Header Ads

বই রিভিউঃ অন্ধের স্পর্শের মতো

বই রিভিউঃ অন্ধের স্পর্শের মতো

বইঃ অন্ধের স্পর্শের মতো 
লেখকঃ শঙ্খ ঘোষ

আমি একটা মাত্র কারণেই আমার এই সামান্য লেখাটিকে ‘পাঠ-প্রতিক্রিয়া’, ‘বুক রিভিউ’, কিংবা এরকম কোন ফরম্যাল নামের আধারে বেঁধে ফেলতে চাই না। তার একটাই কারণ, এই লেখা অনেকটাই আমার অনধিকার চর্চা। প্রথমত, বলতে দ্বিধা নেই, এই লেখার পিছনে প্রধান অনুঘটক, আজকের রিটন দাদার পোস্ট। বইটি আমি পড়ে ফেলেছি সপ্তাহখানেক আগেই, কিছু লেখার কথা ইচ্ছা হয়নি, কারণ সেই অনধিকার চর্চা। প্রধানত, শঙ্খ ঘোষের আর কোন বইই আমি পড়িনি। তাই তুলনা, প্রতিতুলনা, ইত্যাদি যে বিষয় একটি বুক-রিভিউ কে ‘লেখা’র মাত্রা দেয়, সেই কিছুই আমি করতে পারব না। তবুও, ভূমিকার পরে সামান্য কিছু কথা।

বইটির ব্যকলিফে, শঙ্খ ঘোষ যে কথা গুলো লিখেছেন, সেই কথাগুলিই বইটির সংক্ষিপ্তসার হিসাবে বলা যায়।

‘আমরা অনেক সময়েই সকলের করা কাজটাকে বলতে শুরু করি ‘আমার কাজ’। ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত এই আমি তখন হয়ে ওঠে এক ঘোষণা শব্দ, চিৎকার-শব্দ, যার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে অবারণ একটা জোর দিয়ে বলবার প্রতাপভঙ্গি। আর সেই চোরাপথে এগিয়ে আসে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ আমাদের স্বভাবের একটা অনিয়ন্ত্রিত চিৎকার’

বলুন তো, এরপর, আমার মত অর্বাচীনের আর কিছুই বলা সাজে?

নাটকের ক্ষেত্রে যেমন প্রথম দৃশ্য সেট করে দেয় ‘মুড’ বা ‘টোন’, ঠিক তেমন ভাবেই এই লেখাটি ব্যবহার করার চেষ্টা করলাম। পাঠক, যারা বইটি পড়েননি, ধারণা করতে হয়তো অসুবিধা হবে না।

শঙ্খ ঘোষের এই লেখাটি আসলে একটি বক্তৃতা। ‘প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা’। প্রখ্যাত বেতার সাংবাদিকের নাম এবং কাজের সাথে হয়তো অনেকেই যুক্ত আছে, দুর্ভাগ্যবশত আমি নই, তবুও শঙ্খ বাবু একটি ভূমিকায় সেই ‘মুড’ তৈরী করে দিয়েছেন।
মূলত সংযোগ, এবং যোগাযোগের ভাষার ক্ষেত্রের কিছু মৌলিক চিন্তাসুত্র এই বইয়ের উৎস। প্রথম দুটি প্রবন্ধে, লেখক চিরাচরিত এক সমস্যার কথা বলেছেন। লেখক-পাঠক, শিল্পী-দর্শক সমস্যা। সেই বোঝা এবং না বোঝা, এবং সবশেষে সব মিলিয়ে বোঝা হয়ে যাওয়ার সমস্যা। সেই বোঝা এবং বোঝানোয় ‘আমি’র ব্যবহার, কতটা সেই আমি নিয়ন্ত্রণ করে রূঢ় ভাবে দর্শক শ্রোতাকে। সেই অহং ঔদ্ধত্যের পাশ কাটিয়েও কিভাবে সেই সংযোগ স্থাপিত হতে পারে শিল্পী থেকে দর্শক থেকে শ্রোতায়, লেখক থেকে পাঠকে, সেই নিয়েই চমৎকার গদ্যশৈলীর কিছু ছন্দের উচ্চারণ।
তৃতীয় প্রবন্ধটির শেষ অংশ আমই আগেই কোট করেছি। ‘আমি’ থেকে আচমকা আমাদের ‘আমরা’ তে উত্তরণ (?) এবং তার অন্তর্নিহিত ফ্যাসিবাদের ইঙ্গিত, এ বড় মর্মান্তিক সতর্কবার্তা। উগ্র বিল্পবীর মত নয়, বরং ধীর দার্শনিকের মত শঙ্খ বাবু আমাদের বোধের সেই অংশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যেখানে মাঝেই মাঝেই উঁকি মেরে যান হিটলার থেকে স্ট্যালিন। সেই অচেতন, অবচেতন কতৃত্ব করার সহজাত প্রবণতা, শুধু রাষ্ট্র, জাতি বা সমাজ নয়, পাড়ার ক্লাব, পরিবার, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গোষ্ঠি, সেই ‘আমরা’কে নিয়ত একা ‘আমি’ করে তোলে। জন্ম হয় একবিংশ শতকের নতুন ক্রম বিবর্ধিত ফ্যাসিবাদের।

আরও অনেক কিছু বইটিতে আছে। মাত্র ৪৭ পাতার ছোট বই, আপনারা কেউ উৎসাহী হলে আমি স্ক্যান করে দিতে পারব। বই পড়ার আনন্দ সকলের সাথে ভাগ করে নেওয়া এখনো জগতের দুর্লভ আনন্দের অন্যতম।

সবশেষে একটা ব্যক্তিগত কথা। মাত্র কয়েকদিন আগে জোড়াসাঁকো তে যাওয়া উপলক্ষ্যে আলাপ হয় এক ভদ্রলোকের সাথে। বড় শান্ত ভাবে উনি আমাদের চার পাঁচ জন বন্ধুদের কথা শুনছিলেন, ক্যামেরা আর মাইক নিয়ে আমাদের অত্যাচার সহ্য করছিলেন। সবশেষে, যাওয়ার আগে, আমাদেরকে এই বইটি দিয়ে যান তিনি। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ফেরত কিভাবে দেব? বলেছিলেন, না হয় নাই দিলে। বইটি রয়ে গেছে আমার কাছে। পড়ে ফেলেছি বেশ কয়েকবার, পেয়েছি অদ্ভুত এক শক্তি। বইটা থেকে। বইটা যেন ওনার ব্যক্তিত্বের এক এক্সটেনশান।

বইটার শেষে, নিজের কাঁপা কাঁপা হাতে, লিখে দিয়েছিলেন, অরুণ মিত্রের এক কবিতা।
‘প্রাজ্ঞের মতো নয়, অন্ধের ছুঁয়ে দেখার মত করে বলো’

মাত্র দশ শব্দে, এই কথাগুলোও, বইটার আরেক সংক্ষিপ্তসার।

লেখক পরিচিতিঃ
লিখেছেনঃ Sayantan Dutta

এমন আরও বইয়ের নিয়মিত রিভিউ পেতে EduQuarks এর সাথেই থাকুন। প্রতি সপ্তাহের শনি এবং মঙ্গলবারে আমাদের বুক রিভিউ সিরিজের লিখা পাবলিশ হয়ে থাকে। আমাদের সাথে যুক্ত থাকতে যোগ দিন আমাদের ফেসবুক গ্রুপে ও লাইক দিয়ে রাখুন ফেসবুক পেইজে। সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

No comments: