Header Ads

স্মার্ট পদার্থ

স্মার্ট পদার্থ

গাড়িতে হঠাৎ উল্টোদিক থেকে আসা গাড়ির ধাক্কা। আপনার পাতলা কাপড়ের জামাটা মুহুর্তের মধ্যে লোহার থেকেও শক্ত হয়ে আপনাকে বঁচিয়ে দিল।

ব্রিজের কংক্রিটের ভিতরে ফাটল ধরেছে, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। চিন্তা নেই, ফাটল শুরু হওয়া মাত্র আপনার যন্ত্রে খবর চলে আসবে।

বাড়ির ছাদটা ফেটে যাচ্ছে? চিন্তার কিছু নেই, শুধু একটু জল দিয়ে আসুন। ছাদ আবার নতুনের মতো হয়ে যাবে।

কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হচ্ছে? না, এমন পদার্থ সত্যিই আছে যারা সহজেই উপরের গল্পগুলোকে বাস্তবে পরিণত করতে পারে। তাদের অনেকগুলো এখনো পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু অন্তত কয়েকটার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে। হয়তো আপনি না জেনেই এরকম কোনো পদার্থ ব্যবহার করেন।

অ্যাকসিডেন্টের সময় আপনাকে বাঁচাতে পারে ডিথ্রিও (D3O) নামের এক জেলির মতো যৌগ। এমনি জেলির মতো হলেও যখন জোরে ধাক্কা দেওয়া হয় এক সেকেণ্ডের হাজার ভাগেরও কম সময়ে ডিথ্রিওর অণুগুলো ঐ আঘাতের থেকে শক্তি নিয়ে নিজেদের মধ্যে যুক্ত হয়ে যায়। তাতে করে আঘাতের জোর কমে যায়, একই সঙ্গে ডিগ্রিওর আবরণ বর্মের মতো শক্ত হয়ে গিয়ে আপনাকে বঁচিয়ে দেয়। এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। তবে এখনো দাম বেশি বলে। আমার আপনার নাগালের বাইরে।

ব্রিজ বানানোর বিশেষ ধরনের কংক্রিটের মধ্যে থাকে। কার্বন ফাইবার অর্থাৎ তন্তু। চাপ বাড়ালে কংক্রিটের বৈদ্যুতিক রোধ বাড়ে। এই বৃদ্ধি ঐ কার্বন তন্তুর সাহায্যে মাপা যায়। তার থেকে সহজেই কোনো জায়গায় ফাটল শুরু হলেই সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে।

এমন কংক্রিট যা জল দিলেই আবার নতুনের মতো হয়ে যাবে, তা বিজ্ঞানীর পরীক্ষাগার থেকে দোকানে আসা শুধু সময়ের অপেক্ষা। ঐ কংক্রিটের মধ্যে আছে ক্যালসিয়াম ল্যাকটেটবাহী ব্যাকটেরিয়ার স্পোর। জল পেলেই ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে ফাটল বোজানোর চুণাপাথর অর্থাৎ ক্যালসিয়াম কার্বনেট।

এই তিন ধরনের বাইরেও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। এদের সবার মধ্যে একটাই মিল, এরা সবাই স্মার্ট পদার্থ (Smart material) ।

স্মার্ট পদার্থ কাকে বলে ? বাইরের পরিবেশের কোনো রকমের পরিবর্তন হলে যে সব পদার্থের ভৌত বা রাসায়নিক ধর্মের বড় রকমের যায়, তাহলে স্মার্ট পদার্থীরাও সাধারণত আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আজকের পৃথিবীতে এই ধরনের পদার্থ যে কত উপকারে লাগানো হচ্ছে, তা লিখে শেষ করা যাবে না।

এদের স্মার্ট বলি কেন ? অভিধানে আছে স্মার্ট শব্দের মানে বুদ্ধিমান। এরা এমন ব্যবহার করে যেন এদের নিজেদেরই বুদ্ধি আছে। মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এরা প্রয়োজনীয় কাজটা সেরে ফেলে। নানা ধরনের স্মার্ট পদার্থ আছে। কেউ তাপমাত্রা পাল্টালে রঙ বা রূপ পাল্টায়, কেউ চাপ বাড়ালে আয়তন বদলায়, কেউ বা আবার তার ভিতর দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে তার ভৌত ধর্মপাল্টে ফেলে। এদের মধ্যে কয়েকটার কথা বিশেষ ভাবে বলা যায়।

কোনো কোনো সঙ্কর ধাতুর অদ্ভুত ধর্ম দেখলে মনে হয় যেন তাদের স্মৃতিশক্তি আছে। ঐ রকম কোনো সঙ্কর ধাতুর একটা টুকরোকে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নিয়ে গিয়ে একটা বিশেষ আকার দিলাম। তার পর তাকে গরম বা ঠাণ্ডা বা গরম করাম। এবার তার আকার পাল্টে জোর করে পাল্টে দিলাম। আবার যদি টুকরোটাকে ঐ আগের তাপমাত্রায় ফিরিয়ে নিয়ে যাই, সে ঠিক আগের চেহারা ফিরে পাবে। ঠিক যেন আগের আকারটা সে মনে রেখেছে। এমন ধাতুও আছে যারা আবার দুটো অলাদা তাপমাত্রায় দুটো আলাদা আলাদা আকার মনে রাখতে পারে। যখনি তাদের ঐ দুটো তাপমাত্রার কোনো একটায় নিয়ে যাওয়া হয়, তারা ঐ তাপমাত্রায় তার আগে যে আকার ছিল তাতে ফিরে যায়। এদেরকে বলে শেপ মেমরি অ্যালয়।

স্মার্ট পদার্থ

শেপ মেমরি অ্যালয় কী কাজে লাগে ? একটা উদাহরণ দেখা যাক। নিটিনল হল নিকেল ও টাইটানিয়াম ধাতুর সঙ্কর। আমাদের দেহে কোনো রক্তনালী চুপসে গিয়ে অনেক সময় রক্ত সংবহনে ব্যাঘাত ঘটায়। এনজিও প্লাস্টি অস্ত্ৰোপচারে ঐ চুপসে যাওয়া নালীর ভিতর একটা স্টেন্ট ঢুকিয়ে তাকে আগের আকারে ফিরিয়ে আনা হয়। স্টেন্ট হল একটা পলিমারের বা প্লাস্টিকের নল যার ভিতরে থাকে। একটা ধাতুর জালি স্টেন্টটা রক্তনালীর মতোই বড়ো বলে একে বাইরে থেকে কাটাছেড়া না করে রক্তনালীর ভিতর দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাওয়া শক্ত । একটা নিটিনলের জালিকে রক্তের তাপমাত্রায় রেখে এমন মতোই বড়ো হয়। এবার পলিমারের নলটার মধ্যে তাকে ঢুকিয়ে দিলাম। পুরো জিনিসটাকে ঠাণ্ডা করে তারপর চাপ দিয়ে ছোটাে করলাম। এখন তাকে রক্তনালীর ভিতর ঢুকিয়ে ঠিকঠাক জায়গায় নিয়ে যাওয়াটা অনেক সহজ কাজ। দেহের তাপমাত্রায় সে আবার তার আগের আকার ফিরে পায়। তখন পলিমারের নলটা ফুলে উঠে রক্তনালীর ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাটায় ঠিকঠাক বসে যায়। এতো গেল একটা উদাহরণ । শেপ মেমরি অ্যালয়দের তাপমাত্রার কন্টোলার হিসাবে ব্যবহার করা যায়। বাড়িতে আগুন লাগলে নিজে থেকেই অ্যালাম বেজে উঠবে, কেটলির জল একটা নির্দিষ্ট তাপ মাত্রায় গেলে নিজে থেকেই হিটারটা বন্ধ হয়ে যাবে, কিংবা ঘর বেশি গরম বা ঠাণ্ডা হলে নিজে থেকেই জানলা খোলা বন্ধ হয়ে যাবে – এরকম অগুনতি ব্যবহারে এদের লাগানো সম্ভব। এমন পলিমারও বানানো সম্ভব হয়েছে যারা ঠিক শেপ মেমরি অ্যালয়ের মতোই কাজ করে। তাদের দামও অনেক কম।

স্মার্ট পদার্থ

পিজো তড়িৎ পদার্থকে বলা যেতে পারে প্রথম স্মার্ট মেটেরিয়াল। কোনো কোনো কেলাস বা ক্রিস্টালের উপর চাপ দিয়ে যদি তার আকার পাল্টাতে চাই, তাহলে সে একটা তড়িৎ ক্ষেত্র তৈরি করে। এই তড়িৎকে বলে পিজো তড়িৎ বা পিজো ইলেকট্রিসিটি। এর উল্টো ব্যবহারও সম্ভব – অর্থাৎ তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করে এদের আয়তনের খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন করা যায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ইলেকট্রোস্ট্রিকশন।

আপনার হাতের কোয়ার্জ ঘড়িতে পিজো।তড়িৎ কেলাস ব্যবহার করা হয়েছে। আরো বহু জায়গায় একে কাজে লাগানো হয়। গিটার বা বেহালা বাজাচ্ছেন, তারে টান পড়ছে, পিজো।তড়িৎ কেলাস দিয়ে তাকে ভোল্টেজে পরিবর্তন করে নিলাম। তাহলে সরাসরি তাকে অ্যামপ্লিফায়ারে পাঠিয়ে দিতে পারি। এতো গেল খুব সাধারণ প্রয়োগ এই ধরনের কেলাসকে আরো অনেক কাজে লাগানো হচ্ছে। ধরুন একটা যন্ত্ৰ চলার সময় খুব কাপে – সেই কম্পনটা কমানো দরকার পিজো।তড়িৎ কেলাস খুব সহজে কম্পনের পরিমাণটা মেপে তার থেকে ভোল্টেজ তৈরি করে। সেই ভোল্টেজ ব্যবহার করে যন্ত্রটাকে সেইমতো সুস্থিত করা হয়। হেলিকপটারের ব্লেড, ক্যামেরা থেকে ইনকজেট প্রিন্টার – নানা জায়গায় এর ব্যবহার হয়। তেমনি ইলেকট্রোস্ট্রিাকশন ধর্মের প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোল্টেজ ব্যবহার করে কেলাসের খুব সূক্ষ্ম পরিমাণ হ্রাস বা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এক মিটারের একশ কোটিভাগের এক ভাগকে বলে এক ন্যানোমিটার। পিজো কেলাস ইলেকট্রনিক চিপ তৈরি বা মেডিক্যাল ইনজিনিয়ারিং সহ নানা শিল্পে পিজো মোটর যুগান্তর এনেছে।

অনেক স্মার্ট মেটিরিয়াল আছে যারা তাপমাত্রা, আলো, চাপ প্রয়োগ করলে কিংবা তার আশেপাশে রাসায়নিক পরিবর্তন হলে রঙ পাল্টায়। আলোতে রঙ পাল্টানো পদার্থ ফটোক্রোমিক চশমায় ব্যবহার হয় আমরা জানি। যে পদার্থ জলের সংস্পশে এসে আয়তনে অনেক গুণ বেড়ে যায়, তাকে জলের পাইপের লিক সারাতে কাজে লাগানো হয়। আরো অনেক রকম ব্যবহারের মধ্যে একঢা হয়তো খুব তাড়াতাড়িই আমরা দোকানে দেখতে পাব। অনেক সময় প্যাকেটের খাদ্যদ্রব্য গায়ে লেখা এক্সপায়ারি তারিখের আগে ব্যবহার হয় না, ফলে তা ফেলে দিতে হয়। সারা পৃথিবীর মোট উৎপাদিত খাবারের তিন ভাগের এক ভাগ এভাবে নষ্ট হয় | এক সঙ্গে তৈরি হলেও সব প্যাকেটের খাবার এক সঙ্গে খারাপ হয় না | সত্যি সত্যি কোনো প্যাকেটের খাবার হয়তো নষ্ট হয়নি, কিন্তু তারিখ পেরিয়ে গেলে সেটা ফেলে দিতেই হয়। বেশি দিন থাকলে খাবার নষ্ট হয় কেন ? খাবারটা যখন পুরানো হয় তার মধ্যে নানা রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয় কিংবা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। কিন্তু সব প্যাকেটের খাবার তো একই রকম নষ্ট হবে না। প্যাকেটের গায়ে লাগানো স্মার্ট লেবেল রাসায়নিক পরিবর্তনটা ধরে দেখিয়ে দেয় খাবারটা সত্যি খারাপ হয়েছে কিনা, তখন আর এক্সপায়ারির তারিখের দরকার হবে না। লেবেলের রঙ দেখলেই বুঝতে পারব। ওষুধের জন্যও স্মার্ট লেবেলের ব্যবহার করা যায় |

সাধারণ থার্মেমিটারে পারদ ব্যবহার করা হয়। পারদ খুবই বিষাক্ত | তাই পরিবেশের পক্ষে তা ক্ষতিকারক। থার্মেক্রোমিক পদার্থ তাপমাত্রা বদলালে রঙ পাল্টায়। তা দিয়ে তৈরি থামোমিটার পরিবেশের ক্ষতি করে না। এধরনের পদার্থের আরো নানা জায়গায় লাগানোর কথা ভাবা যেতে পারে। থার্মেক্রোমিক ফিডিং বটল বলে দেবে কখন দুধটা বাচ্ছাকে খেতে দেওয়ার মতো ঠাণ্ডা হয়েছে। অনেক সময় ওষুধ এমনভাবে রাখতে হয় যাতে কখনোই তার তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট মানের চেয়ে বেশি না হয়। আপনি দোকান থেকে কেনার সময় বুঝবেন কেমন করে যে তাপমাত্রােটা সবসময় ঠিকঠাক ছিল ? স্মার্ট লেবেল আপনাকে সে কথা বলে দেবে।

উদাহরণের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রবন্ধকে দীর্ঘায়িত করতে চাইনা। সেদিন আর খুব দূরে নয় যখন স্মার্ট সেনসর ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তে সুগারের পরিমাণ মাপতে থাকবে ও প্রয়োজন মতো ইনসুলিন দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করবে। এমন স্মার্ট পলিমার দিয়ে ওষুধকে কোটিং করে রাখা হবে যা একটা নির্দিষ্ট অঙ্গে পৌছোলে নিজেকে নষ্ট করে ফেলবে। ধরুন। একটা ওষুধ যকৃতের কোষের উপর প্রয়োগ করতে হবে। সেটা যখন আমার দেহের মধ্যে প্রবেশ করানো হল, তখন তা যে যকৃতেই যাবে, অন্য কোথাও কাজ করবে না, সেটা নিশ্চিত করা খুব শক্ত কাজ। স্মার্ট পলিমার যকৃতে পৌঁছে গলে যাবে, ওষুধের অণুগুলো তখন কাজ করতে শুরু করবে। ক্যান্সারে কেমোথেরাপির যুগান্তর ঘটিয়ে দিতে পারে এই পদ্ধতি। আগামী দু তিন বছরের মধ্যেই হয়তো পাওয়া যাবে স্মার্ট ফ্রাকচার প্লেট । ভাঙা হাড়ের সঙ্গে এরকম প্লেট লাগিয়ে দিলে তার থেকে আমরা জানতে পারব হাড় জোড়া লাগছে কিনা।

এখনো এই স্মার্ট পদার্থের দাম অনেক সময়ই খুব বেশি, তাই তার ব্যবহার সীমাবদ্ধ। নিজের মেরামত নিজেই করে নিতে পারবে এমন অনেক পদার্থ আছে। তাদের এমন জায়গায় ব্যবহার করা হয় যেখানে নাগাল পাওয়া শক্ত। মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ বা নিউক্লিয় রিঅ্যাক্টরের মধ্যে তাই এদের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। তেমনি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে এই ধরনের পদার্থের চাহিদা আছে। সুগার সেনসরের কথা আগে বলেছি। জানলা নিজে থেকে খোলা বা বন্ধ হওয়া, সূর্যের দিকে সোলার প্যানেলের ঘুরে যাওয়া, এরকম নানা স্বয়ংক্রিয় কাজ স্মার্ট পদার্থ করতে পারে। অনেক সময়ই স্মার্ট পদার্থ পরিবেশ বান্ধব। আরো অনেক কাজে স্মার্ট পদার্থের ব্যবহার সম্ভব – শুধু আমাদের ভেবে বার করতে হবে কোথায় আমরা এই ধরনের পদার্থদের কাজে লাগাতে পারি।

প্ৰকাশ: মাসিক বসুমতী, নভেম্বর- ডিসেম্বর, ২০১৫, পরিমার্জিত

লেখক পরিচিতি

Gautam Gangopadhyay

লিখেছেনঃ GAUTAM GANGOPADHYAY
Professor at Calcutta University

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে । সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: