Header Ads

বই রিভিউঃ মহাভারত (২য় পর্ব)

বই রিভিউঃ মহাভারত (২য় পর্ব)

বই : মহাভারত,
লেখক : কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস 
সারানুবাদ : রাজশেখর বসু

অভিমন্যু : আমার দৃষ্টিতে মহাভারতের সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রসম্পন্ন একজন বীর । যিনি অর্জুনের পুত্র হয়েও তাঁর পিতার মত কামার্তা হননি , সমগ্র মহাভারতে তাঁর অত্যধিক কোন দম্ভও চোখে পরেনি । তবে তাঁর জীবন কাল ছিল স্বল্প । অর্জুনের পুত্র হিসেবে নিজের পিতার বীরোচিত সাহস তিনি পেয়েছেন । তাই চক্রব্যুহে কেবল প্রবেশ করার জ্ঞান থাকলেও (বের হওয়ার জ্ঞান তাঁঁর ছিলনা, এই জ্ঞান তাঁকে প্রদান করেছিলেন তাঁর পিতা অর্জুন) তিনি চক্রব্যূহে প্রবেশ করে বীরোচিত যুদ্ধ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন । তাঁর সাথে দলগতভাবে যুদ্ধ করেন : দ্রোণ, কৃপ (কৃপাচার্য), কর্ণ, অশ্বথ্থামা, দুর্যোধন এবং শকুনি । তারপরও অভিমন্যুকে পরাস্ত করতে তাঁদের হিমশিম খেতে হয় ।কর্ণের মত বীর যোদ্ধাও অভিমন্যূর শরাঘাতে (তীরের আঘাত) ক্ষতবিক্ষত হন ।

মূলত অভিমন্যুকে হত্যা করার সমগ্র প্রক্রিয়াটিই ছিল যুদ্ধ নীতি বিরুদ্ধ কারণ যুদ্ধ নীতিতে বলা হয়েছিল একজন যোদ্ধার সাথে কেবল একজনই যুদ্ধ করবেন । কিন্তু অভিমন্যূর সাথে একত্রে ছয় জন যুদ্ধ করেন । ধৃতরাষ্ট্রকে অভিমন্যূবধের মৃত্যু সংবাদ শুনিয়ে সঞ্জয় (ধৃতরাষ্ট্রের সারথি, যিনি মহাভারতের যুদ্ধ শুরুর পূর্বে ধৃতরাষ্ট্রকে যুদ্ধবৃত্তান্ত শুনানোর জন্য ব্যাসের নিকট থেকে দিব্য দৃষ্টি লাভ করেছিলেন) বলেছিলেন : “ মহারাজ, দ্রোণ কর্ণ প্রভৃতি ছ জন মহারথ একজনকে নিপাতিত করলেন – এ আমরা ধর্মসঙ্গত মনে করিনা ।” যদিও মহাভারতে অর্জুন এবং কর্ণ দুজন স্বীকৃত বীর যোদ্ধা কিন্তু আমার দৃষ্টিতে অদম্য সাহসের প্রদর্শনে অভিমন্যুকে অর্জুন বা কর্ণ কেউই অতিক্রম করতে পারেননি ।

অশ্বত্থাম : দ্রোণ এবং কৃপীর পুত্র । কখিত আছে জন্মের পর তিনি অশ্বের মত চিৎকার করেছিলেন তাই তাঁর নাম অশ্বথ্থামা । তিনি দুর্যোধনের অন্যতম সাহসী মিত্র । মহাভারতের শেষের দিকে তিনিই সমগ্র ঘুমন্ত পান্ডব শিবিরে মূর্তিমান আতংক হয়ে আসেন, পঞ্চ পান্ডবদের পুত্র সকল, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখন্ডী প্রভৃতিদের হত্যা করেন ।মূলত তাঁর হাত ধরেই মহাভারতের যুদ্ধে ঘটা যাবতীয় অধর্মের সমাপ্তি ঘটে ।

ইন্দ্র : মহাভারতের একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । হিন্দু দেবতাদের দেবরাজ তিনি । মহাভারতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুব কম স্থান আছে যেখানে তাঁর কোন না কোন কর্মকান্ডের বর্ণনা নেই । তিনি পান্ডববীর অর্জুনের পিতা । তবে তিনি দুর্যোধনের মত এমন একটি চরিত্র যাঁর সমগ্র মহাভারতে সুনাম বলতে কিছুই নেই । বরং সর্বক্ষেত্রে তাঁর পরনারীর প্রতি আসক্তির কুকীর্তির কথা বর্ণিত হয়েছে । তিনি ছিলেন উগ্র স্বভাবের একজন কামুক ব্যাক্তি এবং তাঁর চিন্তাধারা গতিপ্রকৃতিও ছিল সর্বদা কামুকে ।

অর্জুন যখন শিবের নিকট থেকে পাশুপাদ অস্ত্র গ্রহনের জন্য স্বর্গে যান তখন তিনি স্বর্গের অপ্সরা মেনকার নৃত্যশৈলী দেখে মুগ্ধ হন । ঘটনাটি ইন্দ্রের গোচরীভূত হওয়ার পর তিনি মেনকাকে অর্জুনের নিকট পাঠান শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য !!!! পিতা হয়ে বিবাহিত পুত্রের নিকট অন্য নারীকে পাঠানো হল শারীরিক সম্পর্কের জন্য ।উদ্ভট চিন্তাধারার কি উতকৃষ্ট নমুনা !!!

তবে অর্জুন কামার্তা মেনকাকে প্রত্যাখ্যান করেন , ফলশ্রুতিতে মেনকা এই মর্মে অভিশাপ দেন যে অর্জুন এক বছর কালীন ক্লীবত্বের (তৃতীয় লিঙ্গ, রক্ষণশীল সমাজে ঘৃণিত ভাষায় যাকে আমরা বলি “হিজরা”) অধিকারী হবেন । পরবর্তীতে সেই ক্লীবত্বের সময়টি অর্জুন বিরাট রাজ্যে অজ্ঞাতবাসকালে ব্যয় করেন । বিরাট রাজ কন্যা উত্তরার নৃত্যশিক্ষক হিসেবে অজুর্ন এক বছর কালীন সময় পর্যন্ত নিযুক্ত ছিলেন ।

ইন্দ্র তাঁর নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য অপ্সরীদের দৈহিক রুপ এবং তাঁদের নৃত্যশৈলীর যথেচ্ছ ব্যবহার করেছেন । তিনি নানা দেবতাদের করা সাধনা অপ্সরীদের নৃত্যশৈলী দ্বারা বিঘ্নিত করেছেন , তাঁদের পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছেন অপ্সরীদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে যাতে তাঁদের সাধনা ব্যার্থ হয় । বরাবরের মত ইন্দ্র তাঁর এই অপ্সরী চালে সফল হয়েছেন , অন্যদিকে দেবতারা অপ্সরীদের নৃত্যশৈলী এবং শারীরিক অঙ্গভঙ্গি দেখে কামার্ত হয়ে নিজেদের সাধনার ১২টা বাজিয়েছেন । সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, এত কিছু করার পরও তিনি দেবরাজ হিসেবে বহাল তবিয়তেই আছেন ।

যুদ্ধপূর্ববর্তী মহাভারত বিশ্লেষণ:

যুদ্ধপূর্ব মহাভারতকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুরু - পান্ডবদের বংশের শুরু থেকেই ক্ষমতা ভোগ এবং ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যার উদ্ভব হয়। ভীষ্ম সেই সমস্যার বিস্তৃতি আটকানোর জন্য নিজের অকৃতদার থাকার প্রতিজ্ঞা করে সমস্যাটিকে সাময়িক মিমাংসা করতে পেরেছিলেন বটে কিন্তু চিরতরে শেষ করে দিতে পারেননি । যার ফলে পরবর্তীতে ধৃতরাষ্ট্র এবং পান্ডু, তারও পরে দুর্যোধন বনাম যুধিষ্ঠরের মাঝে ক্ষমতার দ্বন্দ শুরু হয় ।

যতই আমরা একে ধর্মযুদ্ধ বলে চালিয়ে দিতে চায়না কেন খুব সুক্ষভাবে ভাবলে এর সাথে সামাজিক প্রতিপত্তি, উচ্চবংশীয় জন্মপরিচয়ের গরিমা ধরে রাখার প্রচেষ্টা, আরাম আয়েশ তথা অপার সুখ ভোগের আকাঙ্খা এসব এই যুদ্ধের পিছনে লুকায়িত কারণ হিসেবে অবস্থান করছিল । যদিও সমগ্র মহাভারতের বিদ্যমান চরিত্রগুলির মাঝে কেবল যুধিষ্ঠিরকে এসব কারণ থেকে দূরে রাখা যায় ।

মহাভারতে প্রবল জাত্যাভিমানের অনেক নমুনা আমরা দেখতে পাই । ইসলাম ধর্মের সাথে যেমন জঙ্গিবাদ শব্দটি চলে আসে তেমনি হিন্দু ধর্মের সাথেও জাতিভেদ শব্দটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত । মহাভারতের শুরুর দিকে কর্ণ অর্জুনের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চাইলে ভীম তাঁর জন্ম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেন । কিন্তু ভীমের নিজের জন্ম প্রক্রিয়ায় তাঁর পিতা পান্ডুর কোনরুপ অবদান ছিলনা । পবনদেব এবং কুন্তীর মিলনের ফলে ভীমের জন্ম ।

অন্যের দিকে আঙ্গুল তুললে কখনো কখনো যে সে আঙ্গুল নিজের দিকেও এসে যায় তা বোধ হয় তাঁর খেয়াল ছিলনা , যদিও তাঁর স্বভাবে ভদ্রতার নমুনা খুব একটা দেখা যায়না । তেমনি জাতিভেদের বিষয়টি গুরু দ্রোণের বেলায়ও প্রযোজ্য । শিক্ষাদানের বেলায় তিনিও জাতিভেদ থেকে নিজেক দূরে রাখতে পারনেনি । দ্রৌপদীও তাঁর জাতিভেদের বিষয়টি বড় নগ্নভাবেই প্রকাশ করেছিলেন । তাঁর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল এটি যথেষ্ঠ নিন্দনীয় একটি ঘটনা কিন্তু এর ফলে তিনি তাঁর স্বয়ংবর নির্বাচনের সময় কর্ণকে তাঁর বংশ পরিচয়ের উল্লেখ করে করা অপমানের দায় এড়াতে পারেননা ।

যদি তিনি তা না করতেন তবে হয়ত তাঁর সম্মানের জায়গাটি আরো উচ্চ স্তরে থাকত , সামগ্রিক পরিস্থিতিও তাঁর অনুকূলে ছিল তবে দুর্ভাগ্য তিনি তা করেননি । তিনি ভদ্রভাবেই কর্ণকে তাঁর অনিচ্ছার কথা জানাতে পারতেন কিন্তু তা না করে তিনি মহাভারতের বাকি চরিত্রগুলির মত জাত্যাভিমানের পথেই হাঁটলেন । কর্ণকে প্রত্যাখ্যান করার অজুহাত দিলেন তাঁর নীচু বংশে জন্ম হওয়াকে । আবার পঞ্চ পান্ডবরাও কেবল অর্জুনের একক ধনুর্বীরের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কর্ণকে যথোপযুক্ত সম্মান দেননি যা দুর্যোধন দিয়েছিলেন ।

তবে এর ফলে দুর্যোধনের উদারতার প্রদর্শনী হয়নি বরং তিনি অর্জুনের একজন যোগ্য প্রতিদ্বন্দীকে হাতের নাগালে পেয়ে তাঁকে নিজের দলে টেনে পঞ্চপান্ডবদের উপস্থিত বোকামির দ্বারা তৈরী হওয়া সুবর্ণ সুযোগের যথাযথ সদব্যবহার করেছেন । অত্যন্ত চালাক এবং ধূর্ত দুর্যোধনের এই দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাধারার প্রশংসা না করে পারা যায়না । তিনি তাঁর পরিকল্পনায় সফল হয়েছিলেন এবং কর্ণ নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে শেষ পর্যন্ত দুর্যোধনের পক্ষে ছিলেন । তবে ভাগ্য দুর্যোধনের সহায় ছিলনা ।

নারী স্বাধীনতা মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে । মহাভারতে উল্লেখ আছে, “ পুরাকালে নারীরা স্বাধীন ছিল, তারা স্বামীকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সাথে বিচরণ করত তাতে দোষের কিছু ছিলোনা কারণ প্রাচীন ধর্মই এ প্রকার।” যদিও পরবর্তীতে শ্বেতকেতু দ্বারা এমন উদ্ভট স্বাধীনতার অবসান ঘটে । অন্তত আমি এ বিষয়ে জোর দিয়ে বলতে পারিনা যে মহাভারতে নারীরা স্বাধীন ছিল তবে এটুকু সত্য তাদের অনেক সম্মান দেয়া হত । তবে দ্রোপদীর বস্ত্র হরণ চেষ্টার পর পূর্বে নারীদের দেয়া সকল সম্মানই বৃথা হয়ে যায় ।

মহাভারত সম্পর্কে সকলের একটি গতবাঁধা ধারণা প্রচলিত যে পান্ডবরা যথেষ্ঠ ধার্মিক ছিলেন কিন্তু ব্যাক্তিগতভাবে আমি তা মনে করিনা । যদি দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের বিষয়টিকে আমরা আপাতত বিবেচনায় না আনি তবে কৌরব এবং পান্ডবদের অধর্মের বোঝা দাঁড়িপাল্লায় মাপলে খুব একটা চোখে পরার মত পার্থক্য সামনে আসবেনা । তবে মহাভারতে পান্ডবদের দ্বারা মূলত যাবতীয় অধর্ম সংঘটিত হয় যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, কেবল বারণাবতে জতুগৃহ দাহ ঘটনাটি ব্যাতিত ।

অপরদিকে কৌরবদের করা অধর্ম মূলত মহাভারতের শুরু থেকেই শেষ পর্যন্ত সমভাবে বিস্তৃত । পান্ডবরা যতই ধার্মিক হোক না কেন , তারা যতুগৃহে একজন মা সমেত তার পাচ সন্তানকে ইচ্ছাকৃতভাবে মেরে ফেলার দায় কোনভাবেই এড়াতে পারেননা । তারা এমন জঘন্য কাজ করেছিলেন কেবল সবার কাছে নিজেদের মৃত প্রমাণ করার জন্য ।

তবে পান্ডবরা সৌভাগ্যবান যে তাঁদের করা অধর্মগুলোর বিপরীতে ধর্ম স্থাপনের জন্য ছলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে এমন যুক্তি দেয়া যায় যা কৌরবদের করা অধর্মগুলির বিপরীতে দেয়া সম্ভব নয় । সবচেয়ে মজার বিষয় এই যে, পান্ডবদের পক্ষে এই যুক্তি উথ্থাপনের পিছনে কৃষ্ণের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরী করা সুযোগের বাহবা না দিয়ে পারা যায়না ।

দ্রৌপদীর পাঁচ জন স্বামী মহাভারতের একটি অন্যতম বিতর্কিত বিষয় ছিল, আছে এবং বাকি জীবনও থাকবে । যদিও এর একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা আছে তবে আজকের নৈতিকতার মাপকাঠি এবং তখনকার নৈতিকতার মাপকাঠিতে একটি বড় ফারাক ছিল এ কথা স্বীকার করতেই হবে ।

তবে তাঁর জন্য আমি দ্রৌপদীকে কোনভাবেই দোষারোপ করতে রাজি নই । তিনি হয়েছিলেন পরিস্থিতির স্বীকার । কুন্তীর ভুল আদেশের বলি হন দ্রৌপদী । দ্রৌপদীর এমন বিতর্কিত অবস্থানের জন্য যদি কেউ এককভাবে দায়ী হন তবে তা একমাত্র কুন্তীই।

মহাভারতের পুরুষ চরিত্রগুলির মাঝে দেবরাজ ইন্দ্র, দুর্যোধন, জয়দ্রথ এবং কীচকের নারীলোভ ছিল চোখে পরার মত । অর্জুনও তাঁর পিতা ইন্দ্রের মত কামার্তা ছিলেন বটে কিন্তু তিনি কোনরুপ নোংরামির আশ্রয় নেননি, যা ইন্দ্র, দুর্যোধন, জয়দ্রথ এবং কীচক নিয়েছিলেন ।

দুর্যোধন তো দ্রৌপদীকে দ্যূতসভায় নিজের নগ্ন বাম ঊরু দেখিয়ে তাঁর নোংরামির নিকৃষ্ট প্রদর্শনী করেছিলেন । এই ক্ষেত্রে আবার কৃষ্ণের ভূমিকাটি বড়ই অদ্ভুত । তিনি মহাভারতের যতই জনপ্রিয় চরিত্র হোন না কেন ধূর্ততায় তাঁর দক্ষতার দিকটি কোনভাবেই এড়ানো যায়না ।

একদিকে দ্রৌপদীকে তিনি কর্ণের নির্দেশে এবং দুর্যোধনের সমর্থনে করা বস্ত্রহরণ চেষ্টা থেকে বাঁচালেন, অন্যদিকে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠার অল্পকাল আগে আবার তিনিই কর্ণকে প্রস্তাব দেন যে দ্রৌপদী পঞ্চপান্ডবদের নিকট ব্যয়িত সময়ের পর অবশিষ্টাংশ তাঁর সাথে ব্যয় করবেন এবং পঞ্চপান্ডবরা কর্ণের আদেশ মেনে নিবেন যদি তিনি পান্ডবদের পক্ষে যুদ্ধ করেন । কি অদ্ভুত আচরণ !!!! যদিও এটি কৃষ্ণের যুদ্ধপূর্বধূর্ততা নাকি মনের ইচ্ছা তা আজো অজানা ।

ভাগ্য ভাল কর্ণ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি, করলে হয়ত কৃষ্ণের চরিত্রেও চরমতর কালিমা লিপ্ত হতো এবং দ্রৌপদীরও তা হত জীবিত থেকে মরে যাওয়ার মত সমান কষ্টের, অপমানের । কারণ মহাভারতে একজন নারী হিসেবে দ্রৌপদীর অত্যধিক রুপই তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়ায় । বনবাসে জয়দ্রথ কর্তৃক এবং বিরাট রাজ্যে অজ্ঞাতবাস কালে বিরাট রাজার পত্নী সুদেষ্ণা কর্তৃক দ্রৌপদীর রুপের গুণগান তারই প্রমাণ দেয় ।

দ্রৌপদীর পাঁচ জন স্বামীর মত আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হল মহামুনি ব্যাস কর্তৃক ধৃতরাষ্ট্র, পান্ডু, বিদুরের জন্মদান প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ । যে কোন অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মনে এই প্রশ্ন আসতে বাধ্য যে , সমগ্র কুরু রাজ্যে কি একজনও অনাথ ছেলে ছিলনা যাকে সত্যবতী তাঁর বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করতে পারতেন ?

যদিও এই প্রশ্নের বিপরীতে এমন একটি যুক্তি দাঁড় করানো যায় যে , হয়ত তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় বংশের উত্তরাধিকে সেই বংশের মহিলার গর্ভেই গর্ভস্থ হতে হবে এমন রীতির প্রচলন ছিল । তবে এই বক্তব্যেরে স্বপক্ষে বা বিপক্ষে কোনরুপ বক্তব্য মহাভারতে পাওয়া যায়নি ।

দ্যূতসভা যুদ্ধপূর্ব মহাভারতের একটি অন্যতম দৃষ্টিআকর্ষণীয় ঘটনা যা মোটেও চিত্তাকর্ষক নয়। যুধিষ্ঠির ধর্মজ্ঞানী ছিলেন বটে তবে দ্যূতক্রীড়ার অত্যধিক আসক্তি তাঁর বিপদ ডেকে আনে । তিনি তখনকার ত্রিলোক দ্যূতনিপুণ শকুনির সাথে পাশা খেলায় অবতীর্ণ হন । একটি ভুল ধারণা প্রায় সব হিন্দুদের মাঝে প্রচলিত আছে যে শকুনি তাঁর মৃত পিতার হাড় দিয়ে বানানো পাশা দিয়ে খেলতেন যদিও মহাভারতে এইরুপ কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি ।

তিনি মায়াবলে পাশা বদলিয়ে দিতে পারতেন অথবা ভেঙ্গে যাওয়া পাশাকে মায়া বলে জোড়া লাগাতে পারতেন এমন কোন ঘটনারও মহাভারতে কোনরুপ বর্ণনা নেই । ভারতীয় সিরিয়ালে যেসব উদ্ভট ঘটনা দেখানো হয় তাদের একটি হল শকুনির মায়াবলে বদলানো পাশা এবং অপরটি হল তার মৃত পিতার হাড় দিয়ে বানানো পাশা যা দিয়ে তিনি খেলতেন ।

তবে শকুনি যে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠিরের নিকট থেকে সহস্রগুণ বেশী দক্ষ ছিলেন এটি সত্য । পাশা খেলায় দুজনের অবস্থানকে সহজভাবে বলতে গেলে অনেকটা এভাবে বলা যায় : “লিজেন্ড ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারের বিপরীতে পাড়ার কোন আনকোড়া ছেলের ব্যাটিং চ্যালেঞ্জে নামা” ।

দ্যূতসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের ঘটানাটি সবাই জানে । তবে এঁদের মাঝে কেবল একজন ব্যাতিক্রম ছিলেন যার নাম “বিকর্ণ” । সম্পর্কে দুর্যোধনের আপন ভাই । দ্যূতসভায় সমগ্র দুর্যোধনপন্থীদের মধ্যে কেবল বিকর্ণই বস্ত্রহরণ প্রচেষ্টার বিরোধীতা করেন । আমি দুর্যোধনপন্থী বলতে দুর্যোধনের সকল ভাই এবং তাঁদের মিত্রদের (কর্ণ, অশ্বত্থামা প্রভৃতি) কথা বলেছি । ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর এরা ছিলেন মধ্যপন্থী যদিও তাঁরা অন্নদায়ের কারণে পরবর্তীতে যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষ নেন ।

আর এই দ্যূতসভায় মহাভারতের যুদ্ধের বীজ বপন হয় । ১৩ বছর (পাশা খেলায় হেরে পান্ডবদের শাস্তি হয় ১২ বছর বনবাস এবং ১ বছর অজ্ঞাতবাস সাথে সমম্ত সম্পত্তি থেকে অধিকার হারানো) বছর পর সংঘটিত হয় কালজয়ী মহাভারতের যুদ্ধ । যে যুদ্ধে আপনজন আপনজনের প্রাণ নিয়েছে , রক্ত নিয়ে হোলি খেলেছে , দুর্বার অস্ত্রের প্রদর্শনী করেছে, বিধবা করেছে হাজারো নারীকে, পুত্রহীন করেছে হাজারো মাকে, অনাথ করেছে হাজারো সন্তানকে , চিতার আগুনে জ্বালিয়েছে হাজারো মানুষকে । আমার পরবর্তী রিভিউতে সেই যুদ্ধকালীন মহাভারতের বিশ্লেষণ থাকবে।

পোস্ট লেখা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান এবং দিক নির্দেশনায় : শ্রদ্ধেয় বন্দন দাদা ।

লেখক পরিচিতিঃ
লিখেছেনঃ Joyraj Hore

এমন আরও বইয়ের নিয়মিত রিভিউ পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। প্রতি সপ্তাহের শনি এবং মঙ্গলবারে আমাদের বুক রিভিউ সিরিজের লিখা পাবলিশ হয়ে থাকে। আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে ও লাইক দিয়ে রাখুন ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: