Header Ads

বই রিভিউঃ ছিয়াওরের মননত্বর ও সন্ন্যাসী – ফকির বিদ্রোহ

বই রিভিউঃ ছিয়াওরের মননত্বর ও সন্ন্যাসী – ফকির বিদ্রোহ

বই : ছিয়াওরের মননত্বর ও সন্ন্যাসী – ফকির বিদ্রোহ 
লেখক : নিখিল সুর

সত্যি বলতে আমি একজন নবীন পাঠক । বই পাঠ করা আমার নেশা । যতদূর জানি বইয়ের হাটে যেসব পাঠক বই নিয়ে লিখেন এবং মোটামুটি ও ব্যাপকভাবে সক্রিয় তাদের সবার চেয়ে আমি বয়সে অনেক ছোট আর তাই বই পাঠের অভিজ্ঞতার স্বল্পতার দরুণ আমার লিখায় অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি থাকতে পারে । আপনাদের পরামর্শে ভরপুর ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি একান্ত কাম্য ।

প্রথমেই বলে রাখি ছিয়াওরের মননত্বর ও সন্ন্যাসী – ফকির বিদ্রোহ নিয়ে এটি আমার পড়া প্রথম বই । এর আগে এসব ঘটনা সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় এবং লোকমুখে শুনেছি । এবার বইয়ের প্রসঙ্গে আসি ।বইটি আকারে যথেষ্টই ছোট মাত্র ৬৭ পৃষ্ঠা কিন্তু বইয়ের পুরোটাই একদম তথ্যে ঠাসা। পলাশীর যুদ্ধ দ্বারাই মোটামুটি ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশদের পরোক্ষ শাসন ব্যবস্থার সূচনা হয় । আর এই শাসন ব্যবস্থা পরবর্তীতে সময়ের ফেরে প্রত্যক্ষ হয় । বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশকে একটি টাকা রোজগারের খনি অপেক্ষা অধিক কিছু ভাবতনা । লেখক এই সত্যটিকে তার বইতে যথার্থভাবেই তথ্য সমেত তুলে ধরেছেন । বক্তব্যটির কিছুটা তুলে ধরলাম :

“ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর দেওয়ানি প্রাপ্তি গোটা রাজস্ব ব্যবস্থায় নিয়ে এল চরম এক অরাজকতা । খোদ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে নায়েব – দেওয়ান পর্যন্ত সকলেই বাংলা দেশকে মনে করলো একটি কল্পতরু । দেওয়ানি লাভের এক বছর আগেই রেজা খা বিহার থেকে আদায় করেছিলেন ২০ লক্ষ টাকা । বছরটা রাজনৈতিক দিক থেকে ছিল টালমাটাল । বক্সারের যুদ্ধ হয়েছে সে বছর । তাতেই বিহার থেকে ২০ লক্ষ টাকা আদায় হয়েছে দেখে ক্লাইভ উতসাহিত হলেন । রেজা খাকে চেপে ধরলেন । ফলে নতুন বছর বিহারের রাজস্ব নির্ধারিত হল ৬৮ লক্ষ টাকায় ।দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানি বাংলা থেকে ৩০ লক্ষ পাউন্ড রাজস্ব লাভের আশা করলো । এই বিশাল অভাবনীয় আয়ের সম্ভাবনা দেখে পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্য তো প্রস্তাবই পেশ করে বসলেন কোম্পানির হাত থেকে শাসনের দায়িত্ব নিয়ে নেওয়া হোক । ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অতদূর না এগোলেও শেষ পর্যন্ত স্থির করলো । প্রতি বছর কোম্পানির রাজস্বসূত্রে প্রাপ্ত অর্থ থেকে পার্লামেন্টকে ৪ লক্ষ পাউন্ড দেবে ।ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কার্য-কলাপে বৃটিশ পার্লামেন্টের এই প্রথম হস্তক্ষেপ ।”

বৃটিশদের এসব অবিবচকের মত সিদ্ধান্ত গ্রহণই বাংলাকে ধীরে ধীরে মননত্বরের দিকে ঠেলে দেয়। লেখকের লেখা বইতে একটি পূর্বানুমান পাওয়া যায় , কোর্ট-অফ ডিরেকটারস এর সিক্রেট কমিটিকে লেখা রিচার্ড বেকারের চিঠিতেই রয়েছে সেই করুণ চিত্র : “ অত্যন্ত স্বেচ্ছাচারী শাসনেও যে দেশ সমৃদ্ধশালী ছিল , তা ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে ”। শুধু তাই নয় দুর্ভিক্ষের সময় ব্রিটিশ কতৃর্পক্ষ সৈন্যদের উদরপূর্তি নিয়েই বেশী সক্রিয় ছিল । এর একটি চিত্র পাওয় যায় লেখকের এই লিখাটিতে : “ দুর্ভিক্ষের গোড়াতেই সৈন্যবাহিনীর জন্য কোম্পানি ৮০ হাজার মণ চাল মজুত করছিল, পাটনা ও বহরমপুরের সৈন্যদের জন্যে ৬০ হাজার আর প্রেসিডেন্সির সৈন্যের জন্য ২০ হাজার মণ । সমস্ত চাল সংগৃহীত হয়েছিল পাটনা থেকে । প্রস্তুতির এখানেই শেষ নয়। পাটনায় গুদাম তৈরী হলো , আগুনের হাত থেকে শস্য রক্ষার ব্যবস্থা করা হলো । একটা গোটা ব্রিগেডকে তিন মাস ধরে অন্ন জোগাবার মতো তখনই ১৯ হাজার মণ চাল মজুত ছিল ”।

নিজের অগ্রজদের কাছ থেকে শুনেছিলাম মননত্বরের সময় নাকি মানুষ অন্যের খাবারের থালা থেকে খাবার কেড়ে নিত নিজেদের ক্ষুধার জ্বালা মিটানোর জন্য । আর সরকারী সাহায্যের বিষয়টি নিয়ে কিছু না বলায় ভাল, কারণ তার উদাহরণও লেখক নিজেই দিয়েছেন তা বইতে : বহু স্থানে মানুষ যখন মৃতদেহ খেয়ে বাচার শেষ চেষ্টা করছে , তখন দুর্ভিক্ষপীড়িত ৩০ লক্ষ লোকের জন্য সরকারি সাহায্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৯০ হাজার টাকা ।”

এরপর এল সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহ । অন্যায়ের ফলে মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায় , তখন নিজেকে রক্ষার জন্যে হলেও মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয় ।আর এই বিদ্রোহ পুরো ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থাকে বেশ ভালভাবেই নাড়িয়ে দিতে পেরেছিল । ব্রিটিশ সরকার শত চেষ্টা করেও তার লাগাম ধরতে পারেনি ১৮০০ সনে পূর্ব পর্যন্ত যখন এই বিদ্রোহ নিজ থেকেই থেমে যায় ।লেখক তার বইতে এই বিদ্রোহের উপসংহারও বেশ সুন্দরভাবেই টেনেছেন : “ এইসব সন্ন্যাসী ও ফকিরদের অনেকেই কোন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিলনা , তথাপি তারা বিস্ময়জনকভাবে প্রায় অর্ধশতাব্দী যুঝেছিল কোম্পানীর শক্তির বিরুদ্ধে । একসময় তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার । তাদের অসফলতার পিছনে বড় কারণ ছিল অভিজ্ঞতা , যোগাযোগ নেতৃত্ব ও আদর্শের অভাব । ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল তাদরে দুর্বলতার আরেক কারণ । কিন্তু সেইজন্য সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহকে গুরুত্বহীন মনে করার কারণ নেই । পরিবর্তীত অর্থনৈতিক ও সমাজ ব্যবস্থাকে বাংলার কৃষক সম্প্রদায় এ গ্রামীণ মানুষ যে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে পারেনি , সন্ন্যাসী এ ফকির বিদ্রোহ তার বড় প্রমাণ । এ বিদ্রোহ ছিল স্বতষ্ফুর্ত । লুণ্ঠনে অংশ – গ্রহণকারীকে গ্রামের মধ্যে ফাসি দিয়ে বা গ্রামের ওপর পিটুনি কর বসিয়েও এই বিদ্রোহকে দমন করা সহজ হয়নি।”

পুরো বইটি পড়ে যা আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে তা হল এর অতি ছোট কলেবর । এমন গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়ের উপর লিখা বইয়ের কলেবর আরো বড় হওয়া উচিত ছিল ।শত হোক জানার তৃষ্না তো মেটেনা তাই ।

জানিনা আমার লিখা আপনাদের কতটুকু ভাল লাগবে বা আদৌ ভাল লাগবে কিনা তারপরও সবার প্রতি অনুরোধ রইল যদি এই দুটি বিষয় নিয়ে আরো কোন বইয়ের নাম আপনাদের জানা থাকে তবে তা কমেন্টে বলে আমাই সাহায্য করুন। আমি এ দুটি বিষয়ে আরো জানতে চাই।

লেখক পরিচিতিঃ
লিখেছেনঃ Joyraj Hore

এমন আরও বইয়ের নিয়মিত রিভিউ পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। প্রতি সপ্তাহের শনি এবং মঙ্গলবারে আমাদের বুক রিভিউ সিরিজের লিখা পাবলিশ হয়ে থাকে। আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে ও লাইক দিয়ে রাখুন ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: