Header Ads

বই রিভিউঃ ভারত স্বাধীন হল

বই রিভিউঃ ভারত স্বাধীন হল

বই : ভারত স্বাধীন হল (India Wins Freedom), 
লেখক : মৌলানা আবুল কালাম আজাদ

১৯৪৭ পূর্ব সময়ে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান মিলে ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ । ১৯৪৭ সালের যথাক্রমে ১৪ এবং ১৫ই আগস্ট এ হিসাব বদলে যায় । গড়ে উঠে দুটি নতুন দেশ : ভারত এবং পাকিস্তান (পরবর্তীতে ৭১ এর যুদ্ধে বাংলাদেশ নামক আমার মাতৃভূমির জন্ম।)ইতিহাসে বরাবরই আমার আগ্রহ প্রবল । কেন একটি ঘটনা এভাবে হলো, কেন তা এভাবে না হয়ে অন্যভাবে হলোনা, অথবা আদৌ কি অন্যভাবে করার কি কোন উপায় ছিলনা এসব প্রশ্ন আমার মনে সেই ছোটবেলা থেকেই আসত যখন আমি সমাজবিজ্ঞানের বইতে ইতিহাসের অধ্যায়গুলো পড়তাম । সেসব পড়তে পড়তে যখন একদিন জানলাম এই দুই দেশ ভাগের মূল কারণ “ধর্ম”, সেদিন খুব অবাক হয়েছিলাম । ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ !!!! তারপর এর পিছনের ইতিহাস জানার কাজ শুরু করলাম । আজ সেই সব পিছনের ঘটনা জানতে গিয়ে পাওয়া একটি বইয়ের রিভিউ লিখছি । যাকে নিয়ে লিখছি তিনি অনেক বিখ্যাত মানুষ আমি তার তূলনায় কিছুই নই । যদি আমার রিভিউতে কোন প্রকার ভুলভ্রান্তি থেকে থাকে তবে দয়া করে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিয়ে দেয়ার অনুরোধ রইল ।

আজ পর্যন্ত আমি দেশবিভাগ নিয়ে অনেক লিখা পড়েছি পত্র পত্রিকায়, বইতে, অনলাইনের নানা ফোরামে ।তবে এতটা স্পষ্ট বক্তব্য খুব কম লিখায় পেয়েছি । অবশ্য তার যুক্তিসংগত কারণও আছে । তিনি ছিলেন আন্দোলনের সাথে সরাসরি জড়িত একজন মানুষ । অতএব তার লিখায় অনেক বেশী প্রাণবন্ত ছবি পাওয়া যাবে এটিই স্বাভাবিক । যারা দেশ বিভাগ নিয়ে লিখে থাকেন (অনলাইন, অফলাইন), এমনকি আমার দেশে সরকারীভাবে প্রকাশিত পাঠ্য বইতেও (জানিনা পরবর্তীতে সংশোধন করা হয়েছে কিনা) দেশ বিভাগ নিয়ে লিখা ঘটনাগুলি সাম্প্রদায়িক দোষে দুষ্ট । আলাদা রাষ্ট্র পাওয়ার পরও আমরা ধর্মভিত্তিক পরস্পর ঢিল ছোড়াছুড়ি যে বন্ধ করিনি এই সব লিখা তারই বড় প্রমাণ । মালালা ইউসুফ জাই তার “আই অ্যাম মালালা” বইতে যথার্থই লিখেছেন যে “দেশভাগের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু মুসলিম হাল ছিল একই বাড়িতে কলহরত দুই ভাইয়ের মত” । কিন্তু আলাদা হওয়ার পরও তারা ভাল থাকেনি , কারণ বিভক্তির ভিত্তিতেই যে বড় গলদ ছিল ।

তার লিখা বই যেটুকু সময় পড়েছি এ কথা বলতে বাধ্য কেবল শুধু এটিই মনে মনে ভেবেছি যে চরম রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নিয়েও কি করে তিনি এতটা বড় মনের মানুষ হতে পারলেন । প্রতিটি জাতিরই কিছু সূর্য সন্তান থাকেন । আমার দৃষ্টিতে তিনি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের সেসব কৃতি সন্তানদের একজন । যিনি নিজ উদ্যোগে নিজের মনে জ্ঞানের আলো আসার দরজাটুকু খুলে দিয়েছিলেন । কতটা রক্ষণশীল পরিবারে তার জন্ম তা তার এই বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় : “ পাশ্চাত্য শিক্ষায় তিনি (লেখকের বাবা) মোটেই বিশ্বাস করতেননা । আমাকে আধুনিক ধাচে শিক্ষা দেয়ার কথা কথনো তিনি মনেও স্থান দেননি । তার ধারণায় আধুনিক শিক্ষায় ধর্মবিশ্বাস নষ্ট হয় । তাই সেকেলে চিরাচরিত পদ্ধতিতে তিনি আমাকে তালিম দেওয়ার ব্যবস্থা করেন ”।

তিনি এমন একজন মানুষ যিনি তার বইতে হিন্দু মুসলিম বিরোধ এর মত অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে এতটা সাবলীলভাবে লিখেছেন ।আমরা মানতে রাজি না হলেও সত্য দেশ বিভাগের পিছনে হিন্দু বা মুসলিম কেউই ধোয়া তুলশী পাতা ছিলনা । চাষের জমিতে যেভাবে আলোর ফাদ পাতা হয় পোকামাকড় দমন করার জন্য ঠিক সেভাবেই হিন্দু মুসলিমরা বৃটিশদের পাতা ফাদে পা দিয়েছিল আর দেশভাগের মধ্য দিয়ে তার উচ্চ মূল্যের খেসারত দিয়েছিল । যদিও এতে আমাদের স্বভাবের খুব একটা বদল হয়নি ।তার বক্তব্যের সাথে আমি ও একমত যে দেশভাগের পূর্বে হিন্দুদের একাংশ মুসলিমদের নিয়ে সর্বদাই ধোয়াশাচ্ছন্ন থাকত । থাকাটাই ছিল স্বভাবিক কারণ বৃটিশদের চালে মুসলিমরা পা দিয়েছিল এবং সেই চালে পরে ঘোল খেয়েছিল হিন্দুরা যাদের একাংশ আবার কট্টর মুসলিম বিরোধী । তাদের হাতেই বলি হন ভারতের আরেক সূর্য সন্তান “মহাত্মা গান্ধী” ।তেমনি অনেক মুসলিমদের মাঝেও হিন্দু বিরোধীভাব ছিল । থাকাটাই স্বভাবিক , পরিস্থিতিই এমন ছিল । কারণ বৃটিশদের এমন দাওয়াই যে দু পক্ষই খেয়েছিল ।এমনকি তাকেও শুরুতে দলে টানতে তিনি মুসলিম হওয়ার দরুণ অন্যদের ইতস্তত করার কথাও তিনি নি:সংকোচ বলেছেন । একজন সমালোচকের বক্তব্য এমনই দ্বিধাহীন হওয়া উচিত ।

তিনি তার বইতে মহাত্মাগান্ধীর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন পূর্বক তার যৌক্তিক সমালোচনা করেছেন । মহাত্মা গান্ধী অবশ্যই একজন বড় মাপের মানুষ ছিলেন কিন্তু তিনি যে অহিংসার নীতি অবলম্বন করেছিলেন আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করিনা এতে তিনি সফল হয়েছেন । পরবর্তীতে তার এই চিন্তাধারা থেকে তাকে সরে আসতে হয় ।কেবল অহিংসা দিয়ে কখনো কোন স্বাধীন হওয়া কতটুকু সম্ভব তা অবশ্যই একটি বড় প্রশ্ন । আমার এই বক্তব্য পড়ে হয়ত অনেক ভারতীয় দাদা দিদি এই ভাববেন যে ৭১ এ আমার দেশের মত তাদের দেশতো বৃটিশদের বিরুদ্ধে ৪৭ এ যুদ্ধ করেনি তবে কেন আমি মহাত্মা গান্ধীর নীতি নিয়ে এমন বক্তব্য লিখছি ? তার কারণ যুদ্ধটি বৃটিশদের বিরুদ্ধে হলেও মূলত তা হয়েছে হিন্দু এবং মুসলিমদের মাঝে যার ফলাফল এই দুইটি দেশ । গান্ধীজির অহিংসা নীতি এখানে মাঠে মারা গিয়েছে ।

তিনি তার বইতে রাজনীতিবীদদের ধর্মীয় কূট রাজনীতির উদাহরণ দিয়েছেন, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন ধর্মীয় ভেদাভেদের নোংরা ব্যবহারকে ।নিজেদের মন থেকে ধর্মকে ব্যবহার করে করা নোংরামির মানসিকতা দূর করার জন্য যে কোন লোকেরই উচিত তার বইটি অন্তত একবার পড়ে দেখার, আমি নিশ্চতভাবেই বলতে পারি আপনি বারবার বইটি পড়তে চাইবেন । কারণ সত্যকে তিনি এত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যে তা মনের খোরাক মিটাতে বাধ্য।

তার বই পড়লে যে কেউ এটি বুঝতে বাধ্য যে “জহরলাল নেহেরু” এর প্রতি তার আলাদা একটি দুর্বলতা ছিল । তবে ভাল লাগল এই ভেবে যে সে দুর্বলতায় বশবর্তী হয়ে তিনি নেহেরুর সমালেচনা থেকে নিজেকু দূরে সরিয়ে রাখেননি । এমনকি সমগ্র বইতে জিন্নাহ এর সমালোচনা থাকলেও সময়ের ফেরে নানা কাজে তিনি তার (জিন্নাহ) যথোপযুক্ত প্রশংসা করেছেন। তবে তার বইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হল এই যে তিনি নিজেকে কেবল অন্যের সমালোচনায় ব্যাস্ত রাখেননি , নিজের যথোপযুক্ত সমালেচনাও করেছেন । নিদ্বির্ধায় বলেছেন নিজের নেয়া ভুল সিদ্ধান্তগুলোর, নিজের ভাবা ভুল ভাবনাগুলোর কথা ।ব্যাক্তি হিসেবে কেউ ভুলভ্রান্তি বা সমালোচনার বাইরে নয় । তার কৃতকর্ম এখানে বিবেচ্য বিষয় তার জনপ্রিযতা নয়।

তার বইজুড়ে আছে নানা সম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামার কথা, বর্ণণা রয়েছে হিন্দু মুসলিম একে অপরের হাতে বলির পাঠা হওয়ার কথা ।যার রেশ আজে কাটেনি । আমার নিজের দেশেরই উদাহরণ দিই : ভারতে মুসলিমদের উপর কোন অত্যাচার হলে বাংলাদেশের হিন্দুদের তার শোধ দেয়ার ভয় এসে যায় । কথায় বলে “ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়” । যিনি এই কথার আবিষ্কারক তিনি হয়ত এটুকু ভেবে দেখেননি যে সেই পাটকেল সময়ভেদে প্রতিবেশীকেই খেতে হয় । অনেকটা বাড়ির ঝিকে মেরে বউকে শিখানোর মত । হিন্দুদের একাংশ কেবল “জয় রামজি কি”, অপরদিকে মুসলিমদের একাংশ “নারাইয়ে তকবির, আল্লাহু আকবর” বলে ভেড়ার পালের মত সামনের জনকে দেখে দাঙ্গা হাঙ্গামা করতে জানে কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের মোটা মাথায় এটুকু বিবেচনাবোধ আসেনি যে এই রক্তের হোলি খেলায় তাদের কি লাভ হল ? তাদের সমস্যার আদৌ কি কোন সমাধান হল নাকি পরিস্থিতি আরো জটিল হল । তাদের এসব ভাবার সময় কোথায় বলুন ? তারা তো ধর্মকে সামনে রেখে অধিকার আদায়ে ব্যাস্ত যা আজো তাদের বক্তব্যমতে অর্জিত হয়নি।

বইটিতে লেখক ভারত বিভাগের যথাযথ বিকল্প হিসেবে নিজের করা প্রস্তাবের উতকৃষ্টতার কথা বলেছেন । আমিও তার সাথে একমত যে তার প্রস্তাব আর যাই হোক দেশবিভাগ থেকে শতগুণ ভাল ছিল । হ্যা, তার প্রস্তাব বাস্তবায়ন পরবর্তীতে সময়ের চাহিদায় কিছু না কিছু সমস্যার উদ্ভব হয়তো হতো । কিন্তু সেসবের সমাধানে দেশভাগের মত উচ্চমূল্য পরিশোধ করার সম্ভাবনা কম থাকত ।

তিনি নিজের বইতে দেশ বিভাগ নিয়ে নিজের কষ্টের কথা লিখেছেন, খোলাখুলিভাবেই গান্ধীজি , জহরলাল নেহেরু সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল প্রমুখের দেশভাগ সমর্থনের প্রতি নিজের দ্বিমতের কথা ।ক্ষোভ জানিয়েছেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সর্দার প্যাটেল এর প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতায়, গান্ধীজির মৃত্যুর পর তার এই নীরবতায় তার বিপদের কারণ হয়ে দাড়ায় । তার সাথে আমিও একমত যদি গান্ধীজি যদি দেশভাগ নিয়ে বেকে বসতেন তবে হয়ত আজ এই বাস্তবতা দেখতে হতোনা ।কিন্তু দুর্ভাগ্য তিনি তা করেননি ।

তার রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ছিল চোখে পরার মত । তিনি ৭১ এর যুদ্ধ হওয়ার আগেই তিনি তার বইতে বলেছেন যে পাকিস্তানের স্থায়ীত্ব নিয়ে সংশয়ে ছিলেন । যা পরবর্তীতে সত্য হয় ।পাকিস্তান থেকে জন্ম হয় বাংলাদেশের । তার সমগ্র বইটি ব্যাপক তথ্যে ঠাসা । ধরে ধরে সব তথ্য নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয় । আমি কেবল গুরুত্বপূর্ণ কয়েটি বিষয়ের কথা বললাম ।

পুরো লিখাটি পড়ার পর অনেকেই হয়ত ভাববেন দেশ বিভাগের মূলে ছিল হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ, দাঙ্গাহাঙ্গামা । তাই দেশ বিভাগ ছাড়া হয়ত এর আর কোন সমাধান ছিলনা । তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলছি মাথা ব্যাথার সমাধান মাথা কেটে ফেলা নয় । এত সমস্যা আরো জটিল হয়, সমাধান হয়ে পরে দুরুহ , সময়ের ফেরে রীতিমত অসম্ভব । আর ঠিক তাই হল এই দেশভাগে । দেশভাগে লাভ কিছু হয়নি বরং তা হিন্দু মুসলিম সু সম্পর্ককে রীতিমত কবরস্থ করেছে, দুই সম্প্রদায়ের মাঝে তুলে দিয়েছে অবিশ্বাস এবং সংশয়ের দেয়াল । ভারত এবং পাকিস্তানের সামরিক খাতের ব্যায় এই বক্তব্যের যথাযথ উদাহরণ ।

তবে এই কথা অবশ্যই বলব যে অনেকের হয়ত লেখকের ব্যাক্তিগত মন্তব্য পড়ে খারাপ লাগতে পারে । কিন্তু এটুকু সত্য বইটি বাস্তবিকই বড্ড অসাধারণ । মন দিয়ে বইটি পড়লে সময় এবং ব্যায় করা অর্থ দুয়েরই ১৬ আনার পরিবর্তে ৩২ আনা, স্থানভেদে রীতিমত ৬৪ আনা লাভ হয় ।

লেখক পরিচিতিঃ
লিখেছেনঃ Joyraj Hore

এমন আরও বইয়ের নিয়মিত রিভিউ পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। প্রতি সপ্তাহের শনি এবং মঙ্গলবারে আমাদের বুক রিভিউ সিরিজের লিখা পাবলিশ হয়ে থাকে। আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে ও লাইক দিয়ে রাখুন ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: