Header Ads

প্রাচীন ভারতের কলঙ্কজনক অধ্যায়

প্রাচীন ভারতের কলঙ্কজনক অধ্যায়

পৃথিবীর আদিতম মানব গোষ্ঠীর মাঝে ভারতীয় উপমহাদেশ অন্যতম। পৃথিবীর বহু জাতি ভারতীয় উপমহাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে আবার বেরিয়েও গেছে, তবে রেখে গেছে তাদের আগমনের অকাট্য প্রমাণ। বৃহত্তর ভারতবাসীদের রক্ত মিশ্রিত হয়েছে শতকের পর শতকব্যপী। ভারতীয় রক্তে বিদেশি মিশ্রণ প্রক্রিয়া ঐতিহাসিককালেও সুস্পষ্ট। ঐতিহাসিক যুগে আমরা দেখি, বিভিন্ন অভিযাত্রী নরগোষ্ঠী ভারতীয় ভাবধারা নির্মাণে অবদান রাখতে। আর্য, গুপ্ত, সেন, বর্মণ, কম্বেজাখ্য, খড়গ, তুর্কি, আফগান, মুগল, পাঠান, পুর্তুগিত, ইংরেজ, আর্মেনীয় প্রভৃতি বহিরাগত জাতি শাসন করেছে এ অঞ্চল এবং রেখে গেছে তাদের রক্তের ধারা। এক কথায় ভারতীয় উপমহাদেশ হলো একটি সংকর জাতি। এখানে কমপক্ষে ১৭৯টি ভাষা ও ৫৪৪টি আঞ্চলিক ভাষা প্রচলিত ছিল এবং কম করে হলেও ১১৮টি রাজ্য ছিল। প্রাচীন ভারতে বহু জাতি, বহু ধর্ম ও বহু ভাষাগত মানুষের মহামিলনের ফলে উদ্ভব হয় বহু উপ-জাতি বা সম্প্রদায়।

প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য জাতি ও উপ-জাতির মাঝে এক বিশেষ সম্প্রদায় ছিল, যারা পথের চলন্ত পথিকদের হত্যা করে তাদের সর্বস্ব লুটপাট করে জীবিকা নির্বাহ করতো। ইতিহাসে এরা ঠগি নামে পরিচিত। এরা যত মানুষ হত্যা করেছিল পৃথিবীর অন্য কোনো সংগঠিত খুনি সম্প্রদায় এত নিরীহ মানুষ হত্যা করেনি। কেবল ১৮৩০ সালেই ঠগিরা প্রায় ৩০,০০০ মানুষ হত্যা করে। আবার হত্যারপর মৃতদেহকে উৎসর্গ করতো কালী দেবীকে। ঠগিদের নৃশংস ইতিহাস ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এরা ১৩ থেকে ১৯ শতকে ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছিল। আজও গ্রাম-বাংলার মানুষের মুখে শোনা যায় ঠগিদের নির্মমতার কথা।

বাংলা অভিধানে ঠগি বলতে বোঝায়, বিশেষ শ্রেণির দস্যুদল। যারা পথিকের গলায় রুমাল বা কাপড় জড়িয়ে হত্যা করতো। ঠগি শব্দটি সংস্কৃত ঠগ শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ প্রতারক, ধূর্ত বা প্রবঞ্চক।
১৬৫৫ সালে ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারনি লিখিত ‘ফিরোজ শাহ্র ইতিহাস’ গ্রন্থে ঠগিদের কথা প্রথম জানা যায়। এরপর বহু শতাব্দী ধরে বংশ পরম্পরায় তাদের কর্মকান্ড চলতে থাকে। এরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতো, পথে পথে যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতো। তারপর সময় সুযোগ বুঝে যাত্রীদের মেরে ফেলে সর্বস্ব লুট করতো। ১৭-১৮ শতকের দিকে ভারতের পথিকদের জন্য মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম ছিল এই ঠগি। ঠগিদের সম্বন্ধে ব্রিটিশ সরকার প্রথম জানতে পারে ১৮২২ সালে। রাজ্যের নানা স্থানে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করার সংবাদ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। কর্তৃপক্ষ প্রথম প্রথম বিষয়টি আমলে নেয় নি, ভেবেছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

১৮২২ সালের দিকে গঙ্গার ধারে একটি গণকবরে একত্রে ৫০টি মৃতদেহ পাওয়া যায়। গণকবরটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, মৃতদেহগুলো যেন ভালোভাবে মাটির সঙ্গে মিশে যায় সে জন্য অত্যন্ত সচেতনভাবে সমাহিত করা হয়। সমাহিত করা সময় মৃতদেহের হাড়ের সন্ধি স্থল ভেঙ্গে দেয়া হতো। যাতে করে ডিকম্পোজিশন প্রক্রিয়াটি তরান্বিত হয় এবং কবর ফুলে না ওঠে কিংবা মৃতদেহগুলো শেয়াল না খায়। এসব বিচার-বিশ্লেষণ করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অনুমান করে বুঝতে পারে গণহত্যার পিছনে রয়েছে খুনের উদ্দেশ্য। তারপর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ঠগি নামে ভয়ংকর খুনে এক উন্মাদ গুপ্ত দস্যু গোষ্ঠীর নাম। এরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়, পথের যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে।

তারপর সুযোগ মতো পথিকের গলায় রুমাল বা কাপড়ের গিঁট দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে গোপনে মৃতদেহ সমাহিত করে। যে কারণে কেউ ঠগিদের আক্রমনে মারা গেলে বিষয়টি অজানা থেকে যেত। লোকে ভাবতো পথে হয়তো জন্তজানোয়ারের আক্রমনের শিকার হয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ পর্যটক নিখোঁজ হতে শুরু করলে তখন বিষয়টি নজরে এন তদন্ত শুরু করে। তদন্তে বেরিয়ে আসে, এ হত্যাকারীরা আদিম কালী উপাসক গোষ্ঠী এবং কালীর নামে মৃতদেহ উৎসর্গ করে। ঠগিরা কেবল সনাতন ধর্মের অনুসারী নয়, এদের মধ্যে মুসলিম ও শিখ ধর্মাবলম্বী ও রয়েছে।

ঠগিরা সবসময় চলত দল বেঁধে। তারা ব্যবসায়ী, তীর্থযাত্রী কিংবা সৈন্যের ছদ্মবেশে ভ্রমন করত। এদেরই লোকজন গোপনে বাজার কিংবা সরাইখানা থেকে পথযাত্রীদের সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য জোগাড় করত। তারপর যাত্রীদের সঙ্গে মিশে যেত। যাত্রা বিরতিতে যাত্রীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করত। সহযাত্রীদের সৌহার্দ্য, নিরাপত্তা আর বিশ্বাসের উষ্ণ আমেজে, গরম খাবার খেয়ে পথ চলতি ক্লান্ত যাত্রীরা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে থাকেন। আর তখনেই আসতো সর্দারের হুকুম। সর্দারের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই যাত্রীদের ওপর ঘটতো নির্মম হত্যাকান্ড। একজন যাত্রীকে খুন করতো তিনজনের একটি দল। একজন মাথা ধরে রাখত, অন্যজন ফাঁস পরাত, আরেকজন পায়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত। কেউ পালিয়ে গেলেও রক্ষা নেই, ঠগিদের অন্য একটি দলটি আসে-পাশেই ওত পেতে থাকতো।

ঠগিরা নানা সাঙ্কেতিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে ভাব আদান প্রদান করতো। যেমন- ‘বাসন মেজে আনার কথা’ বলার মধ্য দিয়ে সর্দার তার এক সাগরেদকে কবর তৈরি করার নির্দেশ দিত। ‘ঝিরনী’ শব্দে হত্যার প্রস্তুতি আর ‘তামাকু লাও’ শব্দের মাধ্যমে হত্যার আদেশ দেয়া হতো। এই নির্দেশ পাওয়া মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে ফাঁস পড়ানো হতো শিকারের গলায়। যে কোনো সংগঠিত অপরাধী সমাজের মতোই এরা নিজস্ব নানা সাঙ্কেতিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে ভাব আদান প্রদান করত। গোষ্ঠীভুক্ত না হলে এই সংকেত পাঠোদ্ধার ছিল অসম্ভব।

বিভিন্ন ভূমিকা আর দক্ষতার ভিত্তিতে পেশাদারি শ্রম বিভাজনের কাঠামো তৈরি করেছিল ঠগিরা। দলের সদস্যদের নির্দিষ্ট সব দায়িত্ব ছিল। সর্বাগ্রে থাকতো ‘সোথা’রা। সম্ভাব্য শিকার চিহ্নিত করা, তার সাথে ভাব জমানোর ও শিকার সম্পর্কে নানা তথ্য জোগাড়ের দায়িত্ব থাকতো তাদের ওপর। পুলিশের গতিবিধি নজরে রাখার দায়িত্ব ছিল ‘তিলহাই’দের, এরা দল থেকে খানিকটা পিছনে থাকতো। নিরাপদ জায়গা দেখে তাবু গড়ার দায়িত্ব থাকতো ‘নিসার’দের উপর। কবর তৈরি করার দায়িত্ব যার তাকে বলা হতো ‘বিয়াল’। শিকারকে যে ধরে রাখবে তাকে বলা হতো ‘চামোচি’। শিকার যাতে বাধা দিতে না পারে তার জন্য হাত আটকে রাখার দায়িত্ব ‘চুমোসিয়ার। ‘চুমিয়া’ শিকারের পায়ে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেবে। ‘ভোজারা’ মৃতদেহগুলো কবরে নিয়ে যাবে সমাহিত করতে। ‘কুথাওয়া’র দায়িত্ব হলো মৃতদেহগুলোর হাঁটু ভেঙ্গে থুতনির সঙ্গে লাগিয়ে ভাঁজ করে সমাহিত করা। মৃতদেহ পাহারা দেয়া ও বিপদের গন্ধ পেলে জানান দেয়ার দায়িত্ব প্রাপ্তদের বলা হতো ‘ফুরকদেনা’। আর হত্যাকান্ডর জায়গাটা সাফসুতরো করে ফেলার দায়িত্ব ছিল ‘ফুরজানা’দের।

সদ্য মৃত মানুষদের কবরের ওপর বসতো ঠগিদের অমৃতের ভোজ। সে ভোজ আর কিছু নয়, গুড়ের ভোজ। একলা পথিক পেলেই সাদরে তাকে দলের সাথে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানাত। তাদের মতে, যে একবার এই গুড় খাবে সে ঠগি হয়ে যাবে। ঠগিদের খুনের অস্ত্রটা ছিল বেশ অবাক করার মতো। অতি সাধারণ, কিন্তু সাংঘাতিক কার্যকর। এক ফালি হলদে কাপড়ের টুকরো। দুই ভাঁজে ভাঁজ করলে মাত্র ৩০ ইঞ্চি। ১৮ ইঞ্চির মাথায় একটা গিট। তাতে একটা রুপার টাকা বা তামার ডবল পয়সা বাঁধা। নিপুণ ঘাতকের হাতে সেটাই হয়ে উঠে অব্যর্থ মরণ ফাঁস।

ব্রিটিশ সরকার ঠগিদের নিমূর্ল করার জন্য উইলিয়াম শ্লিমানকে দায়িত্ব দেয়। বেঙ্গল আর্মির অফিসার উইলিয়াম হেনরি শ্লিমান ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি দেখলেন, কিছুতেই অন্যান্য দুস্কৃতিকারীদের থেকে ঠগিদের পৃথক করা যাচ্ছে না। ঠগীরা নিপুণ কৌশলে অপরাধ ঢেকে রাখছিল। শ্লিমান গুপ্তচর নিয়োগ করলেন, গঠন করলেন বিশেষ পুলিশ বাহিনী ও আলাদা বিচার আদালত।

পাশাপাশি ঠগিদের অপরাধস্থল বিশ্লেষণ করে তৈরি করলেন মানচিত্র এবং অপরাধের দিনক্ষণের একটি তালিকা তৈরি করলেন যাতে পরবর্তী হত্যার সময়কাল আঁচ করা যায়। নিজের লোকদের ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে অস্ত্রসহ সেসব স্থানে পাঠাতে থাকেন। অবশেষে ১৮৩০ সালে শ্লিমানের গুপ্তচরদের দক্ষতায় ঠগিরা দলে দলে ধরা পড়তে থাকে। এদের কারো কারো মৃত্যুদন্ড, কারো যাবজ্জীবন জেল, কারো বা দ্বীপান্তর দিয়ে ঠগিদের দমন করতে সক্ষম হন উইলিয়াম শ্লিমান। বাকী যারা ছিল তারা ভয়ে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। ফলে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষ ঠগি মুক্ত হয়।

ঠগিদের দীর্ঘ বিচারপর্বে উঠে আসে নানা অজানা বিচিত্র কাহিনী যা শুনে সভ্য সমাজের সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঠগিদের জবানবন্দি থেকে খুনের যে হিসাব পাওয়া যায় তা ছিল খুবই মর্মস্পর্শী। ১৯৩৩ সালে উইলিয়াম শ্লিমানের নাতি জেমস শ্লিমানের লেখায় জানা যায়, একজন ঠগি প্রতিমাসে গড়ে ৮-১০ জনকে খুন করতো। সে হিসেবে প্রায় ২০ লক্ষেরও অধিক মানুষ এই ঠগিদের শিকার হয়েছিল। বাহরাম নামের এক নিষ্ঠুর ঠগির নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ৯৩১ জন মানুষকে সে খুন করেছিল; পরবর্তীতে ঐ ঠগির নাম গিনেস বুকে ওঠে। কিন্তু ঠগিদের এই নিষ্ঠুরতম ইতিহাস আজ কালের অতলে হারিয়ে গেলেও মাঝে মাঝে পারিপার্শ্বিক কিছু ঘটনা সেই ইতিহাসকে নতুন করে উস্কে দেয়।

লিখেছেনঃ এম এইচ মুন

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: