Header Ads

ধুমকেতুতে অবতরণ

ধুমকেতুতে অবতরণ

গত ১২ই নভেম্বর ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির জার্মান মহাকাশযান রসেটার অবতরণযান ফাইলি এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বিজ্ঞানীরা ১৯৯৩ সালেই রসেটা অভিযানের প্রস্তাব করেছিলেন লক্ষ্য ছিলো কোনো ধূমকেতুর বুকে অবতরণ এর জন্য প্রথমে বেছে নেওয়া হয়েছিলো ধূমকেতু ৪৬পি/উইরটানেন এগারো বছর পরে ২০০৪ সালের দোসরা মার্চ ফরাসি গায়না থেকে এরিয়েন রকেটে সাওয়ার হয়ে রসেটা যাত্রা শুরু করে এর মধ্যে এক রকেট দুর্ঘটনার জন্য মিশন এক বছর পিছিয়ে যায় তার ফলে রসেটার লক্ষ্যও পাল্টাতে হয় তার নতুন গন্তব্য হয় ১৯৬৯ সালে আবিষ্কৃত ধূমকেতু ৬৭পি/চুরাইমভ-গেরাসিমেঙ্কো এত বড়ো নাম হওয়ার কারণ হলো ধূমকেতুদের নাম দেওয়া হয় তাদের আবিষ্কর্তাদের নামে সাড়ে ছয় বছরে ৬৭পি সূর্যকে একবার প্ৰদক্ষিণ করে দশ বছর যাত্রার পর এবছরের (অর্থাৎ ২০১৪ সালের) আগস্ট মাসে রসেটা ৬৭পি ধূমকেতুর চারপাশে কক্ষপথে স্থাপিত হয় অবশেষে নভেম্বর মাসের ১২ তারিখে অভিযান সফল হয়েছেফাইলি ধূমকেতুর বুকে নামতে সক্ষম হয়েছে।

ধুমকেতুতে অবতরণ
রসেটার তোলা ৬৭পি ধূমকেতুর ছবি (Photo ESA/Rosetta/NAVCAM) 

এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রসেটা তিনবার পৃথিবী একবার মঙ্গলের পাশ দিয়ে গেছেপ্ৰতিবার সে অভিকর্ষকে ব্যবহার করে তার গতি বাড়িয়েছে দুটি গ্রহাণু স্টেইন্স লুটেশিয়ার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে তাদের ছবি পাঠিয়েছে ধূমকেতুতে অবতরণের সময়েও সমস্যা হয়েছিলো অবশেষে সে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলেও এখনো অনেক কাজ বাকি

ধূমকেতু সম্পর্কে মানুষের কৌতুহল নতুন কিছু নয় এক সময় প্রায় সব দেশেই তাকে অমঙ্গলের চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মেও ধূমকেতুর একটা ভূমিকা আছে গ্রিক বিজ্ঞানী দার্শনিক আরিস্টটল বিশ্বাস করতেন যে সূর্য চন্দ্র গ্রহ তারা সমন্বিত আকাশ হলো দিব্যলোক বা স্বর্গ তার কোনো পরিবর্তন হয় না আমাদের এই পৃথিবী তার সমস্ত ক্লেদ নিয়ে পরিবর্তনশীল কিন্তু ধূমকেতুরা তো মাঝে মাঝে আসেতাহলে দিব্যলোক অপরিবর্তনীয় কেমন করে ? আরিস্টটল বললেন, ধূমকেতুরা চাঁদের নিচে বায়ুমণ্ডলের মধ্যে থাকে চাঁদের ওপার থেকে দিব্যলোকের সূচনা কিন্তু ১৫৭৭ সালে এক মহা ধূমকেতু আকাশে দেখা দেয় টাইকো ব্রাহের মতো কয়েকজন জ্যোতিবিদ তার দূরত্ব মেপে দেখালেন যে তা চাঁদের থেকে অনেক দূরে আছে তাই ক্ৰমে ক্ৰমে অপরিবর্তনীয় দিব্যলোকের ধারণা পরিত্যক্ত হলো আরিস্টটলের ভাববাদী মত অনুসরণের ফলে মধ্য যুগে ইউরোপে বিজ্ঞান যে কানাগলিতে ঢুকে পড়েছিলো, তার থেকে মুক্তির এটা ছিলো একটা বড়ো ধাপ

ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ধূমকেতু হলো হ্যালির ধূমকেতু নিউটনের বন্ধু এডমণ্ড হ্যালি নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র ধরে হিসাব কষে দেখিয়েছিলেন যে মোটামুটি ৭৬ বছর পর পর একটি বিশেষ ধূমকেতু ফিরে আসে তাঁর হিসাব মেনে ধূমকেতুটি যখন আবার আকাশে দেখা দিলো, তখন হ্যালি আর বেঁচে নেই শেষবার হ্যালির ধূমকেতু এসেছিলো ১৯৮৬ সালে, কলকাতা থেকে আমরা অনেকে তাকে দেখেছিলাম দুটি মহাকাশযান, জিয়োত্তো ভেগা তাকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলো

ধূমকেতু সম্পর্কে আজও আমাদের এত কৌতুহল কেন ? দুটাে বিষয়ের উল্লেখ করা যাক প্রথমত মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীতে প্ৰাণের জন্য ধূমকেতুর সম্ভবত বিরাট অবদান আছে সৃষ্টির সময় পৃথিবী ছিলো অত্যন্ত গরম তাপমাত্রায় জল হাইড্রোজেন অক্সিজেনে ভেঙে যায় হাইড্রোজেন হালকা গ্যাস, তাই তা পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে মিলিয়ে যাবে তাই সে সময় পৃথিবীতে জল থাকা সম্ভব নয় তাহলে জল এলো কোথা থেকে? সৌরজগত এখন যেমন শান্ত দেখছি, চিরকাল সেই রকম ছিলো না সৌরজগতের বাইরে অংশেপ্লুটাের থেকেও অনেক দূরেআছে পাথর আর বরফ দিয়ে তৈরি ছোটাে অণু গ্রহ তারা তৈরি করেছে এক গোলকাকার মেঘ তার বাইরের ভিতরের অংশের নাম হলো উর্ট মেঘ হিল মেঘ বৃহস্পতির মতো দানব গ্রহদের আকর্ষণের ফলে সেই অণু গ্রহদের কয়েকটা মাঝে মাঝে সৌরজগতের দিকে রওনা দেয় সৃষ্টি হয় ধূমকেতু সৌরজগত যখন সৃষ্টি হয়েছিলো, তখন ধাক্কাধাব্ধি হতো অনেক বেশি তাই ধূমকেতুরাও সংখ্যায় ছিলো অনেক প্রায়শই রকম ধূমকেতু এসে পৃথিবীতে পড়তো সেই জল থেকেই মহাসাগরের জন্ম তবে অনেক বিজ্ঞানী এই তত্ত্বের সঙ্গে সহমত নন তাঁদের যুক্তি আলোচনা করা এখানে সম্ভব নয় তবে একথা নিশ্চিত যে ধূমকেতু কী দিয়ে তৈরি তা ঠিকঠাক ভাবে জানতে পারলে আমরা এই বিতর্কের সমাধান করতে পারবো।

ধুমকেতুতে অবতরণ
শিল্পীর চোখে রসেটা থেকে ফাইলির ধূমকেতুতে অবতরণ (ESA)

ধূমকেতু
যখন সূর্যের কাছে আসে, তখন উত্তাপে তার থেকে জলীয় বাষ্প  অন্যান্য নানা গ্যাস বেরিয়ে আসে সৌর বিকিরণে সৌর বায়ুর প্রভাবে তা থেকে জন্ম নেয় ধূমকেতুর সবচেযে দর্শনীয় অংশ, তার পুচ্ছ বা লেজ হ্যালির ধূমকেতুর উদ্বায়ী পদার্থের মধ্যে থেকে পাওয়া গেছে জল, কার্বন মনোক্সাইড কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অ্যামোনিয়া এছাড়াও থাকতে পারে কিছু জৈব যৌগ প্ৰাণ সৃষ্টির সঙ্গে জৈব যৌগের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক আছে একটা তত্ত্ব তো এমন কথাও বলে যে প্রাণের এক মূল অঙ্গ অ্যামিনো অ্যাসিডও হয়তো ধূমকেতুর মধ্যে তৈরি হয়েছিলো অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়েই তৈরি হয় প্রোটিন, যা ছাড়া প্ৰাণের অস্তিত্ব হয়তো সম্ভব নয় প্ৰাণ সৃষ্টিতে ধূমকেতুর ভূমিকা জানতে চাইলেও তাই তার রাসায়নিক বিশ্লেষণ করতে হবে

তাই রসেটার এই অভিযানের গুরুত্ব অনেক। সচেতনভাবেই বিজ্ঞানীরা তার নামটা বেছে নিয়েছেন দুশো বছর আগে মিশরে যে রসেটা পাথর পাওয়া গিয়েছিলো তাতে প্ৰাচীন মিশরিয়া লিপি প্রাচীন গ্রিক লিপিতে ফারাও পঞ্চম টলেমির আদেশ লিপিবদ্ধ ছিলো | প্ৰাচীন গ্রিক লিপি প্রত্নতাত্ত্বিকরা জানতেন, তার থেকেই প্রাচীন মিশরের লিপির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছিলো প্রাচীন মিশর সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের সমস্ত জ্ঞানের সূত্র তাই রসেটা পাথর নতুন এই রসেটা কি প্রাচীন পৃথিবী তথা সৌরজগত সম্পর্কে আমাদের অনেক অজানা কথা শেখাবে? আমরা আশায় থাকলাম


প্রকাশ : সৃষ্টির একুশ শতক, ডিসেম্বর ২০১৪, পরিমার্জিত

সংযোজন

এই লেখাটা ছাপা হওয়ার পরে অনেকদিন চলে গেছে। ২০১৬ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর রসেটা ৬৭পি ধূমকেতুর বুকে নিয়ন্ত্রিত ভাবে ঝাঁপ দেয়। তার ঠিক আগে ধূমকেতুর খুব কাছ থেকে গ্যাস, ধুলো ও প্লাজমা সম্পর্কে নানা তথ্য পাঠায় সে। ঝাঁপ দেওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা একটা গহ্বরকে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ ধূমকেতুর ভিতরের গঠনের তার থেকে পাওয়া যেতে পারে। সাড়ে বারো বছরের যাত্রার এইভাবেই শেষ হল। এই সময়ে রসেটা আটশো কোটি কিলোমিটার পথ পেরিয়েছে, সূর্যকে ছ’বার প্রদক্ষিণ করেছে। যাত্রার শেষ হলেও তার থেকে পাওয়া সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করতে আরো বহু বছর চলে যাবে। রসেটা মিশনের বিশদ বিবরণ ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির http://www.esa.int/Our_Activities/Space_Science/Rosetta এই ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
এখনো পর্যন্ত রসেটা মিশন থেকে যা নতুন তথ্য পাওয়া গেছে সংক্ষেপে তার কয়েকটা আলোচনা করা যাক।

ধূমকেতুতে পাওয়া গেছে আণবিক নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। জলে ডয়টেরিয়াম ও সাধারণ হাইড্রোজেনের অনুপাত মেপে দেখা গেছে যে তা পৃথিবীর জলে যে অনুপাত আমরা পাই, তার থেকে আলাদা। (ভারি হাইড্রোজেন বা ডয়টেরিয়াম হল হাইড্রোজেনের আইসোটোপ। সাধারণ হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসে থাকে একটা প্রোটন, ডয়টেরিয়ামের নিউক্লিয়াসে আছে একটা প্রোটন ও একটা নিউট্রন।) এর থেকে বোঝা গেছে যে এই ৬৭পি ধূমকেতু বহু প্রাচীন, সৌরজগত সৃষ্টির সময় সূর্য থেকে বহুদূরে এর জন্ম হয়েছিল। পৃথিবীতে জলের উৎস নিয়ে মূল লেখাটায় যা লিখেছিলাম, তাই এতদিন আমরা ক্লাসে পড়তাম। কিন্তু ৬৭পির জলে ডয়টেরিয়াম ও সাধারণ হাইড্রোজেনের অনুপাত আমাদের সেই জ্ঞানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

৬৭পি ধূমকেতুর থেকে ধূলিকণা বেরিয়ে আসে, তা রসেটার ডিটেক্টরে ধরা পড়েছে। এই রকম ধূলিকণাই সৌরজগত সৃষ্টির সময় গ্রহ তৈরির সূচনা করেছিল। কিন্তু কেমন করে এগুলো ধূমকেতু থেকে বেরিয়ে আসছে, তা আমরা এখনো বুঝতে পারিনি। রসেটা জিওলজিক্যাল বা ভূতাত্ত্বিক ভাবে মৃত নয়, সেখানে নানা ক্রিয়াকলাপ চলছে, যা এতদিন ছিল আমাদের ধারণার বাইরে।

ফাইলির গ্যাস বিশ্লেষণ যন্ত্রগুলি আমাদের আরো জানিয়েছে যে ধূমকেতুর মধ্যে আছে বেশ কয়েকটি জৈব যৌগ। বিশেষ করে বলতে হবে ফর্মালডিহাইডের কথা। এই যৌগগুলির কয়েকটি প্রোটিন, সুগার এবং ডিএনএ অণু তৈরিতে কাজে লাগে। প্রাণের মূলে আছে এই অণুগুলি। মনে রাখতে হবে যে ৬৭পির জন্ম হয়েছিল সৌরজগত সৃষ্টির সময়। তাহলে কি প্রাণের সৃষ্টিতে সেই প্রথম যুগেরও ভূমিকা আছে? আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রাণ সৃষ্টির সম্ভাবনা তাহলে কি বেড়ে গেলো? এই সমস্ত নানা প্রশ্ন এখন বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে।

ছবিগুলি ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত (CC BY-SA IGO 3.0)

লেখক পরিচিতি

Gautam Gangopadhyay

লিখেছেনঃ GAUTAM GANGOPADHYAY
Professor at Calcutta University

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে । সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: