Header Ads

বই রিভিউঃ টিংকার টেইলর সোলজার স্পাই

বই রিভিউঃ টিংকার টেইলর সোলজার স্পাই

কেমন থ্রিলার পড়তে হয়, কেমন করে থ্রিলার পড়তে হয়- এই লেখাটি তার হদিশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ১৯৭৪ এ নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ তে রিচার্ড লকের করা সমালোচনার খন্ড অনুবাদ।

জন লে ক্যারে-র সদ্য প্রকাশিত বইটি এক অত্যন্ত স্বাদু স্পাই থ্রিলার। গত তেরো বছরে এইটি তার সপ্তম উপন্যাস। ‘টিংকার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ উপন্যাসে যে দক্ষতায় লেখক ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমের অভ্যন্তরে এক খোঁচর বা ডাবল এজেন্টের কানামাছি খেলার গল্প বুনেছেন, তা অত্যন্ত দুর্লভ। এমনকি অত্যুক্তি না করে এও বলা যায়, ব্রিটেনের কনান ডয়েল, গ্রাহাম গ্রিন আর আমেরিকার ড্যাশিয়েল হ্যামেট, জেমস কেন, রে শ্যান্ডলারের সাথে লে ক্যারে-র নাম এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হওয়ার যোগ্য। থ্রিলারের পাঠক সাধারণত দুই প্রজাতির। এক -যাঁরা প্লটকেই প্রধান বিবেচনা করেন, এবং দুই- যাঁরা কাহিনীশরীরের সাহিত্যগুণ আর সমাজবাস্তবতাকে চূড়ান্ত বলে ভাবেন। উপরের বিশ্ববিশ্রুত নামগুলির সমান্তরালে লে ক্যারে-র কলমও এই উভয়গোত্রের পাঠককে তৃপ্ত করার মতো ক্ষমতা রাখে।

‘টিংকার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ উপন্যাসের গতি, বিস্তার, বিবরন ও বিশ্লেষণ চমকে দেওয়ার মতো। ব্রিটিশ সমাজের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে থাকা সিক্রেট এজেন্ট আর আমলাতন্ত্রের বর্ণিল চরিত্রমিছিল অঙ্কনে লেখকের অনুপম দক্ষতাটি প্রণিধানযোগ্য। ঘরে –বাইরে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের রোজনামচা আর তার সাথে সংশ্লিষ্ট ইংলিশ কেতার জীবনযাত্রার নিখুঁত ডিটেইলিং উপন্যাসটিকে যে মাত্রা এনে দিয়েছে, তার তুলনা কমই রয়েছে। লে ক্যারে সেই বিরল গোষ্ঠীর রহস্যলেখক, যাঁরা গল্পের ‘নায়কের’ জীবনে কঠোর পরিশ্রম বুনে দিতে পছন্দ করেন।তাঁর কলমে এজেন্টদের বীরত্বের থেকেও বড় হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধোত্তর ইউরোপের এজেন্সির একঘেয়ে, বিষণ্ণ কিন্তু ফলপ্রসূ কার্যকলাপ। যৌনতা আর রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার মতো পপুলিস্ট উপাদানকে মোটামুটি বর্জন করেও যে এমন শ্বাসরুদ্ধকারী থ্রিলার লেখা যায়, তা লে ক্যারে-র আগে খুব বেশী লেখক দেখাতে পারেননি। যেসব বিশুদ্ধবাদী পাঠক রহস্যকাহিনী বলতে, কেবল হোমসিয় ঘরানার ক্লাসিকাল পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষন-সিদ্ধান্তের কাঠামোতে বিশ্বাস রাখেন, তাঁদের জন্য সুখবর- ‘টিংকার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ -এর অন্তর্মুখী ইন্টেলেকচুয়াল নায়কের অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ শক্তি আর বিশ্লেষণী ক্ষমতা যেকোনো ক্লাসিকাল গোয়েন্দাকাহিনীর মান সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা রাখে। আমার নিজের মতে ‘টিংকার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ -এর পটভূমি ও কাহিনিজগতের বিপুল বিস্তার এবং বহুমাত্রিক জটিলতা লে ক্যারে-র শেষ উপন্যাস ‘দ্যা নাঊভ অ্যান্ড সেন্টিমেন্টাল লাভার’ এর রোম্যান্টিক মাঝারিয়ানা থেকে লেখক ও পাঠক দুপক্ষকেই রেহাই দিয়েছে।

খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে - লে ক্যারে-র সাহিত্যসৃষ্টির ধারাটি, বেজায় অগোছালো ও অনিয়ন্ত্রিত। সমস্ত সফল থ্রিলার লেখকের সেট ফর্মুলা থেকে বহুদূরে, -লে ক্যারে-র কলম বরাবরই কোন নির্দিষ্ট গতে চলতে অস্বীকার করেছে। ১৯৬১-র প্রথম উপন্যাস ‘কল ফর দ্যা ডেড’ আর ১৯৬২-র ‘আ মার্ডার অফ কোয়ালিটি’ পাঠকমানসে দীর্ঘস্থায়ী কোন ছাপ ফেলতে না পারলেও, তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্য স্পাই হু কেম ইন ফ্রম কোল্ড’ লে ক্যারেকে থ্রিলারলেখকদের হল অফ ফেম এ স্থায়ী আসন করে দেয়। গ্রাহাম গ্রিন স্বয়ং বলছেন-‘ ‘দ্য স্পাই হু কেম ইন...’ আমার পড়া সেরা স্পাই থ্রিলার। এতদসত্ত্বেও, পরের দুখানি বই – ১৯৬৫-র ‘ দ্য লুকিং গ্লাস ওয়ার’ এবং ১৯৬৮-র ‘ আ স্মল টাউন ইন জার্মানি’ পাঠক-সমালোচক উভয়ের সমাদরই অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি ‘৭১ এ ‘দ্যা নাঊভ অ্যান্ড সেন্টিমেন্টাল লাভার’ প্রকাশিত হওয়ার পর, লে ক্যারে-র কলমের কালি যে শুকিয়ে এসেছে, এ ধারনাও পাঠকমহলে বদ্ধমূল হতে শুরু করে।

‘টিংকার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ থ্রিলারলেখক হিসেবে লে ক্যারে-র পুনরুত্থানই শুধু নয়, একই সঙ্গে লেখকের প্রিয় চরিত্রচিত্রণের প্রিয় যে কাঠামো, তার বিবর্তনের এক বিস্তীর্ণ ক্যানভাসও বটে।
মোটাসোটা মধ্যবয়সী জর্জ স্মাইলি এতটাই সাধারন, যে ভদ্রলোককে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার বলে কল্পনা করতে রীতিমতো বেগ পেতে হয়। বন্ডসুলভ চাকচিক্য থেকে আলোকবর্ষ দূরে থাকা লন্ডনের এই কেরানীর ভিতর যে অলোকসামান্য মস্তিষ্ক এবং বলিষ্ঠ হৃদয়টির বাস, তা খুব কম মরমানুষেরই রয়েছে। লেখকের কথায় স্মাইলি ব্রিটিশ বনেদিয়ানার শেষ প্রতিভূদের একজন। ভিক্টোরিয়ান বাবুয়ানা বা জেমস বন্ডের সপ্রতিভ শোম্যানশিপে নয়, স্মাইলির বনেদিয়ানা প্রোথিত রয়েছে ভদ্রতা আর আভিজাত্যের শিকড়ে। এই আভিজাত্য ও তাঁর মেধাই, স্মাইলিকে শিখিয়েছে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সন্দিহান হতে। গুপ্তচর সংস্থার কর্মী স্মাইলির চরিত্রটি একাধারে বিশ্বজোড়া মানবিক অধঃপতনের এক বিষণ্ণ সাক্ষী এবং অন্যতম সহযোগীও বটে। স্মাইলির মুখে খুব সচেতন ভাবেই লেখক বসিয়েছেন-‘ অত্যুপযুক্ত কিন্তু স্বল্পবেতনের একদল লোকের উৎসাহী আনাড়িপনা আজ সরকারি মহলে আমলাতন্ত্রের ভিত শক্ত করেছে।

এমন একটি চরিত্র যেকোনো উপন্যাসেই অপরিসীম নাটকীয়তা আর সমাজবাস্তব চিত্রের আমদানি করতে সক্ষম। দ্বিধাহীন ভাবে বলা যায়, লে ক্যারে সে সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন।চরিত্রের এই কাঠামোটি লে ক্যারে-র প্রথম দুই উপন্যাসে অতি অস্পষ্টতায় ভর করে এসেছে, প্রায় অলক্ষ্য তাদের বৈশিষ্ট্য। ‘দ্য স্পাই হু কেম ইন ফ্রম কোল্ড’ -এর নায়ক আলেক্স লীমাসের একশ আশি ডিগ্রি উল্টোদিকে গড়ে উঠেছে ‘টিংকার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ এর নায়ক স্মাইলির চরিত্র।লীমাস ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী এক আগ্রাসী স্বর। চরবৃত্তির পেশা ও প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিমুহূর্তে প্রশ্ন করে চলাই যার প্রবৃত্তি। আর স্মাইলি এক নিরীহ কর্মচারী, প্রতিষ্ঠানযন্ত্রের এক ইস্ক্রুপ। সেখান থেকে কাহিনীর এগিয়ে চলার পথে লেখক তাকে সিস্টেমের বাইরে বের করে এনেছেন। তখন তিক্ততায় ভরে গিয়ে স্মাইলির চরিত্র প্রশ্ন করতে শিখছে, ঘুরে দাঁড়াতে শিখছে।

ঊপন্যাস যত এগোয়, স্মাইলির নিরপেক্ষতার মোহ ক্রমশ জীর্ণ হতে থাকে। শুরু হয় নিজের সাথে, প্রতিষ্ঠানের সাথে এক নৈতিক ও বৌদ্ধিক দ্বন্দ্ব।সাত নম্বর উপন্যাসে লে ক্যারে এখন অনেক বেশী আত্মবিশ্বাসী, অনেক বেশী দক্ষ। একের পর এক সুগ্রন্থিত সাবপ্লটে, অতীত-বর্তমানের পরিসরে অনায়াস বিচরণে লেখক অনুপম কৃতিত্বের পরিছয় দিয়েছেন। চরিত্রচিত্রণেও লেখক অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সমাজের সর্বস্তর থেকে উঠে আসা চরিত্রমিছিলে ঠাঁই পেয়েছে ক্যাবিনেট মন্ত্রী, স্পাই, অফিস আর্দালি, সাংবাদিক, ডাবল এজেন্ট, এমনকি স্মাইলির নিজের ঠগিনী স্ত্রীও।

সিদ্ধান্ত হিসেবে একটা কথা বলাই যায়। শেষ উপন্যাস ‘দ্যা নাঊভ অ্যান্ড সেন্টিমেন্টাল লাভার’ এ লে ক্যারে আধুনিকতা ও সোশ্যাল আয়রনি নিয়ে কাহিনী নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন।কিন্তু সে পরিমান সাহিত্যিক অন্তর্দৃষ্টি তাঁর নেই। কিন্তু যখন তিনি ‘টিংকার, টেইলর, সোলজার, স্পাই’ তে সমাজের উপরিতল থেকে সমস্যাগুলোকে নির্দিষ্ট করে তা নিয়ে থ্রিলার রছনা করেছেন, তিনি লা জবাব।

লেখক পরিচিতিঃ
লিখেছেনঃ অভিক দত্ত

এমন আরও বইয়ের নিয়মিত রিভিউ পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। প্রতি সপ্তাহের শনি এবং মঙ্গলবারে আমাদের বুক রিভিউ সিরিজের লিখা পাবলিশ হয়ে থাকে। আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে ও লাইক দিয়ে রাখুন ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: