Header Ads

বই রিভিউঃ মহাভারত (৩য় পর্ব)

বই রিভিউঃ মহাভারত (৩য় পর্ব)

বই : মহাভারত,
লেখক : কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস 
সারানুবাদ : রাজশেখর বসু

যুদ্ধকালীন মহাভারত বিশ্লেষণ


অবশেষে বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা । অগ্রহায়ণ মাসের অমাবস্যায় শুরু হল মহাভারতের যুদ্ধ । সমগ্র মহাভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই যু্দ্ধ । আমার আজকের রিভিউ এই যুদ্ধ সম্পর্কে ।

বিদুর, কৃষ্ণ, দ্রোণ, ভীষ্ম, কৃপাচার্য প্রভৃতি ব্যাক্তিগণ যুদ্ধকে আটকানোর অনেক প্রচেষ্টা করা সত্বেও যুদ্ধের দামামাকে আটকাতে পারেননি । কৃষ্ণ ছিলেন কুরু এবং পান্ডব উভয়পক্ষের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল । তাই তিনি তাঁর সাধ্যমত শেষ চেষ্টাটুকু করেছিলেন যুদ্ধ আটকানোর যদিও এই চেষ্টার বিপরীতে তিনি দুর্যোধন এবং তাঁর মিত্রদের নিকট অপদস্থ হন এমনকি তাঁরা নিজেদের আত্মসম্মানবোধকে শিকেয় তুলে তাঁকে বন্দী করারও প্রচেষ্টা চালায় । অথচ সেই কৌরবরাই আবার যুদ্ধের আগে বুদ্ধিমান কৃষ্ণকে (কৃষ্ণ দ্যূত হিসেবে কুরু রাজ্যে আসার পূর্বে) তাঁদের দলে ভিড়াতে চায় । দুর্যোধনপন্থীদের যে নূন্যতম লজ্জাবোধ বলতে কিছু ছিলনা এটিই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

যুদ্ধের শুরুতে কুরুপক্ষের বয়োবৃদ্ধদের প্রতি পান্ডবদের ভদ্রতা প্রদর্শন একটি নজির হয়ে থাকবে । কারণ যুদ্ধ সচরাচর হয় হিংসার বশবর্তী হয়ে, প্রতারিত হওয়ার দু:খ থেকে, অনৈতিকভাবে ভোগের বাসনা থেকে । তাই যুদ্ধ শুরুর পূর্বে এমন সম্মান প্রদর্শন, উৎকৃষ্ট ভদ্রতার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতেই পারে ।

যুদ্ধের শুরুতেই আত্মগরিমায় এবং ক্ষমতার দর্পে আকণ্ঠ নিমজ্জিত কৌরবপক্ষের মাঝে এমন একটি ধারণা পাকাপোক্তভাবে বিরাজমান ছিল যে তাঁরা জিতবে । যদিও দ্রোণ, ভীষ্ম, বিদুর, কৃপাচার্য এই বক্তব্যের অন্তর্গত নন । তাঁরা এই মর্মে বিশ্বাসী ছিলেন যে, যে পক্ষে কৃষ্ণ স্বয়ং উপস্থিত থাকবেন যুদ্ধে তাঁদেরই জয় হবে । তবে কৌরবপক্ষের এমন ভাবার যৌক্তিক কারণও ছিল । কৃষ্ণের সমান বলবান দশ কোটি সেনা তাঁদের দলে ছিল, ছিল কৃষ্ণের বিকল্প বুদ্ধিমান হিসেবে শকুনির অবস্থান, অর্জুনের বিকল্প হিসেবে কর্ণ এবং অশ্বত্থামার অবস্থান, সেই সাথে কৌরবদের সেনাধিক্য ।

তবে ভীষ্ম বনাম কর্ণ এই বিরোধের কারণে কর্ণ, ভীষ্মের জীবিত থাকাবধি যুদ্ধে অংশ নেননি । কিন্তু দুর্যোধনের আচরণে শুরু থেকে একটি বিষয় অনেকটাই অনুমেয় ছিল যে ভীষ্ম এবং গুরু দ্রোণের উপর যুদ্ধের শুরু থেকেই তিনি যথাযথ আস্থা রাখতে পারেন নি। পরবর্তীতে তাঁদের প্রতি করা তাঁর নানা মন্তব্যে এর সত্যতা মিলে । কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শুরু থেকেই কৌরবদের শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ছিল তাঁদের অন্যতম দুর্বল জায়গা । তাঁদের দুই মহারথী ভীষ্ম এবং দ্রোণের পান্ডবদের প্রতি একতরফা সমর্থন এই বিরোধ সৃষ্টির মূল কারণ । তাঁরা যে কেবলই অন্নদায়ের কারণে যুদ্ধে পান্ডবদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তা তাঁদের নানা বক্তব্য পড়লে স্পষ্টভাবে বোধগম্য হয় । একথা বললে অত্যুক্তি হবেনা যে দুর্যোধনের ন্যায় দুর্যোধনপন্থীদেরও ভীষ্ম এবং দ্রোণের উপর অগাধ আস্থা ছিলনা ।

অনেক হিন্দুরা এই ভাবেন যে মহাভারতের যুদ্ধে ধৃতরাষ্ট্রের সকল পুত্র নিহত হন । কিন্তু তথ্যটি সঠিক নয় । যুযুৎসু নামক ধৃতরাষ্ট্রের একজন পুত্র ছিলেন । যিনি বৈশ্যার গর্ভে জন্ম নেন । যুদ্ধের শুরুতেই তিনি কৌরব পক্ষ ত্যাগ করে পান্ডব পক্ষে যোগ দেন এবং শেষ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন । সঠিকভাবে বলতে গেলে এভাবে বলা যায় যে, মহাভারতের যুদ্ধে কেবল গান্ধারীর গর্ভে জন্ম নেয়া ধৃতরাষ্ট্রের সকল পুত্র নিহত হন ।

মহাভারতের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে দুর্যোধনের অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু এবং বীর যোদ্ধা কর্ণকে নিয়ে পান্ডবরাও একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছিল । আর তাই কৃষ্ণের সমশক্তিসম্পন্ন শল্য (পান্ডুর ২য় স্ত্রী মাদ্রীর ভ্রাতা, সম্পর্কে নকুল এবং সহদেবের মামা। পরবর্তীতে যুদ্ধে তিনি যুধিষ্ঠিরের হাতে নিহত হন।) যখন কৌরবপক্ষে যোগ দেন তখন যুধিষ্ঠির এই মর্মে তাঁর থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করেন যে, শল্য কর্ণের রথের সারথি হবেন এবং কর্ণকে নানা কটু কথা বলে তাঁর মনোসংযোগকে বিচ্যুত করবেন । পান্ডবরা অর্জুনকে নিয়ে এবং অর্জুন নিজেকে নিয়ে যে গর্ব করতেন তার অভ্যন্তরেও যে নিদেনপক্ষে সরিষা দানা পরিমাণ সংশয় লুকিয়ে ছিল যুধিষ্ঠিরের এই যুদ্ধপূর্ব পরিকল্পনা তারই প্রমাণ ।

তবে এটুকু সত্য দাম্ভিকতার দিক দিয়ে অর্জুন এবং কর্ণ কে কাকে কতটুকু অতিক্রম করেছিলেন বা আদৌ করেছিলেন কিনা তা বিস্তর গবেষণার বিষয় । তেমনি যুদ্ধের পূর্বে অর্জুন পিতা দেবরাজ ইন্দ্র কর্তৃক কর্ণের কবচ এবং কুন্ডল দান হিসেবে গ্রহণের ফলে যুদ্ধের পূর্বেই পান্ডবগণ কর্ণকে কিছুটা দুর্বল করে ফেলতে সক্ষম হন ।

যদি সেই কবচ নেয়া না হতো তবে কর্ণকে অর্জুনের পক্ষে আদৌ হারানো সম্ভব হত কিনা তা বিস্তর সন্দেহের জন্ম দেয় । আমরা আবেগের বশে যতই অর্জুনের সুনাম করিনা কেন ভুলে গেলে চলবেনা যে কর্ণও অর্জুনের চেয়ে কোন অংশে সাহসিকতা এবং দক্ষতায় কম ছিলেননা । বরং কর্ণের পিতা সূর্যদেব কর্তৃক তাঁকে প্রদও কবচ তাঁর মৃত্যুর নিশ্চয়তাকে সম্পূর্ণ রূপেই ঠেকিয়ে রেখেছিল ।

অর্জুনের দিব্যাস্ত্র এক্ষেত্রে কতটুকু সফল হতো তাও সন্দেহের বিষয় । কর্ণ ইন্দ্রের নিকট থেকে যে অস্ত্র তাঁর কবচের বিপরীতে নিয়েছিলেন তা যদি কৃষ্ণের ধূর্ততার ( আমি এটিকে বুদ্ধিমত্তা কেন বললাম না তা পরবর্তীতে বলছি ) দ্বারা ভীমপুত্র ঘটোৎকচের উপর প্রয়োগ না করাতেন তবে আমাদের পক্ষে যুদ্ধে পান্ডবদের বিজয়ী দেখার সম্ভাবনা খুব কমই ছিল । কিন্তু কৃষ্ণ যদি নিয়মবহির্ভূতভাবে তাঁর সুদর্শন চক্র নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নেমে পরতেন তবে পরিস্থিতি যে রাতারাতি বদলে যেত তা সত্য । তবে কৃষ্ণ যে এমন চেষ্টা করেননি তা কিন্তু নয় , তবে তিনি বেশী দূর এগোননি । যদি এগোতেন তবে পান্ডবপক্ষের জন্য মহাভারতের যুদ্ধ জয় তাঁদের কাঁধের উপর অপমানের পাহাড়সম বোঝা চাপিয়ে দিত ।

অপরদিকে ইন্দ্র যদি কর্ণকে বিশেষ অস্ত্র প্রদানের সময় এই শর্ত না দিতেন যে এই অস্ত্র কেবল একবারই প্রয়োগ করা যাবে তবে অর্জুনের মৃত্যু ছিল অবধারিত । যদি অর্জুনের নিকট সেই অস্ত্রের যোগ্য প্রত্যুত্তর থাকত তবে আর যাই হোক কৃষ্ণ যুদ্ধাবস্থায় ঘটোৎকচকে অর্জুনের পরিবর্তে এই অস্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিতেন না ।

মহাভারতে মোট ১৮ দিনের যুদ্ধ হয় । তবে এই যুদ্ধের ১৩ তম দিন থেকে অর্থাৎ যেদিন অর্জুন পুত্র অভিমন্যু নিহত হন সেদিন থেকেই মূলত মহাভারতের যুদ্ধে কৌরব এবং পান্ডবদের দৃশ্যমান যুদ্ধকালীন অনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয় যেমন: ছলনা, মিথ্যা তথ্য দেয়া, নিরস্ত্র অবস্থায় প্রহার, নিয়মবহির্ভূত প্রহার, কূটচাল, অস্ত্রের অপপ্রয়োগ, অপমান ইত্যাদি ।

এবার আসি কৃষ্ণের প্রসঙ্গে । যদি মহাভারতের যুদ্ধকে খুব ভালভাবে বিচার বিশ্লেষণ করা হয় তবে যে কোন পাঠকের এটি বোধগম্য হবে যে যুদ্ধে কৌবরদের বড় ভুল ছিল কৃষ্ণের বুদ্ধিমত্তাকে ছোট করে দেখা । একটি উদাহরণ দিই । দুর্যোধন যখন কৃষ্ণের নিকট যুদ্ধক্ষেত্রে সাহায্য প্রার্থনার জন্য উপস্থিত হলেন সেসময় কৃষ্ণ চোখ বন্ধ অবস্থায় ছিলেন তবে তিনি জানতেন যে দুর্যোধন এসেছেন । কিন্তু তিনি ঠিক তখনই চোখ খুললেন যখন অর্জুন এসে তাঁর পায়ের নিকট বসলেন ।

আমার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে কৃষ্ণের এইরুপ আচরণের মূল কারণ তিনি মন থেকেই অর্জুনকে প্রথম ইচ্ছে প্রকাশের সুযোগটুকু দিতে চেয়েছিলেন । একদিকে দুর্যোধনের চেয়ে অর্জুন বয়সে ছোট , দুর্যোধন কর্তৃক কৃষ্ণের মস্তকের পিছনে বসা (এতে দুর্যোধনের পক্ষে কৃষ্ণের প্রথম দৃষ্টিপ্রাপ্তির সম্ভাবনাটুকু শেষ হয়ে যায়) এবং কৃষ্ণের প্রতি অত্যধিক ভক্তিবসত অর্জুন কর্তৃক কৃষ্ণের পায়ের নিকট বসা (যার ফলে কৃষ্ণ চোখ খুলা মাত্রই অর্জুনকে দেখেতে পান), এসকল কমর্কান্ডের ফলে কৃষ্ণের পক্ষে তাঁর সামগ্রিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অনেকটাই সহজ হয়ে যায় ।

সমগ্র মহাভারতে অর্জুন এবং কর্ণ যতই দাম্ভিকতার প্রদর্শন করুক না কেন কোন এক রহস্যময় কারণে কৃষ্ণের সাথে তাঁরা যথেষ্ট ভদ্র ব্যবহার করেছেন , তাঁর প্রতি কোনরুপ গরিমা প্রদর্শন করেছেন এমন ঘটনা দেখা যায়না । কৃষ্ণ যে শুরু থেকেই পান্ডব পক্ষের ছিলেন কৌরবরা তা জেনেও তেমন পাত্তা দেয়নি । তাঁরা বরং কৃষ্ণের সমশক্তির ১০ কোটি সৈন্য পেয়েই খুশিতে আটখানা হয়ে যায়, কিন্তু তাঁদের এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল যে বাহুবলে কৃষ্ণের সমশক্তি সম্পন্ন হওয়া এবং বুদ্ধিমত্তায় কৃষ্ণের সমকক্ষ হওয়া সমার্থক নয় ।

যুদ্ধে জিততে গেলে কেবল বাহুবল নয় বুদ্ধিমত্তারও প্রয়োজন হয় । তাঁদের এই বাহুবল নির্ভর চিন্তাধারাই যুদ্ধে তাঁদের পরাজয়ের কারণ হয় যদিও তাঁরা মোট সৈন্য সংখ্যায় পান্ডবদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন । যুদ্ধের শুরু থেকেই কৃষ্ণ উভয়পক্ষের নিকট একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন ।

অর্জুন পুত্র অভিমন্যূ হত্যা সম্ভব হয় জয়দ্রথের শিব থেকে প্রাপ্ত একদিন মেয়াদকাল সম্পন্ন বিশেষ শক্তির জোরে । যা তিনি কঠোর তপস্যার দ্বারা লাভ করেছিলেন । আর সেই শক্তির বলেই তিনি পান্ডবদের চক্রব্যূহে প্রবেশ করা থামিয়ে দিতে পেরেছিলেন । কৌরবদের ছলনার পর এলো পান্ডবদের ছলনার পালা । যথারীতি এই ক্ষেত্রেও কৃষ্ণ সফল । তিনি তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সূর্যকে ঢেকে ফেলে কৃত্রিম সূর্যাস্তজনিত আবহের সৃষ্টি করলেন ।

যদিও একটি প্রশ্ন নিজ থেকেই সামনে এসে যায় যে , ছলের বিপরীতে ছল কতটুকু গ্রহণযোগ্য ? তেমনি আবার এমন যুক্তিও দেয়া যায় যে , ছলের আশ্রয় না নিলে সে সময়ের সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় জয়দ্রথকে কোনভাবেই বধ করা সম্ভব হতোনা । এ বিষয়টি কতটুকু ধর্মসঙ্গত বা ধর্মসঙ্গত নয় ব্যাক্তিভেদে এই প্রশ্নের উওর ভিন্ন আসতে বাধ্য । তবে এটুকু সত্য পান্ডবদের দিক থেকে তখন ছলনার সূচনা হলো মাত্র ।

ইন্দ্র পুত্র অর্জুনকে বাঁচানোর জন্য যখন আর কোন রাস্তা খোল ছিলনা তখন কৃষ্ণ ঘটোৎকচকে সেই অস্ত্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন । যদি তিনি কেবল যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের কথা ভেবে এই কাজটি করতেন তাহলেও সামগ্রিক ঘটনাটিতে একটি ভদ্রস্থ রুপ থাকতো । কিন্তু কৃষ্ণের নিজ আচরণেই এ ঘটনাটি ভদ্রতার মাপকাঠিতে তলানিতে গিয়ে পরে । ঘটোৎকচ তাঁর মৃত্যুর পূর্বে পান্ডব পক্ষের হয়ে কৌরবদের বিপুল সৈন্য বিনষ্ট করেন এমনকি কর্ণের অস্ত্রাঘাতে মারা যাওয়ার পর তাঁর দেহ কৌরব সৈন্যদের উপর ভূপাতিত হয়ে তাঁদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে ।

কিন্তু এত অবদানের পরও তাঁর ভাগ্যে কৃষ্ণের দিক থেকে কোনরুপ সম্মান জুটেনি । বরং তাঁর মৃত্যুর পরবর্তীতে কৃষ্ণ আনন্দে আটখানা হয়ে অর্জুনকে আলিঙ্গন করলেন । অশ্বের লাগাম সংযত করে তিনি মনের আনন্দে রথের উপর নৃত্য শুরু করলেন এবং বারবার তাল ঠুকে গর্জন করলেন !!! তদুপরি অর্জুনকে বললেন: “কর্ণ যদি ঘটোৎকচকে বধ না করতেন তবে আমিই ঘটোৎকচকে বধ করতাম, কিন্তু তোমাদের প্রীতির জন্য তা করিনি । এই রাক্ষস (ঘটোৎকচ) ব্রাহ্মণদ্বেষী যজ্ঞদ্বেষী ধর্মনাশক পাপাত্মা, সেজন্যই কৌশলে তাকে নিপাতিত করিয়েছি , ইন্দ্রের শক্তিও ব্যয়িত করিয়েছি । আমিই কর্ণকে বিমোহিত করেছিলাম, তাই তিনি তোমার জন্য রক্ষিত শক্তি ঘটোৎকচের উপর নিক্ষেপ করেছেন ”।

উপকারীর কাছ থেকে উপকার পাওয়ার পর তাঁর প্রতি এমন ব্যবহার কোনভাবেই সুখপ্রদ নয় । সরাসরি দেবতাদের কোন ক্ষতি না করা পর্যন্ত কৃষ্ণের ঘটোৎকচ সম্পর্কে এমন মন্তব্য কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা বিবেচনার বিষয় । ঘটোৎকচকে মেরে ফেলার পিছনে তাঁর দেয়া যুক্তিটিকেও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়নি । কারণ হিংসা মনের মাঝে পালন করা এবং সেই হিংসাকে বাস্তবায়িত করা সমার্থক নয় । আর তাই আমি পূর্বে কৃষ্ণের এই পদক্ষেপকে তাঁর বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তে ধূর্ততা হিসেবে উল্লেখ করেছি ।

ভীষ্মের মৃত্যু পরবর্তী গুরু দ্রোণের মৃত্যুর সময় ধৃষ্টদ্যূম্ন কর্তৃক গুরু দ্রোণের প্রতি করা আচরণ, দুর্যোধন কর্তৃক দ্রৌপদীর সাথে দ্যূতসভায় করা আচরণের চেয়ে কোন দিক থেকে ভদ্রস্থ হয়েছে বলে অন্ত:ত আমি মনে করিনা ।

এটি অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে দ্যূতসভায় দ্রোণের ধর্ম সংশয় ছিল বেমানান , তাঁর নীরবতাও যুক্তিসঙ্গত অপরাধ হিসেবে বিবেচনার যোগ্য । কিন্তু সেই অপরাধের জন্য যদি হত্যার পূর্বে নিজের প্রাক্তন শিষ্য দ্বারা গুরুর (ধৃষ্টদ্যূম্ন অস্ত্র শিক্ষা পেয়েছিলেন গুরু দ্রোণের নিকট থেকে, ধৃষ্টদ্যূম্ন সম্পর্কে দ্রৌপদীর ভাই) মাথার চুল হাত দিয়ে মুঠো করে ধরতে হয় তবে গুরুর জীবনে এর চেয়ে বড় কলঙ্ক আর কি হতে পারে ? শিষ্যওবা কি করে গুরু হত্যার কৃতিত্ব এভাবে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে? শিষ্যের পক্ষে কি এমন কাজ করা অপমানজনক নয়?

চুল না ধরেও তো দ্রোণের শিরচ্ছেদ করা যেত । হত্যার পূর্বে গুরুর মস্তকের চুল ধরে কি ধৃষ্টদ্যূম্ন ঘৃণার যোগ্য অপরাধ করেননি ? তদুপরি গুরুর খন্ডিত মস্তক ছুড়ে দিলেন কুরু সৈন্যদের মাঝে তাদেরকে ভীত করার জন্য !!!! কতটুকু ক্রোধ, হিংসা, প্রতিশোধপরায়ণতা, খুনে মানসিকতা মনের মাঝে পুষে রাখলে একজন মানুষ এতটা নোংরা হতে পারে তা ধৃষ্টদ্যূম্নের কৃতকর্ম দেখেলেই বোঝা যায় ।

ভীষ্ম তাঁর মৃত্যুর উপায় পূর্বেই বলেছিলেন তাই তাঁর মৃত্যু অনেকটাই ভদ্রস্থভাবে হয়েছে অন্ত:ত গুরু দ্রোণের মৃত্যুর তুলনায় তো বটেই । তবে দ্রোণের মৃত্যুকালকে দ্রুততর করার জন্য যুধিষ্ঠিরের বলা অশ্বত্থামার মিথ্যা মৃত্যু সংবাদও কম দায়ী নয় । তিনি উচ্চ স্বরে গুরু দ্রোণকে বলেছিলেন , “অশ্বত্থামা হত:” – অশ্বত্থামা হত হয়েছেন, তারপর অষ্ফুটস্বরে বললেন, “ইতি কুঞ্জর:” – এই নামের হস্তী । এই মিথ্যা বলার ফলে যুধিষ্ঠিরের রথের চাকা মাটি ছুঁতে শুরু করে যা পূর্বে মাটি থেকে চার আঙ্গুল উপরে অবস্থান করত । যথারীতি ছলের পরিকল্পনায় এবারও কৃষ্ণ সফল ।


মহাভারেতর ১৭ তম দিনের যুদ্ধ । অর্জুনের হাতে মৃত্যু হল কর্ণের । পরশুরাম প্রদও অস্ত্র কর্ণ যুদ্ধের সময় ভুলে যান, কারণ পরশুরামের নিকট নিজের বংশ পরিচয় লুকিয়ে তিনি অস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে কর্ণের এই প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে পরশুরাম তাঁকে এই মর্মে অভিশাপ দেন যে, “যুদ্ধে প্রয়োজনীয় সময়ে তিনি তাঁর অস্ত্রকে আহ্ববান করার বিদ্যা ভুলে যাবেন”। অপরদিকে পূর্বে এক ব্রাহ্মণের দেয়া অভিশাপে কর্ণের রথের চাকা মাটিতে ঢুকে যায় ।

কর্ণ তার রথের চাকাকে মাটি থেকে বের করে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করবেন এবং এটুকু সময় পর্যন্ত অর্জুনকে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে একটি অদ্ভুত হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন । এতকাল ধর্ম কথা ভুলে বিদায়বেলায় কর্ণের তা স্মরণে এলো এবং অর্জুনকেও তা স্মরণ করার উপদেশ দিলেন !!! তবে অর্জুন সে প্রস্তাব মেনে নেননি । শতহোক পুত্রশোকে আক্রান্ত পিতার হৃদয় বলে কখা । অত:পর অর্জুনের ছোঁড়া তীর কর্ণের মস্তকে বিদ্ধ হলে তিনি অস্ত যাওয়া সূর্যের ন্যায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন ।

১৮তম তথা মহাভারতের যুদ্ধের শেষ দিনে ভীমের গদার আঘাতে দুর্যোধনের জীবন প্রদীপ নিভে গেল । দ্যূতসভায় ভীম দুর্যোধনের ঊরু ভেঙ্গে তাঁকে হত্যা করার সংকল্প করেন এবং যুদ্ধের অন্তিম দিনে এই কাজ করে নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করলেন । তবে ভীম কর্তৃক দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করে তাঁকে হত্যা করা ছিল গদাযুদ্ধের নিয়মবিরুদ্ধ (গদাযুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী নাভির নিচে গদা প্রহার করা যায়না) । আর তাই বলরাম ভীমের এমন কাজে ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে লাঙ্গল হস্তে আঘাত করতে এগিয়ে গেলেন ।

সেসময় কৃষ্ণ তাঁকে পথ রোধ করে বললেন: “ নিজের উন্নতি, মিত্রের উন্নতি, মিত্রের মিত্রের উন্নতি; এবং শত্রুর অবনতি, তার মিত্রের অবনতি, তার মিত্রের মিত্রের অবনতি – এই ছয় প্রকারেই নিজের উন্নতি । পান্ডবরা আমাদের স্বাভাবিক মিত্র , তারা আমাদের পিতৃস্বসার (পিসী, অর্থাৎ পিতার বোন) পুত্র, শত্রুরা এঁদের উপর অত্যন্ত পীড়ন করেছে । আপনি জানেন প্রতিজ্ঞারক্ষাই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম । ভীম দ্যূতসভায় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে যুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করবেন , মহর্ষি মৈত্রেয়ও দুর্যোধনকে এইরুপ অভিশাপ দিয়েছিলেন , কলিযুগও আরম্ভ হয়েছে ।অতএব আমি ভীমসেনেরে দোষ দেখিনা । পুরুষশ্রেষ্ঠ পান্ডবদের বৃদ্ধিতেই আমাদের বৃদ্ধি , অতএব আপনি ক্রুদ্ধ হবেননা ”।

নির্মোহভাবে বলতে গেলে মহাভরতের যুদ্ধে কৃষ্ণ ছিলেন অর্জুনের জন্য অনেকটা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের মত, যা তাঁকে কর্ণের দিক থেকে আসন্ন সমগ্র বিপদের সম্ভাবনা থেকে মুক্তি দিয়েছে । যা কিছুই পান্ডবদের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উপক্রম করেছে, কৃষ্ণ তা নিজের যুক্তি এবং বুদ্ধিমত্তার জোরে পান্ডবদের পক্ষে রুপান্তরিত করেছেন অনেকটা একজন বিজ্ঞ আইনজীবির মত । সমগ্র মহাভারতে এটিই কৃষ্ণের মূল কারিশমা ।

মহাভারতের যুদ্ধের শেষ রাত্রে অশ্বত্থামা ঘুমন্ত পান্ডব শিবিরে মহাদেব তথা শিবের নিকট থেকে প্রাপ্ত খড়্গ ব্যবহার করে রীতিমত রক্তাক্ত তান্ডবলীলা চালান। তাঁর হাতে পঞ্চপান্ডবদের সকল সন্তান, ধৃষ্টদ্যূম্ন, শিখন্ডী প্রভৃতি নিহত হন । অশ্বত্থামার এই কাজে তাঁকে সহায়তা প্রদান করেন: কৃপ (কৃপাচার্য) এবং কৃতবর্মা।

তবে এই দুইজন নিজেদের এমন জঘন্য কাজ করা থেকে কি আদৌ বিরত রাখতে পারতেননা? অন্তত এই যুক্তি প্রদান করে যে, তাঁরা রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত শত্রুপক্ষের উপর কাপুরষের মত আক্রমণ করবেননা (তবে এটুকু সত্য যে শুরুতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানটুকু ধরে রাখতে পারেননি) । পাঠকের দিক থেকে এমন প্রশ্ন তোলা কিন্তু অযৌক্তিক নয় । মূলত আহত মিত্র দুর্যোধনের করুণ দশা অশ্বত্থামা সহ্য করতে পারেননি । তাঁর মনে সৃষ্ট প্রতিশোধের আগুন তিনি ঘুমন্ত পান্ডব শিবিরে হামলা এবং তাঁদের হত্যার দ্বারা প্রশমিত করেন ।

পরবর্তীতে তিনি পঞ্চপান্ডবদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ব্রহ্মাশির অস্ত্র প্রয়োগ করেন । অর্জুনও একই অস্ত্র নিক্ষেপ করেন । সেসময় নারদ এবং ব্যাসদেব দুই অগ্নিরাশির মাঝে দাঁড়িয়ে তাদের মুখোমুখি সংঘর্ষকে প্রতিহত করলেন ।পরবর্তীতে অর্জুন তাঁর অস্ত্র প্রত্যাবর্তনে সমর্থ হলেও অশ্বত্থামা ব্যার্থ হন । ফলশ্রুতিতে তাঁর অস্ত্র পান্ডবনারীদের গর্ভে আঘাত হানে । এই অস্ত্রের প্রভাবে অভিমন্যূর স্ত্রী উত্তরা পরবর্তীতে মৃত সন্তান প্রসব করেন, তবে তাঁর সন্তান কৃষ্ণের শক্তির দ্বারা পুনরায় জীবন লাভ করে । মূলত দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামার হাত ধরেই মহাভারতের যুদ্ধে সংঘটিত হওয়া যাবতীয় অধর্মের সমাপ্তি ঘটে ।

আর এভাবেই সমাপ্ত হয় ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে থাকা মহাভারতের যুদ্ধ । যা একপক্ষকে দিয়েছে ক্ষমতার স্বাদ, অন্যপক্ষকে দিয়েছে শতপুত্রের মৃত্যু শোকের যন্ত্রণা । এ্ই যুদ্ধে উভয় পক্ষের হাতাহত এবং আর্থিক ক্ষতি হয় অকল্পনীয়।

আমার গ্রন্থ আলোচনার পরবর্তী পর্বে “যুদ্ধ পরবর্তী মহাভারত” এর বিশ্লেষণ থাকবে ।

পোস্ট লেখা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান এবং দিক নির্দেশনায় : শ্রদ্ধেয় বন্দন দাদা ।

লেখক পরিচিতিঃ
লিখেছেনঃ Joyraj Hore

এমন আরও বইয়ের নিয়মিত রিভিউ পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। প্রতি সপ্তাহের শনি এবং মঙ্গলবারে আমাদের বুক রিভিউ সিরিজের লিখা পাবলিশ হয়ে থাকে। আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে ও লাইক দিয়ে রাখুন ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: