Header Ads

ফতেউ এর ঈশ্বর ও একটি শাটল কক

ফতেউ এর ঈশ্বর ও একটি শাটল কক

ফতেউ এর ঈশ্বর ও একটি শাটল কক
[The embassy of Cambodia, Zadie Smith, Hamish Hamilton, 2013]

পক-স্ম্যাশ-পক-স্ম্যাশ!

উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের সাব-আর্বে, কম্বোডিয়ার এই দূতাবাসটি বাড়িটির থাকা খুব আশ্চর্যজনক না হলেও, একেবারে যে সাধারণ ব্যাপার তাও তেমন মনে হয়না! বাড়িটির চারদিকে উচু পাঁচিল, ভেতরে কিছুই দেখা যায় না। কেবল ফতেউ নামের মেয়েটি যখন সোমবার দিন মনিব কে লুকিয়ে অভিজাত হেলথ ক্লাবে সাঁতার কাটতে যায়, সে দেখে পাঁচিলের ওপাশে অদৃশ্য দুজন ব্যাডমিন্টন খেলছে! একটি সাদা কক একবার এপাশ থেকে ওপাশ, আরেকবার ওপাশ থেকে এপাশ যাচ্ছে হাওয়ায় ভেসে! শব্দ উঠছে, পক-স্ম্যাশ-পক-স্ম্যাশ!

ফতেউ এর ঈশ্বর ও একটি শাটল কক

পক-স্ম্যাশ-পক-স্ম্যাশ!

রবিবার দিন, এক খন্ড অবসর জুটলে, ফতিউ যখন চার্চ-ফেরত কফিশপে যায় অ্যান্ড্রিউ এর সাথে, সে ভেবে চিন্তে প্রশ্ন করে, আচ্ছা, সকলে হলোকাস্ট নিয়ে এত আলোচনা করে, কেউ রোয়ান্ডার কথা কেন বলে না? রোয়ান্ডায় তো আরও বেশী মানুষ মারা গেছে! অ্যান্ড্রিউ তাকে আমেরিকার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে দেশ মাত্র এক সেকেন্ডে এত্ত লোককে ঝলসে দিয়েছিল। ক্যাথোলিক অ্যান্ড্রিউ তাকে বলে, ইহুদীরা ইহুদীদের জন্য কাঁদে, রাশিয়ানরা রাশিয়ানদের জন্য! আমরাও কাঁদি আফ্রিকার জন্য, কিন্তু তাও নাইজেরিয়া খেলায় আইভোরি কোস্ট কে হারিয়ে দিলে আমরা আনন্দে দুলে উঠি! অ্যন্ড্রিউ কফিটেবিলে বসে নাচার ভঙ্গি করলে ফতেউ হাসি চেপে তাকে ছদ্ম-ধমক দেয়। অ্যান্ড্রিউ তাকে আশ্বাস দেয় যে কেবল ঈশ্বরই আছেন যিনি কাঁদেন সকলের জন্য!

পক-স্ম্যাশ-পক-স্ম্যাশ!

রান্নাঘরের মেঝেতে কুড়িয়ে পাওয়া মেট্রোর পাতায় বন্দী স্লেভ দের গল্প পড়ে ফতেউ। মনিব তাদের বেরোতে দেয় না, মাইনে দেয় না, পাসপোর্ট আটকে রাখে! তারা দাস! ফতেউও মাইনে পায় না, তার পাসপোর্টটা কোথায় কে জানে! তবু ফতেউ অনেক ভেবে দেখে তাকে তো মনিবরা বাজার করতে পাঠায় (সব টাকা পয়সা, ফর্দ আর রসিদ অবশ্য হিসেব করে বুঝিয়ে দিতে হয়), সে তো লুকিয়ে সাঁতার কাটতে আর রবিবারে চার্চেও যায়। তার কাছে অবশ্য কোনো পয়সাই নেই, তবুও ফতেউ অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়, না, সে দাস নয়। কিন্তু তাই কি? ফতেউ কে মনিবরা কাজ ছাড়িয়ে দিলে ফতেউ আর যায় কোথায়? স্বাধীনতা তো তারই আছে, যে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিতে পারে! ফতেউ কি আদৌ স্বাধীন?

পক-স্ম্যাশ-পক-স্ম্যাশ!

সাদা ককটিকে ওপাশের জন খুব জোরে ফেরত পাঠালেও, এপাশের জন ঠিক দক্ষতায় আলতো করে আবার ভাসিয়ে দেয়! কোনো সোমবারে ঝোড়ো হাওয়া বইলে, হাওয়া যেন ককটিকে উড়িয়ে নিয়ে ফেলতে চায় পাঁচিলের বাইরে। কিন্ত এপাশের জন তবুও ককটিকে পড়ে যেতে দেয় না, ভাসিয়ে ফেরত পাঠায় অপরজনের কাছে!

পক-স্ম্যাশ-পক-স্ম্যাশ!

ফতেউ এর জীবন, মানুষের জীবন যেন ওই ককটির মত! একদিক থেকে অন্যদিকে অবিরত চলা, ঘুরেফিরে আসা দুই বিপরীত প্রান্ত, ভাল-মন্দ, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রান্ত থেকে। কিন্তু জীবন তবুও ভেসে থাকে, প্রতিবার পড়ে যেতে যেতে ফের কিনারা থেকে উড়াল দেয় মাঝ আকাশে! ফতেউ তার জীবন যাপন করে শান্ত চিত্তে, দৃপ্ত বিশ্বাসে। জীবনের অসহায়তা তাকে এদিক-ওদিক ঠেলে দেয়, তবু সে ভেসে থাকে, সে প্রতিবার উড়াল দেয় বিশ্বাসে ভর দিয়ে।

ফতেউ এর ঈশ্বর ও একটি শাটল কক


জেদাই স্মিথের ছোট্ট (মাত্র উনসত্তর পাতা!) গল্পটি প্রায় একটি উপন্যাসের মত! ফতেউ নামের একটি আফ্রিকান হাউস-মেইডের সতেজতায় আর বিশ্বাসে ভরা জীবনের গল্প! কিন্তু এ ছোট ছোট পরিচ্ছদে বলা এই গল্পে যতটা না উক্ত, তার চাইতে অনুক্ত থেকে যায় আরও বেশী! পাঠকের ভাবার জন্য লেখিকা পাতায় পাতায় সাদা অংশ ছেড়ে যান। পাঠক পড়ে, উপলব্ধি করে আর, বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা ফতেউ এর শান্ত বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের হৃদয় মনে। অল্প কথায় গল্প বলার এক আশ্চর্য শৈলীর নিদর্শন এই বইটি। এমন লেখা পড়লে পাঠকের মন আচমকাই ভাল হয়ে যায়; জীবনের সব কালিমা ছাপিয়ে এক আলোক আভাসিত ভোরের সন্ধান পাওয়া যায়।

জেদাই স্মিথের লেখাটি প্রথম বেরিয়েছিল নিউ ইয়োর্কারের পাতায়। সৌভাগ্যক্রমে, চমৎকার বইটি না কিনেও আপনারা লেখাটি পড়ে ফেলতে পারেন সেখানেই। নীচে এর লিঙ্ক রইল।
http://www.newyorker.com/…/20…/02/11/the-embassy-of-cambodia

লিখেছেনঃ Sekhar Ranendu

লিখাটি ভালো লেগে থাকলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং নিজের বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। নিয়মিত এমন লিখা পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এবং ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: