার্থদের পর্যায়। সারণী (periodic table) তৈরি করেন । এই সারণীতে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থকে তাদের রাসায়নিক ধর্ম অনুসারে সাজানো হয়েছিলো। পৃথিবীতে মোটামুটি 92 রকমের মৌল পাওয়া যায়, তাদের পরমাণু নানা ভাবে যুক্ত হয়ে অন্যান্য সমস্ত পদার্থের অণুকে তৈরি করে। গবেষণাগারে তৈরি পরমাণুদের ধরলে মোট মৌলের সংখ্যা এখন 118।

উনবিংশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত আমাদের ধারণা ছিলো যে পরমাণু অবিভাজ্য।| 1896 সালে ইংল্যান্ডে জে জে টমসন দেখান যে পরমাণু ভেঙে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভরসম্পন্ন ঋণাত্মক আধানের (charge) এক কণা পাওয়া যায়। তার নাম দেওয়া হলো ইলেকট্রন। টমসন মনে করতেন পরমাণু হলো ধনাত্মক আধান সম্পন্ন এক গোলক যার মধ্যে ইলেকট্রনগুলো আটকানো আছে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার। সমস্ত পদার্থ অণু পরমাণু দিয়ে তৈরি, একথা ধরে নিলে পদার্থের রাসায়নিক ধর্ম ব্যাখ্যা করতে সুবিধা হয় বটে, কিন্তু অধিকাংশ বিজ্ঞানী বিংশ শতকের শুরুতে যে পরমাণুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন তা নয়। টমসনকেও তাঁদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। তবে ক্রমশ পরমাণুর সপক্ষে আরো অনেক সাক্ষ্য এবং যুক্তি পাওয়া গেলো।

বিংশ শতকের প্রথম তিন দশক পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যায়। সুইজারল্যান্ডের পেটেন্ট অফিসের এক ক্লার্ক 1905 সালে বিশ্বব্ৰহ্মান্ড সম্পর্কে আমাদের সমস্ত চিন্তাভাবনাকে পাল্টে দেন। তাঁর নাম আলবার্ট আইনস্টাইন, আর তাঁর সেই তত্ত্বের নাম বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ । তিনি দেখান যে স্থান আর কাল বা সময়কে আলাদা ভাবে আর বিচার করা যাবে না। এভাবেই আমরা চতুর্মাত্রিক বিশ্বের কথা জানতে পারি। দশ বছর পরে তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। আইজ্যাক নিউটনের পরে মাধ্যাকর্ষণের ক্ষেত্রে এ হলো প্ৰথম মৌলিক অগ্রগতি | এই তত্ত্ব থেকেই কৃষ্ণ গহ্বর (black hole) ও প্রসারণশীল বিশ্বের ধারণা বিজ্ঞানে প্রবেশ করে। একই সময় আইনস্টাইন পরমাণুর অস্তিত্বের পক্ষে এক প্রমাণ পেশ করেন। কী ছিলো এই প্ৰমাণ ? তরল বা গ্যাসের মধ্যে খুব ছোটো কোনো কণা থাকলে দেখা যায় সে ইতস্তত ছুটে বেড়ায়। প্রথম যে বিজ্ঞানী এই পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট করেছিলেন, সেই রবার্ট ব্রাউনের নামে এই গতির নাম ব্ৰাউনীয় গতি । আমরা সবাই দেখেছি। অন্ধকার ঘরে জানলা দিয়ে রোদ পড়লে ধুলোর কণা কেমন ছুটে বেড়ায় – এ হলো ব্ৰাউনীয় গতির এক উদাহরণ। আইনস্টাইন দেখান যে তরলের বা গ্যাসের অদৃশ্য অণু-পরমাণুরা ঐ ছোটো কণাকে চারদিক থেকে ধাক্কা মারছে, এটা ধরে নিলে ব্ৰাউনীয় গতির চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর পর আর অণু পরমাণুর অস্তিত্ব সম্পর্কে কারো কোনো সন্দেহ থাকিলো না। আলোকের কোয়ান্টম তত্ত্বও তিনি এই বছরই আবিষ্কার করেন। কোয়ান্টাম তত্ত্বের কথায় আমরা পরে আসবো।

ইতিমধ্যে নিউজিল্যান্ড থেকে এক বিজ্ঞানী, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে গবেষণা করতে এসেছেন | 1911 সালে তিনি দেখালেন যে পরমাণুর প্রায় পুরোটাই শূন্যস্থান। কেন্দ্ৰে আছে নিউক্লিয়াস যার ভর পরমাণুর প্রায় পুরো ভরের সমান। পরমাণু কত বড়ো? মোটামুটি বলা যায় যে পরমাণুর ব্যাস হলো এক সেন্টিমিটারের দশ কোটি ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ 10^-10 মিটার। নিউক্লিয়াসের ব্যাস হলো তারও দশ হাজার ভাগের এক ভাগ । করতে পারি, তাহলে নিউক্লিয়াসের আয়তন হবে তার কেন্দ্রে একটা মাছির মতো। গ্রহরা যেমন সূর্যের চারপাশে ঘোরে, রাদারফোর্ডের মডেলে ইলেকট্রনরা তেমনি নিউক্লিয়াসকে প্ৰদক্ষিণ করে। কী দিয়ে তৈরি নিউক্লিয়াস? নিউক্লিয়াসে আছে দু ধরনের কণা, প্রোটন ও নিউট্রন। প্রোটনদের আধান ধনাত্মক, নিউট্রনরা আধানহীন।

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

দেখা গেলো পরমাণুর ধর্ম ভারি অদ্ভূত। ডেনমার্কের বিজ্ঞানী নিলস বোর দেখান যে ইলেকট্রনরা নিউক্লিয়াসের চারপাশে যে কোনো কক্ষপথে থাকতে পারে না, কেবল কয়েকটা নির্দিষ্ট কক্ষপথেই তারা নিউক্লিয়াসকে প্ৰদক্ষিণ করতে সক্ষম | প্ৰথম চিত্রে নাইট্রোজেন পরমাণুর রাদারফোর্ড-বোর মডেল দেখানো হয়েছে। নানা পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গেলো জানা গেলো একই ইলেকট্রন একই সময়ে এক সঙ্গে দুই আলাদা পথে যেতে পারে। পরমাণুর এই সমস্ত অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজন হলো চিরাচরিত নিউটনীয় বলবিদ্যার বাইরে নতুন বিজ্ঞান। দুই জার্মান বিজ্ঞানী, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ও এরউইন শ্রয়ডিঙ্গার পৃথকভাবে গবেষণা করে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার (quantum mechanics) জন্ম দেন। জার্মানিতে উলফগ্যাঙ পাউলি ও ইংল্যান্ডে পল ডিরাক এই নতুন বিজ্ঞানকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান। হাইজেনবার্গ দেখান যে আমরা কোনো কণার অবস্থান সম্পর্কে যত নিশ্চিত হতে চাইব, তার ভরবেগ সম্পর্কে আমরা তত কম নিশ্চিত হতে পারব। এরই নাম হাইজেনবাগের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে যত ক্ষুদ্র কণা (বা কম দূরত্ব)। আমরা দেখতে চাইব, তত বেশি শক্তির প্রয়োজন হবে। তাই পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা দেখতে এখনো পর্যন্ত বৃহত্তম কণা ত্বরক (particle accelerator) লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার বা এল এইচ সি-র প্রয়োজন।

ততদিনে বোঝা গেছে যে আমাদের চতুর্দিকে যত রকমের বল দেখতে পাই, তারা চার ধরনের মূল বলের রকমফের মাত্র। দুই ভরের মধ্যে আকর্ষণের জন্য দায়ী বলের নাম মাধ্যাকর্ষণ। গ্ৰহ নক্ষত্র বা ছায়াপথ (galaxy)–এদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে এই বল। মাধ্যাকর্ষণ বল বাকিদের থেকে অনেক কম শক্তিশালী | সবল বল প্রোটন নিউট্রনের মধ্যে কাজ করে এবং নিউক্লিয়াস গঠনে মূল ভূমিকা নেয়। দুর্বল বল বিশেষ ধরনের তেজস্ক্রিয়ার জন্য দায়ী। আধানদের মধ্যে তড়িৎচৌম্বক বল ক্রিয়া করে। আমাদের চারদিকে যত রকমের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই, তার প্রায় সবগুলোই তড়িৎচৌম্বক বলের মাধ্যমে ঘটে।

প্রোটন নিউট্রনই কি শেষ কথা? নাকি তারাও আরো ছোটো কোনো মৌলিক কণা দিয়ে তৈরি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বড়ো বড়ো কণা ত্বরক তৈরি হলো | তাদের সবার উদ্দেশ্য ছিলো নিউক্লিয়াসের ভিতরে অনুসন্ধান। উচ্চ শক্তির এই সমস্ত যন্ত্রে তৈরি হলো আরো অনেক নতুন নতুন কণা। এরা সবাই কি মৌলিক? বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস হলো না। 1968 সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ডে অতি উচ্চ শক্তির ইলেকট্রন প্রোটন কণার অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হলো । দেখা গেলো প্রোটনের ভিতরে শক্ত তিনটে কণা আছে। মার্কিন বিজ্ঞানী মারে গোলমান আগেই বলেছিলেন যে প্রোটন নিউট্রনের অভ্যন্তরে উকি মারলে তিনটে নতুন কণা পাওয়া যাবে। গোলমান তাদের নাম দিয়েছিলেন কোয়ার্ক। প্রথমে তিনি তিন ধরনের কোয়ার্কের কথা বলেছিলেন। শীগগিরি কোয়ার্ক কণার সংখ্যা বেড়ে হলো ছয় । তাদের নামগুলো ভারি মজার – আপ, ডাউন, চাম, স্ট্রেঞ্জ, টপ ও বটম। প্রায় সমস্ত নতুন কণাদের ভিতরে আছে কোয়ার্ক— এদের পোশাকি নাম হলো হ্যাড্রন (hadron) । যেমন প্রোটন বা নিউট্রনের মধ্যে আছে তিনটে করে কোয়ার্ক। প্রোটন নিউট্রন ছাড়া বাকি সমস্ত হ্যাড্রনই খুবই ক্ষণস্থায়ী। হ্যাড্রনরা আগে যে চারটে বলের কথা বলেছি, তাদের সকলের দ্বারা প্রভাবিত হয়।

ইলেকট্রন কি একা? না, তারও এক পরিবার আছে যার নাম লেপ্টন পরিবার। এরও সদস্য সংখ্যা ছয় । এর মধ্যে তিনটে অপেক্ষাকৃত ভারি ঋণাত্মক আধানের কণা, ইলেকট্রন, মিউয়ন ও টাউয়ন। আর এদের প্রত্যেকের সঙ্গে আছে একটা করে খুব হালকা কণা, যাদের সাধারণ নাম নিউট্রিনো। সাধারণভাবে লেপ্টনরা সবল ছাড়া বাকি তিন রকম বল দ্বারা প্রভাবিত হয় – অবশ্য নিউট্রিনোরা তড়িৎ নিরপেক্ষ বলে তড়িৎচৌম্বক বল তাদের উপর সরাসরি কাজ করে না | প্ৰথম সারণীতে কোয়ার্ক ও লেপ্টনের তালিকা দেওয়া হলো । পাকিস্তানি বিজ্ঞানী আবদুস সালাম এবং দুই মার্কিন বিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ও শেলডন গ্ল্যাশে দুর্বল ও তড়িৎচৌম্বক – এই দুই বলকে একই কাঠামোর মধ্যে বেঁধে দেন। তাঁদের তত্ত্ব ঠিক হলে আরো দু ধরনের নতুন মৌলিক কণা পাওয়া যাওয়া উচিত, W ও Z বোসন কণা | 1984 সালের মধ্যে ইউরোপের সার্ন (CERN) গবেষণাগারে তাদের খুঁজে পাওয়া গেলো। এই W ও Z, এরা হলো দুর্বল বলের কোয়ান্টম । দ্বিতীয় সারণীতে চার রকম বলের কোয়ান্টমের অর্থাৎ বল কণার নাম দেওয়া আছে।

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

হিগস বোসনের কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কোয়ান্টম ক্ষেত্র তত্ত্ব (Quantum field theory) ক্ষুদ্রতম কণাদের ধর্ম ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে সবচেয়ে কার্যকরী তত্ত্ব হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু কোয়ান্টম ক্ষেত্র তত্ত্বকে ভরযুক্ত কণাদের বিষয়ে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা আছে, তার কাজ করার কথা একমাত্র ভরশূন্য কণাদের উপর। অথচ প্রথম সারণীতে যত বস্তু কণার নাম দেওয়া আছে, তাদের কেউই ভর শূন্য নয়। তাই বিজ্ঞানীরা অনুমান করলেন যে বস্তুকণারা আসলে ভরশূন্য, কিন্তু বিশ্বব্যাপী এক ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়ার মাধ্যমে তারা ভরা পায়। এই ক্ষেত্রই হলো হিগস ক্ষেত্র। হিগস বোসন, এল এইচ সিতে যার আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছে, তা হলো এই হিগস ক্ষেত্রের কোয়ান্টম বা কণা। আমরা সকলেই জানি যে পিটার হিগস ও ফ্রার্সেয়া, এঙ্গলার্ট বস্তুকণার ভর কোথা থেকে এলো তা ব্যাখ্যা করার জন্য 2013 সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

এখন দেখা যাক আমরা চারদিকে যে বিশ্বকে দেখতে পাই, তা শুরু হয়েছিলো কেমন করে। যখন থেকে মানুষ তার তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের বাইরে ভাবতে শিখেছে, তখন থেকে সে ব্ৰহ্মাণ্ড সৃষ্টির রহস্য সমাধান করতে চেয়েছে। তবে মাত্র কয়েক বছর হলো আমরা প্রমাণসহ বিজ্ঞানসম্মত কোনো উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা সবাই বোধহয় সৃষ্টির আদিতে মহা বিস্ফোরণ (Big Bang) –এর কথা শুনেছি। আজ থেকে 1380 কোটি বছর আগের সেই বিস্ফোরণে সৃষ্টির যাত্রা শুরু হয়েছিলো। সৃষ্টির আদিতে ছিলো এক বিন্দু যার ঘনত্ব ছিলো অসীম। কী হয়েছিলো সৃষ্টির আদি মুহুর্তের ঠিক পরীক্ষণে ? প্ৰথমে তাপমাত্রা এত বেশি ছিলো যে কোয়ার্করা প্রোটন বা নিউট্রনে আবদ্ধ ছিলো না। কিন্তু মহাবিশ্ব যত প্রসারিত হলো, তাপমাত্ৰা ততই কমতে লাগল। কেটে গেলো এক সেকেন্ডের এক লক্ষভাগের এক ভাগ সময় | তাপমাত্রা নেমে এলো 10^14 অর্থাৎ এক কোটি কোটি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নীচে। কোয়ার্করা এই তাপমাত্রায় প্রোটন নিউট্রন গঠন করতে পারলো, তারা আর ভেঙে পড়ছে না। মোটামুটি তিন মিনিট পরে তাপমাত্রা নেমে আসে একশো কোটি ডিগ্রি সেন্টিগ্ৰেডে । একটা করে প্রোটন ও নিউট্রন মিলে এখন তৈরি করলো প্ৰথমে ডয়টেরিয়াম বা ভারি হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস। প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই, অর্থাৎ কুড়ি মিনিটের মধ্যে সেই ডয়টেরিয়াম থেকে তৈরি হলো হিলিয়াম নিউক্লিয়াস। হিলিয়াম নিউক্লিয়াসে আছে দুটো প্রোটন ও দুটো নিউট্রন। হিলিয়ামের থেকে ভারি নিউক্লিয়াস আর এই সময় তৈরি হলো না । ডয়টেরিয়াম অবশিষ্ট থাকলো না বললেই চলে।

বিশ্বে তখনো পরমাণু তৈরি সম্ভব নয়, কারণ ঐ উচ্চ তাপমাত্রায় ইলেকট্রনরা নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে আবদ্ধ থাকবে না | প্ৰায় তিন লক্ষ বছর পরে উষ্ণতা এতটা কমল যে পরমাণু অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হলো। ব্ৰহ্মাণ্ডে সেই সময় ছিলো মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম পরমাণু। আরো বেশ কিছু কোটি বছর পরে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে হাইড্রোজেন গ্যাসের পরমাণুরা মিলে তারকার জন্ম দিলো। বিরাট হাইড্রোজেনের মেঘ মাধ্যাকর্ষণের টানে সংকুচিত হলো। যত তা ছোটো হয়, তত তার তাপমাত্রা বাড়ে। একসময় তার ভিতরে শুরু হলো তাপ পারমাণবিক নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়া। সৃষ্টি নিউক্লিয়াস। তারপর যখন তারকার মৃত্যু ঘটলো, সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেই ভারি নিউক্লিয়াসরা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়লো। হাইড্রোজেন ছাড়া পৃথিবীর, কিংবা আমার আপনার দেহের, প্রতিটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের জন্ম হয়েছিলো কোনো এক তারকার অভ্যন্তরে।

উপরের বর্ণনা থেকে আমরা ব্ৰহ্মাণ্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানলাম। তবু বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে যায় যাদের উত্তর এখনো আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরে। কোয়ার্ক ও লেপটনের সংখ্যা ছয় কেন? আমরা জানিনা। কোয়ার্ক লেপ্টনরাই কি শেষ কথা, না তাদের ভাঙলে আরো ক্ষুদ্র কণা পাওয়া যাবে? আইনস্টাইন চেয়েছিলেন সমস্ত রকম বলকে একসঙ্গে মেলাতে। তিনি সফল হননি। আমরা আজও চেষ্টা করে চলেছি চার রকম বলকে এক সূত্রে বাঁধতে। সাফল্য কি আসবে? এরকম বহু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে পদার্থবিদ্যা।

কিন্তু মৌলিক কণা সম্পর্কিত এই সমস্ত প্রশ্নের বাইরেও বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড সম্পর্কিত আমাদের তত্ত্বে আরো নানা সমস্যা থেকে গেছে। তাদের সমাধান করতে গিয়েই আমাদের কৃষ্ণ পদার্থ ও কৃষ্ণ শক্তির কথা কল্পনা করতে হয়েছে। কী ধরনের সমস্যা? প্রথমে কৃষ্ণ পদার্থের কথা আলোচনা করা যাক।

শুরু করা যাক আমাদের সৌরজগৎ থেকে। আমরা জানি যে সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধ 88 দিনে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে। সবচেয়ে দূরের গ্রহ আমরা এখন যাকে ধরি, সেই নেপচুন সময় নেয় 164.8 বছর। প্লুটো আরো একটু দূরে আছে, তার সময় লাগে 248 বছর। বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার সপ্তদশ শতকে গ্রহদের গতিবিধি সংক্রান্ত তিনটি সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। গ্রহদের সূর্যের চারদিকে আবর্তন বেগ (v) ও সূর্য থেকে তাদের দূরত্ব (d) – এদের মধ্যে সম্পর্ক কেপলারের সূত্র থেকে নিচের আকারে প্রকাশ করা যায়।

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

অর্থাৎ বেগের বর্গ সূর্য থেকে দূরত্বের ব্যস্তানুপাতী। অন্য ভাবে বললে, সূর্য থেকে কোনো গ্রহের দূরত্বকে যদি ঐ গ্রহের বেগের বর্গ দিয়ে গুণ করি, তাহলে যে সংখ্যাটা পাওয়া যাবে, তার মান সমস্ত সৌর গ্রহের জন্য সমান। শুধু গ্রহ নয়, সৌরজগতে যে বস্তুই সূর্যের আকর্ষণে বাঁধা পড়ে আছে, তা সে গ্রহ, গ্রহাণু বা ধূমকেতু যাই হোক না। কেন, তাদের সকলের ক্ষেত্রে ঐ গুণফলের মান সমান। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র থেকে এটা সহজেই প্রমাণ করা যায়। যদি গ্রহদের ঘুর্ণন বেগকে সূর্য থেকে দূরত্বের সঙ্গে দেখাই তাহলে পরের পাতায় প্রথম লেখচিত্রের মতো দেখাবে। এখানে বাঁদিক থেকে আটটি বিন্দু, যথাক্রমে বুধ থেকে নেপচুন, এই আটটি গ্রহকে এবং সবচেয়ে দূরের বিন্দুটি প্লুটোকে সূচিত করছে। বিন্দুদের সংযোগকারী রেখা স্থায়ী কক্ষপথ দেখাচ্ছে। সৌরজগতে কোনো বস্তুর ক্ষেত্রে সূর্য থেকে দূরত্ব ও গড় বেগকে এই লেখচিত্রে দেখালে যদি তার অবস্থান ছবিতে ঐ রেখাটার থেকে উপরের দিকে হয়, তাহলে সে সূর্যের আকর্ষণে আর বাঁধা থাকবে না |

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

আমরা যে ছায়াপথের বাসিন্দা তার নাম আকাশগঙ্গা | আকাশগঙ্গা একটা সপিৰ্ল (spiral) ছায়াপথ। দ্বিতীয় চিত্রে অন্য এক সর্পিল ছায়াপথ দেখানো হয়েছে। বাইরে গিয়ে ছবি তুলতে পারলে আকাশগঙ্গাকে অনেকটা এই রকমই দেখাবে। আকাশ গঙ্গার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব হলো মোটামুটি এক লক্ষ আলোকবর্ষ। সূর্য ছায়াপথের কেন্দ্রথেকে সাতাশ হাজার আলোকবর্ষ। দূরে অবস্থান করে। আকাশগঙ্গাতে নক্ষত্রের সংখ্যা দশ হাজার কোটি থেকে চল্লিশ হাজার কোটির মধ্যে।

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

দ্বিতীয় লেখচিত্রে (পরের পাতায়) আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথে কেন্দ্র থেকে দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রদের গড় বেগ দেখানো হয়েছে। ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরত্ব কিলো পারসেক এককে প্রকাশ করা হয়েছে। এক কিলো পারসেক অর্থাৎ এক হাজার পারসেক বা মোটামুটি 3260 আলোকবর্ষ। সৌরজগৎ ও ছায়াপথের গঠনের মধ্যে পার্থক্য আছে। সৌরজগতের মোট ভরের প্রায় 99.9% হলো সূর্যের ভর, ছায়াপথের ক্ষেত্রে ভরের সবটাই কেন্দ্রে থাকে না, ছড়িয়ে থাকে। তাই ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে যত বাইরের দিকে যাব, নক্ষত্রদের বেগ প্রথমে বাড়বে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের পরে তা কমতে শুরু করার কথা। তখন তা মোটামুটি কেপলারের সূত্র মেনে চলবে। নক্ষত্র, মহাজাগতিক মেঘ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে আমরা ছায়াপথের যে ভর অনুমান করি, তাতে করে হিসাব মতো নক্ষত্রদের বেগ লেখচিত্রে A রেখা বরাবর কমার কথা।

বাস্তবে দেখা যায় যে নক্ষত্রদের বেগ মোটামুটি B রেখা বরাবর পরিবর্তিত হয়। প্রায় এক লক্ষ আলোকবর্ষ, তার মানে ছায়াপথের বাইরের দিক পর্যন্ত, নক্ষত্রদের বেগ কমছে না বললেই চলে। প্রত্যাশিত বেগ ও প্রকৃত বেগের পার্থক্য তীর চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়েছে। কালো বিন্দু দিয়ে সূর্যের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। আমরা যে ভর দেখতে পাই, সেই অনুযায়ী সূর্যের অবস্থান (A রেখার উপর) ও প্রকৃত যে বেগ আমরা দেখি (B রেখার উপর), তাদের মধ্যে পার্থক্য প্রায় 65 কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। সূর্যের তো তাহলে ছায়াপথের মধ্যে বঁধা থাকারই কথা নয়। অথচ আমরা নিশ্চিত ভাবে জানি সূর্য সাড়ে চারশো কোটি বছর, অর্থাৎ তার জীবনের পুরোটা, এই ছায়াপথেই কাটিয়েছে। 

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

কেন এমন হলো – তার একটা উত্তর আছে। ছায়াপথের গতি, বিভিন্ন ছায়াপথদের মধ্যে আকর্ষণ, এরকম নানা তথ্য থেকে ছায়াপথীদের ভর বার করা সম্ভব। আবার ছায়াপথের বিভিন্ন ধরনের নক্ষত্রের ও অন্যান্য বস্তুর সংখ্যা দেখে তাদের ভর থেকে ছায়াপথের মোট ভর হিসাব করা যায়। আরো একটা ভারি সুন্দর পদ্ধতিতে ছায়াপথদের ভর বার করা যায়। কোনো ছায়াপথের পাশ দিয়ে আসার সময় তার মাধ্যাকর্ষণের জন্য আলো বেঁকে যায়। আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে প্রথম এই কথা বলেছিলেন | লেসের কাজ আলোকে বাঁকানো – ছায়াপথ এখানে লেন্সের মতো কাজ করছে। তৃতীয় চিত্রে দেখা যাচ্ছে দূরের কোনো ছায়াপথ থেকে আলো আসার সময় অন্য ছায়াপথদের আকর্ষণে বেঁকে গেলে কেমন দেখায়। বৃত্তচাপের মতো যে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে, তা হলো একটাই ছায়াপথ। সামনের উজ্জ্বল ছায়াপথের টানে আলো বেঁকে ঐরকম রেখার সৃষ্টি করেছে। আলো কতটা বেঁকেছে তা হিসাব করে যে ছায়াপথের টানে আলো পথ পরিবর্তন করলো তার ভর নির্ণয় করা যায়।

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

এই সমস্ত বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখা যাচ্ছে যে মাধ্যাকর্ষণ থেকে নির্ণয় করা ভর, তারকার সংখ্যা হিসাব করে পাওয়া ভরের থেকে অন্তত পাঁচগুণ বেশি। সংখ্যা গুণে যে ভর আমরা পাই, তার মধ্যে আবার উজ্জ্বল তারকাদের অবদান মাত্র দুই শতাংশ, বাকিটা আছে বিরাট মহাজাগতিক মেঘ, মৃত তারা বা খুব অনুজ্জ্বল তারকাদের মধ্যে। কিন্তু এ তো গেলো ভরের ছয় ভাগের এক ভাগ । অবশিষ্ট পাঁচ ভাগ সম্পর্কে কি কিছু জানা আছে?

সত্যি কথা বলতে প্রায় কিছুই জানা নেই। যেটুকু জানি তা সবই হলো না-বাচক, অর্থাৎ এই পদার্থ কী নয়। বিজ্ঞানে তার গুরুত্বও কম। নয়, কারণ তার থেকে আমাদের খোঁজার পরিধিকে আমরা কমিয়ে আনতে পারি। ধরা যাক বলের কথা । আগের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে অদেখা এই পদার্থ মাধ্যাকর্ষণে অংশ গ্রহণ করে। দুর্বল বলের নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে তা খুব দুর্বল – তাই তা এই নতুন পদার্থের উপর কাজ করে কিনা নিশ্চিত ভাবে বলা এখনো পর্যন্ত আমাদের সাধ্যের বাইরে। চোখে আমরা দেখতে পাচ্ছিনা, তার মানে আলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আমরা তাদের নাম দিয়েছি। অন্ধকার বা কৃষ্ণ পদার্থ। আলো হলো তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ, অর্থাৎ তড়িৎচৌম্বক বল কৃষ্ণ পদার্থের উপর ক্রিয়া করে না। তার মানে হলো যে এই পদার্থ তড়িৎ নিরপেক্ষ, এর কোনো তড়িৎ আধান নেই।

এমন কি হতে পারে যে কৃষ্ণ পদার্থ আসলে সাধারণ পদার্থের পরমাণু? হয়তো তা এমন জায়গায় আছে যে আমরা দেখতে পাচ্ছিনা – আমাদের ছায়াপথেই সেই পরমাণুরা আছে। না, তা নয়। কৃষ্ণ পদার্থ যে প্রোটন নিউট্রন দিয়ে তৈরি সাধারণ পদার্থ নয়, তার অন্য প্রমাণ আছে। সৃষ্টির সেই আদি মুহুর্তে প্রোটন বা নিউট্রনের ঘনত্ব আমরা জানি । হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম কতটা তৈরি হয়েছিলো, কতটা ভারি হাইড্রোজেন অবশিষ্ট আছে, সেটা আমরা মাপতে পেরেছি। তার থেকে আমরা সে সময় সাধারণ পদার্থের ঘনত্ব জানি। কৃষ্ণ পদার্থ যদি আসলে প্রোটন নিউট্রন দিয়ে সাধারণ পদার্থ হতো, তাহলে এই পরিমাণগুলো একেবারেই আলাদা হতো। তা যখন নয়, সবল বলও কৃষ্ণ পদার্থের উপর নিশ্চয় কাজ করে না।

সাধারণ অণু পরমাণু প্রোটন নিউট্রন বা ইলেকট্রন দিয়ে কৃষ্ণ পদার্থ তৈরি নয়। তাত্ত্বিকরা নানা রকমের কণার কথা বলছেন । তাদের মধ্যে এক ধরনের কণার সঙ্গে আমাদের এই লেখায় সাক্ষাৎ হয়েছে – তা হলো নিউট্রিনো। আগেই দেখেছি যে দুর্বল ও মাধ্যাকর্ষণ, এই দুই বল নিউট্রিনোর উপর কাজ করে। খুব সম্প্রতি বোঝা গেছে নিউট্রিনোর ভর আছে। তিন ধরনের নিউট্রিনোর ভর সম্পর্কে একটা ধারণাও পাওয়া গেছে। দুটো কারণে দেখা যাচ্ছে যে নিউট্রিনো কৃষ্ণ পদার্থের মূল অঙ্গ হতে পারে না। প্রথমত, তার ভর যথেষ্ট নয়। কিন্তু ভরের পরিমাণ জানার আগেও বোঝা গিয়েছিলো যে নিউট্রিনো দিয়ে ছায়াপথের ভর সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ নিউট্রিনোরা প্ৰায় আলোর বেগে চলে। মহা বিস্ফোরণের পরে ছড়িয়ে থাকা পদার্থ মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে এক এক জায়গায় জোট বঁধে । এভাবেই ছায়াপথদের গঠন হয়েছিলো। এখানে কৃষ্ণ পদার্থের একটা বিরাট ভূমিকা ছিলো, কারণ সাধারণ পদার্থের থেকে তার পরিমাণ বেশি বলে তার মাধ্যাকর্ষণও বেশি। প্রায় আলোর গতিতে দৌড়োতে থাকা কোনো কণা দিয়ে ছায়াপথের সৃষ্টি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

তাত্ত্বিকেরা আরো নানা ধরনের কণার কথা বলেছেন। তবে তাদের আলোচনা করতে গেলে এই প্ৰবন্ধ আরো জটিল হয়ে পড়বে। বিশ্বে তাদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলছে। অন্য অনেক মতামতও এসেছে যাদের কিছু কিছু আমাদের জানা মাধ্যাকর্ষণের নিয়মকে পাল্টাতে চেয়েছে।

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

কৃষ্ণ পদার্থের কথা শেষ হওয়ার আগে আমরা দেখবো যে দ্বিতীয় লেখচিত্রে নক্ষত্রদের যে বেগ দেখা যাচ্ছে তার ব্যাখ্যা কী? বস্তৃষ্ণ পদার্থ সমেত ছায়াপথের সম্ভাব্য গঠন চতুর্থ চিত্রে দেখানো হয়েছে। আমরা যে উজ্জ্বল ছায়াপথ দেখতে পাই, তা আসলে ছায়াপথের এক অত্যন্ত ছোট অংশ – কৃষ্ণ পদার্থের এক বিশাল বিস্তারের ভিতর দিকে তার অবস্থান। অঙ্ক কষে দেখা যায় যে ছায়াপথের এই গঠন ধরে নিলে সহজেই নক্ষত্রদের বেগ ব্যাখ্যা করা যায়।

কৃষ্ণ পদার্থের কথা শেষ হলেও আমাদের গল্প কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। সৃষ্টির আদি মুহুর্ত থেকে ব্ৰহ্মাণ্ড প্রসারিত হয়ে চলেছে। ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে? দু ধরনের ভবিষ্যতের কথা আমরা চিন্তা করতে পারতাম। ধরা যাক আমরা একটা পাথর নিয়ে উপর দিকে ছুড়ে দিয়েছি। পাথরটা যত উপরে যাবে তত তার বেগ কমবে। একসময় সে থেমে যাবে, তারপর আবার মাটিতে ফিরে আসবে। এর জন্য মাধ্যাকর্ষণ বল দায়ী। যদি একটা নির্দিষ্ট বেগ, যাকে আমরা বলি মুক্তি বেগ, অন্তত সেই বেগে ছুড়তে পারি, তাহলে পাথরের বেগ কমবে কিন্তু তা আর ফিরে আসবে না। ব্ৰহ্মাণ্ডেরও এই দুই ধরনের পরিণতির কথা চিন্তা করা যায়। এখানেও মাধ্যাকর্ষণ বলাই কাজ করে। তাই আমরা ভাবতাম যে বিশ্ব যত প্রসারিত হচ্ছে, তার প্রসারণ বেগ নিশ্চয় তত কমছে। যদি গোড়ায় মহা বিস্ফোরণের সময় যথেষ্ট বেগ নিয়ে শুরু না করে থাকে, তাহলে বিশ্ব আবার একসময় সংকুচিত হতে শুরু করবে এবং অবশেষে আবার এক বিন্দুতে মিলিত হবে। কিন্তু যদি অন্তত মুক্তি বেগ নিয়ে যাত্রা করে থাকে, তাহলে তার প্রসারণ আবহমান কাল ধরে চলতেই থাকবে । অবশ্য প্রসারণের বেগ ক্রমশ কমবে | ছায়াপথরা একে অপরের থেকে কী বেগে দূরে সরে যাচ্ছে, তা মেপে আমাদের বিশ্বের বর্তমান সময়ে প্রসারণ বেগ বার করা সম্ভব। কিন্তু সুদূর অতীতে, অর্থাৎ কয়েকশো কোটি বছর আগে প্রসারণের বেগ কি মাপতে পারব ? পারব, কারণ আমাদের কয়েকটা টাইম মেশিন আছে। তবে সেই টাইম মেশিনে করে অতীত বা ভবিষ্যতে যাওয়া যায়না, শুধু অতীতকে দেখা যায়। তাদের আমরা সহজ কথায় দূরবিন বলি। আলো এক বছরে যতটা রাস্তা যেতে পারে, তাকে বলে এক আলোকবর্ষ। আমাদের থেকে পাঁচশো কোটি আলোকবর্ষ দূরে যে মহাজাগতিক বস্তু আছে, তার যে আলো আজি আমার দূরবিনে এসে পৌঁছালো, সে যাত্রা শুরু করেছিলো পঁচিশো কোটি বছর আগে। অর্থাৎ আমরা পাঁচশো কোটি বছর আগের অবস্থায় ঐ বস্তুকে আজ দেখতে পাচ্ছি। কাজেই ঐ সমস্ত দূরের নক্ষত্রদের গতিবিধি থেকে কয়েকশো কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের প্রসারণ বেগ আমরা মাপতে পারি।

1998 সালে দুই দল বিজ্ঞানী সেই কাজটাই করছিলেন। তাঁরা দেখছিলেন প্রসারণ বেগ কতটা কমছে – তার থেকে ব্ৰহ্মাণ্ডের ঘনত্ব (অন্যভাবে বললে সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী স্থান কালের বক্রতা) নির্ণয় করা সম্ভব। তাঁদের ব্যবহৃত পদ্ধতিও বেশ চিত্তাকর্ষক, কিন্তু সে আলোচনায় আমরা যাব না | এই কাজ করতে গিয়ে দেখা গেলো যে মহাবিশ্বের প্রসারণ বেগ এখন আর কমছে না। প্রথম কয়েকশো কোটি বছর ধরে কমলেও ছশো কোটি বছর আগে থেকে বেগ আবার বাড়তে শুরু করেছে। পাথরটাকে যখন উপর দিকে ছড়লাম, তখন যদি তার বেগ না কমে বাড়তে থাকে, তখন আমরা কী ভাববো? আমরা ভাববো যে নিশ্চয় কোনো বিকর্ষণ বল এখানে কাজ কছে। মহাজগতের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিকর্ষণ, যা মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে ক্রিয়া করছে। কেন সে সম্পর্কে আমাদের বিশেষ কিছুই জানা নেই। অজানা সেই কারণের নাম আমরা দিয়েছি। অন্ধকার বা কৃষ্ণ শক্তি। প্লাঙ্ক কৃত্রিম উপগ্রহের থেকে পাওয়া তথ্য থেকে 2013 সালের হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বের 68.3% শক্তি এই অন্ধকার শক্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে। অবশিষ্ট অংশের মধ্যে মধ্যে 4.9% হলো কোয়ার্ক লেপ্টন বা অণু পরমাণু গঠিত সাধারণ বস্তু। বাকি 26.8% হলো কৃষ্ণ পদার্থ। ব্ৰহ্মাণ্ডের প্রসারণ বেগ যে বাড়ছে তা আবিষ্কারের জন্য 2011 সালে সল পেলািমটার, ব্রায়ান স্মিড ও অ্যাডাম রিসকে পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়।

সৃষ্টির আদিতে কিন্তু যে হারে ব্ৰহ্মাণ্ড প্রসারিত হচ্ছিল, তা পরে ক্রমশ কমে আসে। কিন্তু আবার তা পরে বাড়তে থাকে। এ এক অদ্ভূত ঘটনা। ব্ৰহ্মাণ্ড যখন আয়তনে ছোট ছিলো, তখন বস্তুর ঘনত্ব ছিলো বেশি। তাই মাধ্যাকর্ষণই ছিলো প্রধান বল, যার জন্য প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। বিশ্ব যত প্রসারিত হলো, বস্তুর ঘনত্ব গেলো তত কমে । ছশো কোটি বছর আগে থেকে অন্ধকার শক্তির প্রভাবে প্রসারণের হার আবার বাড়তে থাকে | তার মানে প্রসারণের ফলে বস্তুর ঘনত্ব যে হারে কমছে, কৃষ্ণ শক্তির ঘনত্ব সেই হারে কমছে না।

বহুদিন থেকে, হয়তো মানব সভ্যতার সূচনা থেকে, মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে আমাদের কৌতুহল ছিলো। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে পদার্থবিদ্যা আমাদের তার উত্তর দিয়েছে। ছায়াপথরা একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যত সময় যাবে, তত তাদের পরষ্পরের থেকে দূরে যাওয়ার বেগ বাড়বে। ছায়াপথের সমস্ত তারা একে একে নিভে যাবে। নতুন নক্ষত্র সৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে। অবশেষে চিরকালীন অন্ধকারে ডুবে যাবে মহাবিশ্ব।

কৃষ্ণ শক্তি আসলে কী? তার সম্পর্কে আমরা কৃষ্ণ পদার্থের থেকেও কম জানি। কোনো কোনো বিজ্ঞানী একটা কথা বলেছেন। আইনস্টাইন যখন আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে বিশ্বের জন্য তাঁর সমীকরণ লিখেছিলেন, তখন দেখেছিলেন যে তার থেকে স্থিতিশীল বিশ্ব পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ তখনো পর্যন্ত আমরা জানতাম যে মহাবিশ্ব স্থিতিশীল। তাই তিনি জোর করে সমীকরণের মধ্যে এক নতুন পদ ঢুকিয়ে ছিলেন। তার নাম তিনি দিয়েছিলেন মহাজাগতিক ধ্রুবক। কিন্তু পরে যখন আবিষ্কার হয় যে বিশ্ব স্থিতিশীল নয়, প্রসারিত হচ্ছে, তখন তিনি ঐ অংশকে প্রত্যাহার করে নেন। আইনস্টাইন বলেছিলেন যে মহাজাগতিক ধ্রুবক তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল। বিজ্ঞানীরা এখন সেই “ভুল” দিয়ে অন্ধকার শক্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কোয়ান্টম ক্ষেত্র তত্ত্ব অনুযায়ী শূন্যস্থানের নিজের শক্তি আছে – তা মাপাও সম্ভব হয়েছে। সেই শক্তির হিসাব থেকে বিশ্বের প্রসারণ বৃদ্ধির একটা মান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত আমাদের হিসাব আসল প্রসারণের থেকে অনেক বেশি। কতো বেশি ? 10^120 (একের পিঠে একশো কুড়িটা শূন্য) গুণ বেশি। কাজেই সমস্যার সমাধান এখনো বহু দূরে। আরো কিছু কিছু তত্ত্ব আছে যারা কৃষ্ণ শক্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় নি।

পদার্থবিজ্ঞানে সামনের কয়েক বছর খুব আকর্ষণীয় হতে পারে। উনবিংশ শতকের শেষে পদার্থবিদরা মনে করেছিলেন যে তাঁদের বিজ্ঞানের আর বিশেষ কিছু জানার বাকি নেই। তাঁদের সেই আত্মপ্ৰসাদের কাঁচের ঘর নতুন শতাব্দির পাঁচ বছরের মধ্যে কোয়ান্টম তত্ত্ব ও আপেক্ষিকতাবাদের আঘাতে চুরমার হয়ে যায়। আমরা যখন ভাবতে শুরু করেছিলাম যে মহাবিশ্বকে আমরা মোটামুটি বুঝতে পেরেছি, তখনই দেখা গেলো যে মহাবিশ্বের মাত্র পাঁচ শতাংশ আমাদের চেনা পদার্থ দিয়ে তৈরি, বাকি পচানব্বই শতাংশ সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। একবিংশ শতাব্দির সূচনায় কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে ? নতুন কোনো আবিষ্কার কি আমাদের সামনে নতুন কোনো জগতকে খুলে দেবে? সময়ই সে কথা বলবে।

(প্ৰকাশ : জ্ঞান ও বিজ্ঞান, মার্চ ২০১৪, আলোকচিত্র: নাসা)

পুনশ্চ: এই লেখাটা ছাপার পর সুপারনোভা ও কৃষ্ণ শক্তি বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তা নিয়ে আবার লেখার ইচ্ছা আছে।

লেখক পরিচিতি

Gautam Gangopadhyay

লিখেছেনঃ GAUTAM GANGOPADHYAY
Professor at Calcutta University

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে । সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: